সংস্কৃতির চেয়ে উচ্চতর মিলনের দূত আর কে আছে?

আপডেট : ১২ মার্চ ২০১৯, ২১:৫০

গান শুনতে হয়, চিত্রকলা বা ভাস্কর্য দেখতে হয়, কবিতা পড়তে হয়, এসব শুনতে শুনতে, দেখতে দেখতে, পড়তে পড়তে যে অনুভূতি, যে ভাবাবেগ জন্ম নেয়, তার অনুনাদ একেক জনের কাছে একেক রকম। প্লিত বা গুরুগম্ভীররা ভিন্ন কথা বলবেন। তাঁরা শিল্পশর্ত, ব্যাকরণ, ব্যঞ্জনা খতিয়ে দেখবেন, ভালোমন্দ রায় দেবেন। এতে সাধারণ দর্শক, শ্রোতা অথবা পাঠকের মন ভরে না। তাঁরা ব্যাকরণের শুদ্ধতা বা ভুলভ্রান্তিকে নস্যাত্ করে গানের সঙ্গে তাল মেলাবেন, কবিতায় ডুবে থাকবেন, অবাক হয়ে ছবি দেখবেন। এটাই যেকোনো শিল্পের কাঙ্ক্ষিত আবেদন। এ আবেদন তখনই সার্থক হয়ে ওঠে, যখন আমরা দেখি, গান শোনার মুহূর্তে শ্রোতারা বিভোর অথবা আন্দোলিত; ঠিক একইভাবে চিত্রকর্মের সামনে দাঁড়িয়ে অবয়বের নির্মাণ অথবা রং ব্যবহারের কৌশল ও ছবির রহস্যময়তায় দর্শকের নিঃশব্দ মুগ্ধতা পারিপার্শ্বিকের কলরবকে হার মানিয়ে ভারী হয়ে ওঠে। সম্প্রতি, মাছখোয়ার আইটি প্রেক্ষাগৃহে এরকমই মনমাতানো অনুষ্ঠানের সাক্ষী হয়ে রইলেন গুয়াহাটির কয়েকশ দর্শক আর শ্রোতা। ‘ব্যতিক্রম মাসাডো’-র পাঁচদিনের ভাষা-সংস্কৃতি মিলনোত্সবে। এই উত্সবে ৫১টি ছবি নিয়ে যোগ দিয়েছিলেন বাংলাদেশের দুই শিল্পী জামাল হোসেন আর আবিদা হোসেন। তাঁরা যাপনে যুগল, অঙ্কন জগতেও যুগলবন্দি। কিন্তু দুজনের ছবির ভাষা, অঙ্কনরীতি, রং ব্যবহার সম্পূর্ণ আলাদা। একই ঘরে বাস করেও শিল্পধর্মে দুজনের স্বাতন্ত্র্য বিস্ময়কর, একজন গাঢ় রং-এর ব্যবহারে বেপরোয়া অথচ কৌশলপ্রিয়, আরেকজন প্রকৃতির অঙ্গে অঙ্গে প্রলেপ দিয়ে ফুটিয়ে তোলেন চরাচর ও নৈসর্গিক প্রেম। জামাল আর আবিদা দুজনই স্বতঃস্ফূর্ত। জাতশিল্পী। এবং স্বশিক্ষিত। ব্যাকরণের অনুশাসনের তোয়াক্কা নেই, দুঃসাহসী তাঁদের চিত্রভাষা।

জামাল কবি এবং আঁকিয়ে। তাঁর কবিতা গতিময়, আবেগপ্রবণ। ‘বকপক্ষী ও সারমেয় ভ্রাতৃত্রয়’ বা ‘প্রেমময় পৃথিবী’-তে যে জামাল তাঁর চারপাশকে, শৈশবকে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে দেখিয়ে আমাদের ভাবিয়ে তোলেন ঋদ্ধ সজল উচ্চারণে, তিনিই আবার চিত্রাভাষে, নিসর্গের নির্মাণে কী অদ্ভুত সংযত। কলকাতায় জামালের একাধিক প্রদর্শনী দেখার সুযোগ হয়েছে আমাদের, গুয়াহাটির প্রদর্শিত ছবিও ওইসব ছবির সংযোগে সমৃদ্ধ, কিন্তু এবারের প্রদর্শনীর কয়েকটি ক্যানভাস, সাদা কালো ড্রয়িং আকারে ছোটো হলেও আবেদনে বৃহত্ মহত্। আবিদার ছবি নানা বর্ণে রঞ্জিত। বড়ো বড়ো ক্যানভাসের অবয়বে, নিসর্গের লীলাখেলায় বালির ওপর রং মিশিয়ে যে অদ্ভুত মায়াময়তা গড়ে তোলেন তিনি, সেখানে তাঁর স্বকীয়তা স্পষ্ট। সরাসরি ঘোষিত। গুয়াহাটির প্রদর্শিত ছবিতে সম্পূর্ণ আলাদা এক আবিদাকে দেখা গেল। গামছার ওপর রং মিশিয়ে, নকশিকাঁথার আদলে রহস্যময় হয়ে উঠেছে চিত্রতল। ফ্যাশন শিল্পী বিবি রাসেল যেমন গামছা নিয়ে নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নিপুণ, আবিদার সফল কসরতও একইভাবে অসমিয়া গামছা, বাংলার গামছা নিয়ে রং মাতানো সূক্ষ্মতায় ভরপুর। অনায়াসে বুঝিয়ে দেন তিনি, তাঁর শিল্পসত্তা ভিন্ন পথে ধাইছে। নকশিকাঁথা নিয়ে অনেকেই ছবি এঁকেছেন দুই বাংলায়। চিত্রকর ধীরাজ চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে সুন্দরবনের একজন সাধারণ মহিলা বহু ছবি এঁকে দেশেবিদেশে সম্মানিত হয়েছেন। কিন্তু রঙিন গামছার ওপর কারুকৃতি বা ছবি আঁকার দুঃসাহস আর মুনশিয়ানায় সম্ভবত নবদিগন্ত আবিষ্কার করলেন আবিদা। তাঁর এই উত্তরণ স্বনিষ্ঠ, বুদ্ধিদীপ্ত। এসব ছবি দেখতে দেখতে নিঃশব্দে আন্দোলিত হতে হয়, গানের আলোড়িত শ্রোতার মতো বলতে হয়, বাহ্।

গানের কথা যখন উঠল, তখন ‘দোহার’-এর প্রাণচঞ্চল পরিবেশনা আর বহুমাত্রিক, বহুভাষিক লোকগানের কথা বলতেই হবে। কালিকাহীন ‘দোহার’ মঞ্চে প্রতিটি গানে  ঝড়ো সুরের মূর্ছনায় স্মরণ করিয়ে দেয়, কালিকাপ্রসাদ মৃত্যুহীন। যেখানে তাঁর সুরারোপিত, সংগৃহীত গান হবে, সেখানেই তিনি আছেন, থাকবেন। ঘৃণা আর উগ্রতার বিরুদ্ধে, সাম্প্রদায়িকতা আর ক্ষমতামত্ততার কিরুদ্ধে ড. সোমেন ভারতীয়ার নেতৃত্বাধীন  মিলনোত্সবের সাফল্য প্রশ্নাতীত। গান, কথা, শিল্প প্রদর্শনী, ‘একুশ সম্মান’ আর দুই বাংলা ও অসমের বহু গুণী ও সাধারণের সমাবেশে প্রকারান্তরে জানিয়ে দিলেন তিনি, সংস্কৃতির চেয়ে উচ্চতর মিলনের দূত আর কে আছে? অসম আর বাংলাদেশের অন্তরবার্তা, সাংস্কৃতিক দেওয়া-নেওয়ার আকাঙ্ক্ষায় প্রেমময়, নৃত্যময় হয়ে উঠল ঐক্যের সামাজিক ইচ্ছা।

এখানে, একুশে সম্মানকে ঘিরে কয়েকটি কথা বলা প্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছে। ২০০৮ সালের ২৫ মে। সেদিন ‘আরম্ভ’ পত্রিকার অফিসবাড়ির উদ্বোধন প্রসারিত মুহূর্ত। বাহান্ন আর বরাক উপত্যকার ভাষা শহীদদের নামে অমর্ত্য সেন, প্রণব মুখোপ্যাধায়, স্যার ফজলে হাসান আবেদ, মৃণাল সেন, মোস্তাক হোসেন, সুচিত্রা মিত্র, পরিতোষ সেন, দেবেশ  রায়, অমিতাভ চৌধুরী সহ ১৬ কৃতীকে, সমাজ ও সংস্কৃতির বিভিন্ন অঙ্গনে অসামান্য অবদানের জন্য বিশেষ পদক দিয়ে সংবর্ধিত করা হয়। এর আগে, দুই দেশের ভাষা আন্দোলনকে এখানে এভাবে স্মরণ করা হয়নি। আমাদের ভাবনায় ছিল বাংলাদেশের ‘একুশের পদক’-এর ভাবাবেগ।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদযাপনের সমারোহ যেভাবে বাড়ছে, যে রকম দেশে দেশে অবলুপ্ত ম্রিয়মাণ ভাষাকে জাগ্রত পুনর্বাসিত করার চেষ্টা হচ্ছে, একভাষিকার বদলে বহুভাষিকের সুন্দরকে স্বীকৃতি জানাতে আগ্রহ দেখাচ্ছে গণতান্ত্রিকতা, তাতে এই বিশ্বাস ক্রমশ গাঢ় হচ্ছে যে, সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদের ভবিষ্যত্ নেই, তার সুদূর-অদূর পরাজয় অনিবার্য।

‘ব্যতিক্রম মাসাডো’ ভিন্ন ভিন্ন ভাষার, ভিন্ন ভিন্ন অঙ্গনের পাঁচ কারিগর— শঙ্করলাল গোয়েঙ্কা, শঙ্কশুভ্র দেব বর্মন, মানিকলাল ভৌমিক, নিবেদিতা তরফদার, যতীন বরাকে, ‘একুশে সম্মান’ দিয়ে কেবল যে একুশের গৌরবকে উঁচিয়ে ধরল তা নয়, অন্য ধরনের সামাজিক অনুরাগ আর অভিপ্রায়ও ব্যক্ত করল। তা হচ্ছে এই— ভুল রাজনীতির তাত্ক্ষণিক কৌশলের অন্তরালে বৃহতের মিলনের শাশ্বত প্রবাহের জোর অনেক বেশি  এবং সে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চাইছে, প্রতিবেশী  দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও আর্থিক যোগাযোগকে মসৃণ, নির্ভেদ করে তুলতে তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। গুয়াহাটির বহুভাষাভাষী এ মহোত্সবের আয়োজনকে আরো দুটি কারণে আমাদের অভিনন্দন। এক. অতিদ্রুত বাংলাদেশের সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সঙ্গে শতাব্দী-প্রাচীন অসম সাহিত্যসভার অত্যন্ত জরুরি একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো— যার সার কথা, আসাম আর ঢাকার বহুমুখী সংস্কৃতির বিনিময়ে দুই সংগঠন ঘনানন্দ উদ্যোগ বাড়িয়ে তুলবে। চুক্তিটি পড়ে শোনাতে গিয়ে গুয়াহাটিতে অবস্থানরত বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনার বললেন, খুব শীঘ্র ঢাকা-গুয়াহাটির মধ্যে বিমান চলাচল শুরু হবে। দ্বিতীয়ত, ভারতের উত্তরপূর্বে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক লেনদেন ক্রমশ প্রশস্ত হচ্ছে, এখানকার ব্যবসায়ীরা ওখানকার উন্নয়নে ভরসা খুঁজে পাচ্ছেন। কারণ, মংলা আর চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহার নিয়ে দুই দেশ চুক্তি করেছে। উভয় দেশের নদীপথে ডেজিং হবে।  এসব খবর কিছুটা জানা ছিল, কিছুটা অজানা, জানার বাইরে অন্যতম সুসংবাদটি অবশ্যই বলতে হবে যে, ভারতের উত্তরাঞ্চলে বাংলাদেশের ‘ট্রেড ব্যালেন্স সারপ্লাস’।

বিশ্বের বাণিজ্য আর সাংস্কৃতিক ইতিহাসে আমরা বারবার লক্ষ করি, এক দেশের সঙ্গে আরেক দেশের অর্থনৈতিক বিনিময় সভ্যতার রূপান্তরকে অপরিহার্য করে তোলে, দিবে আর নিবে মিলাবে মিলিবে-এর পরিসর গড়ে তোলে। কৃষি থেকে নাগরিক বিন্যাসে, যাপনের প্রায় সব প্রাঙ্গণেই। আসামের সঙ্গে পূর্ব বাংলার প্রাকৃতিক আর ভাষাগত সামঞ্জস্যের কাহিনি খুবই দীর্ঘ। শুধু ভৌগোলিক অবস্থান নয়, জনবিন্যাসের চেহারাও দক্ষিণ এশিয়ার এই দুই প্রান্তকে, কৃষ্টির লৌকিক অভ্যাসকে একে-অন্যের নিকটস্থ করে রেখেছে। আলাদা রাষ্ট্র, আলাদা দেশের বন্ধন তাকে রুখতে পারেনি। আমাদের প্রত্যাশা, বিশ্বায়িত আকাঙ্ক্ষা যত বাড়বে, সীমান্তের এপার-ওপারের আত্মীয়তাবোধের ইচ্ছা ততই আঞ্চলিক ক্ষুদ্রতাকে অতিক্রম করে অসীমের অলিখিত নির্দেশকে বুকে নিয়ে গ্রহণশীল হয়ে উঠবে। সকলের সৌভাগ্য, আসামের প্রজ্ঞা আর তারুণ্য আজ সৌহার্দ্যের সোনালি জাহাজের যাত্রী, সংস্কৃতি আর অর্থনীতির প্রবাহমান স্রোতে সম্ভবত স্বতন্ত্র নৌযান ভাসিয়ে দেবে তার লৌকিকতার, কথকতার আবহমান পরম্পরা। একুশের স্মরণে, পাঁচদিনের মিলনোত্সবে বেজে উঠল আগামীর প্রত্যাশার সমবেত করতালি। এ এক দিশাময়, আনন্দময় প্রাপ্তি।

n লেখক:ভারতীয় সাংবাদিক এবং সম্পাদক, ‘আরম্ভ’