যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়া ১২ জন শিক্ষার্থীকে র্যাগিংয়ের নামে যৌন নিপীড়নের দায়ে নয়জন শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয় হইতে বিভিন্ন মেয়াদে বহিষ্কার করা হইয়াছে। এই ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটি জানায়, র্যাগিংয়ের শিকার হওয়া একজন ছাত্র ঘটনার পর হইতে এখন পর্যন্ত চিকিত্সাধীন, ভুক্তভোগী অন্য ছাত্ররাও মানসিকভাবে ভাঙিয়া পড়িয়াছেন। তাহাদের সকলকেই বিকৃত যৌন আচরণ করিতে বাধ্য করা হয়। ফেব্রুয়ারির প্রথমদিকে দুইটি ছাত্রাবাসে এই ঘটনা ঘটে। তাহাদের ডাকিয়া নিয়া র্যাগিং-এর নামে এই নিপীড়ন চালানো হয়। এই সময় তাহাদের কাউকে কুকুরের মতো, কাউকে মুরগির মতো, আবার কাউকে চেয়ার ছাড়া চেয়ারে বসিতে বলা হয়। ছিনাইয়া নেওয়া হয় মোবাইল ফোন। নিপীড়নের ফলে একজন ছাত্রের খিঁচুনি হয়। অপর একজনের নাক দিয়া রক্ত বাহির হয়। গত মাসেই গোপালগঞ্জে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়েও একই অপরাধে ৬ শিক্ষার্থীকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হইয়াছে। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষের অন্তত ১৫ শিক্ষার্থীকে নিপীড়নের ঘটনা ঘটিয়াছে। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় দ্বিতীয় বর্ষের চার শিক্ষার্থীকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করিয়াছে কর্তৃপক্ষ। বহিষ্কারের ঘটনা ঘটিয়াছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও। কিন্তু তবু নবীন শিক্ষার্থীদের ওপর র্যাগিং নামের নিপীড়ন বাড়িয়াই চলিয়াছে।
র্যাগিং শব্দের প্রচলিত অর্থ হইল ‘পরিচয় পর্ব’। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নূতন শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুরাতন শিক্ষার্থীদের সখ্য গড়িয়া তুলিতে যে পরিচিতি-প্রথা তাহাকেই সকলে র্যাগিং বলিয়া জানে। অথচ সম্প্রতি বাংলাদেশের অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে র্যাগিং-এর নামে নীরব ও সরব নিপীড়ন নির্যাতন চলিতেছে, কখনো কখনো তাহা যৌন নির্যাতনে রূপ নিতেছে। পিছাইয়া নাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ভুক্ত সরকারি কলেজগুলিও। র্যাগিং একটি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে রূপ নিয়াছে। র্যাগিং-এর নামে নবীন শিক্ষার্থীদের জোরপূর্বক ‘বড় ভাই’দের পরিচয় মুখস্থ রাখা, পিতা-মাতা ও পরিবারের অন্যদের জড়াইয়া অশ্লীল ভাষা ব্যবহারসহ বিবিধ বিকৃত উপায়ে নির্যাতন করা হয়। কিন্তু ক্ষেত্রবিশেষে ছাত্র রাজনীতির দাপটে কর্তৃপক্ষ কিছু করিতে পারেন না বা করেন না।
বলা বাহুল্য, র্যাগিং একদিনে এই বিকৃত চেহারা পায়নি। একদিনে তাহা থামিবেও না। নিপীড়কদের শনাক্ত করা হইতে শুরু করিয়া সামাজিক ও আইনি শাস্তি নিশ্চিত করা একান্ত প্রয়োজন। প্রয়োজন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও হল প্রশাসনের সক্রিয় তত্পরতা ও নজরদারি। দলনিরপেক্ষভাবে ভিকটিমদের পক্ষে শক্ত অবস্থান গ্রহণ ছাড়া এবং সর্বোপরি, হলের আসন বিতরণ ও তদারকির দায়িত্ব প্রশাসনের নিজের হাতে তুলিয়া নেওয়া ও ‘গণরুম’র সংকট সমাধান ছাড়া র্যাগিং পুরাপুরি নির্মূল করা সম্ভব নহে। আশার কথা হইল, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে এই ব্যাপারে জোরালো অবস্থান গ্রহণ করিয়াছেন। ইহার ধারাবাহিকতায় অনেক বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন র্যাগিং-এর বিরুদ্ধে সচেতনতামূলক র্যালি করিয়াছে, হল ও বিভাগগুলিতে নোটিস টাঙানো হইয়াছে। সেই সাথে কিছু কিছু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হইতেছে। এই উদ্যোগগুলিকে আমরা স্বাগত জানাই। কিন্তু সতর্ক করাও জরুরি যে আবাসিক হল ও প্রশাসনের কাঠামোগত সংস্কার এবং দায়ী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা না করিলে এইসকল সচেতনতামূলক উদ্যোগ ফলপ্রসূ হইবে বলিয়া মনে হয় না।
