ড. ঊষা রানী বড়ুয়া
নারী সৌন্দর্য আর কোমলতার প্রতীক। সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির শ্রেষ্ঠত্ব বিকশিত হয়েছে এই নারীর মাধ্যমে। একজন নারী কখনো মা, কখনো বোন, কখনো বা কারো স্ত্রী হিসেবে প্রকাশিত। একজন নারী হলো একটি পরিবারের চালিকাশক্তি। কিন্তু এটা সত্যি পরিতাপের বিষয় যে, আমাদের এই সমাজ সংসারে নারীদের এই অনন্য অবদান স্বীকার করতে চান না অনেকে। তারা নারীদেরকে অবলা বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। একজন নারী যে একটি পরিবার, সমাজ ও সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে, তারা এটাকে মানতে নারাজ। বিশেষ করে এশিয়ান দেশগুলোতে নারীর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ চোখে পড়ার মত।
শিশুর যত্নসহ সকল দায়-দায়িত্ব বহন করে একজন নারী । সমাজে একজন নারী তার নিজ গুণে ছোটকাল থেকে নিজ পরিবারের সাংসারিক কাজকর্মে পারদর্শী হয়ে ওঠে। পরিবারের ছোট-খাটো কাম-কাজ যেমন ঘর গোছানো, রান্না করা, ছোটদের যত্ন করা ইত্যাদি কাজে সবসময় সাহায্য করে। এশিয়ান নারীরা বেশিরভাগ গৃহস্থালি কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখে। এক কথায় সংসারের ৮০% কাজ একজন নারীকেই করতে হয়। নারীরা ঘরের কাজের পাশাপাশি কৃষি ও ক্ষেত-খামারে চাষবাসেও সাহায্য করে। নারীর গৃহস্থালি কাজের কখনো কোনো স্বীকৃতি দেওয়া হয় না। নারীর এ বৃহত্ অবদান সবসময় স্বীকৃতিহীন হয়ে থেকে যায়। আমাদের চারপাশে অনেক সংগ্রামী নারী রয়েছে যার অক্লান্ত পরিশ্রম ও কর্মদক্ষতায় একটি পরিবার বেঁচে থাকে। কিন্তু এই সংগ্রামী নারীগুলো কখনো কোনো স্বীকৃতির আশা করে না। ওদের একমাত্র আশা সংসারের সবাইকে ভালোভাবে বাঁচিয়ে রাখা।
এইরকম একজন সংগ্রামী নারী হলো মালতি লতা। বাংলাদেশের বরিশালের অজোপাড়া গায়ে জন্ম নেয় মালতি লতা। সে সংসারের নয় ভাইবোনের সবার ছোট। সংসারে অভাবের কারণে অল্প বয়সে তার বিয়ে হয়ে যায়। বিয়ের এক বছর পর তার একটি পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। পুত্র সন্তানের জন্মের পরপরই স্বামী হূদরোগে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী হয়। তারপর থেকে মালতি লতা স্বামী, সন্তান, বৃদ্ধ শ্বশুর-শাশুড়ির যত্ন একাই করে যাচ্ছে। স্বামী অসুস্থ হয়ে যাওয়াতে কাজের সন্ধানে ঢাকায় চলে আসে। অপরিচিত এই শহরে এক মহিলার মাধ্যমে একটি পোশাক কারখানায় যোগ দেয়। সেখানে খুব অল্প বেতনে কয়েকটি মহিলার সঙ্গে বাসা ভাড়া করে থাকতো সে। যা উপার্জন করতো তা দিয়ে নিজের খাওয়া ও থাকার খরচ মিটিয়ে বাকি পুরো টাকাটাই স্বামী ও সন্তানের জন্য বাসায় পাঠিয়ে দিত। এ পাঠানো টাকায় স্বামীর চিকিত্সা খরচসহ পরিবারের মাস চলতো। মালতি লতা একাই স্বামীর যত্ন, ছেলের পড়ালেখার দায়িত্ব, চাকরি, গৃহস্থালির কাজ সব কিছু নিজে একাই সামলাতে হয়। কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে শরীর। কিন্তু মালতির মত নারীদের ক্লান্তি হলে চলবে কি করে তাদের সংসার? মালতি লতাদের মতো মেয়েদের একমাত্র জীবনের আনন্দ হলো কাজ আর কাজ। তার কাজের ওপরে বেঁচে আসে একটি পরিবার। অথচ সমাজ, এই নারীর কাজকে শুধু তার দায়িত্ব বলে মনে করে। তাদেরকে একটু সহানুভূতি, একটু ভালোবাসা একটু উত্সাহ বা অনুপ্রেরণা দিয়ে অনুপ্রেরিত করে না। মালতি লতাদের মত অনেক নারী আছে যারা মুখবুজে সব কিছু সহ্য করে যায় মৌণভাবে।
n লেখক:লাইব্রেরীয়ান সিরডাপ
