দৃশ্য: গোরস্তান। সময়: শেষ রাত্রি
নেতা। আমার বক্তৃতা আমাকে শোনাবেন না। আসলে কী ঘটেছে তাই বলুন।
হাফিজ। হাসপাতাল থেকে লাশগুলো তাড়াহুড়ো করে টেনে হেঁচড়ে গাড়িতে তুলতে হয়েছে। তার ওপর এতখানি পথ ট্রাকে আনা, ঝাঁকুনি কিছু কম খায়নি। আর ডাক্তারগুলোও যেমন পশু, মড়াগুলোকে কেটে-কুটে একেবারে নাশ করে রেখেছিল।
নেতা। এসব কাজে নার্ভাস হলে এত বড় প্রতিষ্ঠানের নেতা হতে পারতাম না। তবু আপনাকে বলেছি আমার হার্ট একটু উইক। বেশি স্ট্রেইন সহ্য হয় না। বাজে কথা না ঘেঁটে আসল কথাটা বলুন।
হাফিজ। যা হবার তাই হয়েছে। টানা-হেঁচড়ায় আর ট্রাকের ঝাঁকুনিতে গাড়ির মধ্যেই লাশগুলো একেবারে তালগোল পাকিয়ে গিয়েছিল। কাটা টুকরাগুলো এলোমেলো হয়ে যাওয়ায় এখন আর বোঝবার উপায় নেই, কোনটার সঙ্গে কোনটা যাবে।
নেতা। তাতে কী হয়েছে? (নতুন বোতল খুলিবে)
হাফিজ। আরেকটা খাচ্ছেন স্যার? মানে, তাই দেখে আমি গোরখুঁড়েগুলোকে বললাম আলাদা আলাদা করে অতগুলো কবর বানিয়ে কী দরকার। একটা বড়-মতোন গর্ত করে সবগুলো তার মধ্যে ঠেসেঠুসে পুরে মাটি চাপা দিয়ে দিলেই হয়।
নেতা। রিসোর্সফুল অফিসার! আপনার নামটা মনে রাখতে হবে। সকালবেলাই একবার পার্টি হাউসে আসবেন, রিকমেন্ডেশন লিখে দেব।
হাফিজ। মেহেরবানি স্যার! পাকিস্তান হবার পর আমরা পেটি-অফিসাররাই কেবল কিছু পেলাম না। ব্রিটিশ আমলেও সমাজে মিশতে পারিনি। পাকিস্তানের জন্য এত ফাইট করে, আমাদের এখনও সেই দশা! যদি আপনারাও আমাদের দিকে ফিরে না তাকান আমরা বাঁচব কী করে? আমাদের তো কোনো রাজনীতি নেই স্যার! সরকারই মা-বাপ! যখন যে দল হুকুমত চালায় তার হুকুমই তামিল করি।
নেতা। এর মধ্যে গোলমালটা কীসের? আপত্তি উঠল কোথায়?
হাফিজ। এ্যা? ওহ্। ইয়ে—মানে, ঐ গোরখুঁড়ে। বজ্জাত ব্যাটারা বলে কি না ‘কভি নেহি।’ বলে কি না মুসলমানের মুর্দা, দাফন নেই, কাফন নেই, জানাজা নেই— তার ওপর একটা আলাদা কবর পর্যন্ত পাবে না? এ হতে পারে না, ‘কভি নেহি!’ গো ধরে বসে রইল। কত বোঝালাম।
নেতা। আহাম্মকি করেছেন। সরকারি কাজ করেন কি না! পাবলিক সেন্টিমেন্ট বোঝেন না। বোঝাতে গিয়ে সময় নষ্ট না করে ওদের খুশিমতো কাজ করতে দিলে আপনার ইজ্জত ডুবত? কাজ আদায় করা নিয়ে আপনার কারবার। সমাজ সংস্কারের বক্তৃতা দেবার জন্য আপনাকে সরকার বেতন দেয় না। আর ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আকাশ ফর্সা হয়ে যাবে— আজান পড়বে— কারফিউ শেষ হবে। লাশগুলো নিয়ে আপনি এখনও মিটিং করছেন? (অংশ)
সূত্র: কাফেলা বাংলাদেশ সংখ্যা (১৯৮৩)
সম্পাদক: আবদুল মান্নান সৈয়দ
