কবিতা

নক্সীকাঁথার কবি

আপডেট : ১৩ মার্চ ২০১৯, ১৯:৫৯

মানুষের জাগতিক দুঃখের রূপকার ছিলেন কবি জসীম উদ্দীন। গ্রামবাংলার হিন্দু-মুসলমান উভয় সমাজের জীবনপ্রবাহ যিনি উপস্থাপন করেছেন সমান দরদ দিয়ে। লোকজীবন থেকে সংগ্রহ করেছেন তাঁর কাব্যের উপকরণ। জসীম উদ্দীনের মতো করে গ্রামের আলপথে, ধানখেতে, গ্রামের রোদ-হাওয়া গায়ে মেখে বেদের বহরের হাসি-কান্নায় সুর মেলাতে আর কোন কবি পেরেছেন?

নক্সীকাঁথা গ্রাম-গ্রামান্তরের নারীর কোমল হাতের সুচারু শিল্পকর্ম। এটি নতুন অর্থে তাত্পর্যময় হয়েছে কবি জসীম উদ্দীনের হাতে। পল্লির লোকগীতি সংগ্রহের পাশাপাশি তিনি লোকসংগীত, লোকশিল্প ও নক্সীকাঁথার সংগ্রাহক হিসেবেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। তাঁর লেখা ‘নক্সীকাঁথার মাঠ’ কাব্যগ্রন্থ বিপুলভাবে পঠিত। একইভাবে তাঁর ‘সোজনবাদিয়ার ঘাট’ বিষয়বসু্ত ও লোকজ উপাদানে ভরপুর নিখুঁত জীবনচিত্র যে কোনো সংবেদনশীল মানুষের প্রাণ ছুঁয়ে যায়। ‘পূর্ববঙ্গের নক্সীকাঁথা ও শাড়ি’ প্রবন্ধটি তাঁর লোকশিল্পের গভীর পরিচয় বহন করে।

‘ঘরের মেঝেতে সপটি ফেলায়ে বিছায়ে নক্্সীকাঁথা

সিলাই করিতে বসিল যে সাজু একটু নোয়ায়ে মাথা।

পাতায় পাতায় খসখস করে, শুনে কান খাড়া করে,

যারে চায় সে ত আসে নাক শুধু ভুল করে করে মরে।

তবু যদি পাতাখানিক না নড়ে ভাল লাগে নাক তার,

আলো হাতে লয়ে দূর পানে চায় বারবার খুলে দ্বার।’

জসীম উদ্দীনের প্রথম খণ্ডকাব্য ‘রাখালী’র পরে ১৯২৯ সালে প্রকাশিত হয় বহু প্রশংসাধন্য প্রথম কাহিনিকাব্য এই ‘নক্সীকাঁথার মাঠ’। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখিত একটি ক্ষুদ্র ভূমিকা তরুণ কবির কাব্যের শিরোভূষণ হিসেবে স্থান পেয়েছিল। ভূমিকায় সমকালীন সাহিত্য রুচির কথা স্মরণ রেখেই অবনীন্দ্রনাথ দ্বিধাভরে বলেছিলেন, ‘নক্সীকাঁথার মাঠ’ রচয়িতা শ্রীমান জসীম উদ্দীন নতুন লেখক, তাতে আবার গল্পটি নেহাতই যাকে বলে ছোট্ট এবং সাধারণ পল্লীজীবনের। শহরবাসীদের কাছে এই বইখানির সুন্দর কাঁথার মতো করে বোনা লেখার কতটা আদর হবে জানি না, আমি এটিকে আদরের চোখে দেখেছি, কেননা এই লেখার মধ্য দিয়ে বাংলার পল্লীজীবনের আমাদের কাছে চমত্কার একটি মাধুর্যময় ছবির মতো দেখা দিয়েছে।’

জসীম উদ্দীনের জীবন ও সাহিত্যকর্ম বিষয়ে গবেষণা করে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন সুনীল কুমার মুখোপাধ্যায়। তিনিই প্রথম কোনো বাঙালি মুসলমান কবির ওপর পূর্ণাঙ্গ বই লেখেন। তিনি লিখেছেন ‘পল্লীজীবনভিত্তিক প্রেমকাব্য নক্সীকাঁথার মাঠের নরনারীরা এত আশ্চর্যরূপে জীবন্ত হয়ে আমাদের সামনে ধরা দিয়েছে। নক্সীকাঁথার মাঠের এই প্রেমচিত্রে গ্রামবাংলার বাস্তবজীবন দলিলও বটে। কারণ এ কাব্যে কবি দুটি পল্লীবালক-বালিকার প্রেমের উন্মেষ, দৈনন্দিন কর্মধারা, প্রতিদিনকার ঘরকন্নার অতিবাস্তব ও জীবন ছবি এঁকেছেন। তিনি অত্যন্ত নিপুণভাবে গ্রাম্য উত্সব-অনুষ্ঠান, গ্রাম্য কলহ, জমিজমা নিয়ে দাঙ্গা-হাঙ্গামা, মামলা-মোকদ্দমার বর্ণনা দিয়ে আপাত নিস্তরঙ্গ গ্রাম্য জীবনের নাটকীয় উপাদানগুলোকে সবার সামনে পল্লীবৃত্তের মধ্যে সঞ্চরণশীল জীবনের আশ্চর্য এক ব্যাপ্তির আভাস কাব্যটিতে বিধৃত হয়েছে। রুপাই ও সাজুর প্রেম তাই দেশ কালের ভূগোল অতিক্রম করে আমাদের চেতনায় নির্বিশেষ হয়ে দেখা দেয়, যদিও তারা সত্যি সত্যি পল্লীরই সাধারণ মানুষ।’