উচ্চশিক্ষিতদের কাছেই কি বাংলাভাষা অনিরাপদ?

আপডেট : ১৩ মার্চ ২০১৯, ২১:০৫

সুন্দর ও সাবলীলভাবে বাংলাভাষা চর্চার প্রতিনিধিত্ব করবে কারা? এমন প্রশ্নের উত্তরে যে কেউ অবলীলায় বলে দিবে- শিক্ষিত সমাজ, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, দেশের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গ এবং নতুন প্রজন্মই বাংলাভাষার শুদ্ধ ও যথাযথ প্রয়োগে নিজেদের আত্মনিয়োগ করবে। কিন্তু আমাদের সমাজের চিত্রটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। দুঃখজনক হলেও সত্যি, বর্তমান শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মের ভাষাগত অপপ্রয়োগের কারণে প্রতিনিয়ত অসংখ্য বিদেশি বা ইংরেজি শব্দ বাংলাভাষায় প্রবেশ করছে। বাংলাভাষার রয়েছে নিজস্ব ঐতিহ্য ও সুনির্দিষ্ট ব্যাকরণ যা শিক্ষিত সমাজের অজানা নয়, কিন্তু বর্তমান প্রজন্ম এগুলোতে ভ্রুক্ষেপ করে না। অনেক শিক্ষিত যুবককে টেলিভিশন টকশো বা সংবাদ মাধ্যমে নিজেদের মতামত দেওয়ার ক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ত বিদেশি শব্দের প্রয়োগ করতে দেখা যায়। এই অপপ্রয়োগ সুদূর ভবিষ্যতে আমাদের মাতৃভাষা বাংলার উপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করবে। ফলশ্রুতিতে বাংলায় প্রবেশ করবে অসংখ্য বিদেশি শব্দ, তাই বাংলাভাষা ব্যবহারে সবচেয়ে বেশি সচেতনতা দরকার এদেশের শিক্ষিত সমাজের।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকগণ যখন বিভিন্ন সভা-সমাবেশে বক্তব্য দেয় তখন লক্ষ্য করলেই বুঝা যায়, তাদের দেওয়া বক্তব্যের ২০ থেকে ৩০শতাংশই বাংলা-ইংরেজির মিশ্রণ। এহেন চিত্র সারা দেশের শিক্ষিত ও উচ্চশিক্ষিতদের মাঝে বিদ্যমান। এই যদি হয় অবস্থা তাহলে আমাদের মাতৃভাষা বাংলার ভবিষ্যত্ কোথায় সেটা সহজেই অনুমেয়। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক আলাপচারিতায় প্রতিনিয়তই বাংলা-ইংরেজি মিলিয়ে কথা বলার প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়। যা দিন দিন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। পক্ষান্তরে বাংলা বাক্যের মাঝখানে হঠাত্ ইংরেজি শব্দ জুড়ে দেওয়াকে অনেকেই আধুনিকতা বলে মনে করে। পৃথিবীর ভাষাগত ইতিহাসে এমন অপপ্রয়োগ অন্য কোথাও আছে কিনা সেটা আমার জানা নেই। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩নং অনুচ্ছেদে প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলার কথা বলা থাকলেও তার বাস্তব প্রেক্ষাপট ভিন্ন। উচ্চশিক্ষা, অফিস আদালত, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজে হরহামেশাই বাংলা ও ইংরেজির মিশ্রণ পরিলক্ষিত হয়। জ্ঞান-বিজ্ঞান, ব্যবসাবাণিজ্য ও মনস্তাত্ত্বিক উন্নয়নের জন্য মাতৃভাষার বিকল্প কিছু নেই। মাতৃভাষায় আমরা যত সহজে মনের ভাব প্রকাশ ও ব্যক্ত করতে পারি বিদেশি ভাষায় সেটা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশে আঞ্চলিক ভিন্নতা থাকলেও মাতৃভাষা সবচেয়ে বেশি নিরাপদ বাংলার গ্রামাঞ্চলের চাষি-মাঝিদের মুখেই। প্রকৃতপক্ষে তারাই বিশুদ্ধ বাংলাভাষার প্রতিনিধিত্ব করে। শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের মতো তারা মায়ের ভাষার সঙ্গে ইংরেজি শব্দ জুড়ে দেয় না। বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত শিক্ষার হার বৃদ্ধি পাচ্ছে এটা আমাদের কাছে সুখকর হলেও মাতৃভাষার সঠিক ব্যবহার ও চর্চায় আমরা ছুটে চলেছি এক অজানা গন্তব্যের পানে।

ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি আসলেই চারদিকে বাংলাভাষার কদর বেড়ে যায়। বড় বড় সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক বাংলাভাষার প্রতি তাদের প্রেমের দ্যুতি ছড়ায় প্রকৃতপক্ষে বাংলাভাষার অগ্রগতি সাধনে সারা বছর থাকে না কোনো আগ্রহ ও উদ্যোগ। তাহলে ফেব্রুয়ারিতে ভাষার প্রতি এই বাড়তি কদর কি নামেমাত্র? আমাদের মাতৃভাষা বাংলার রয়েছে একটি সংগ্রামের ইতিহাস। পৃথিবীর অন্য কোনো ভাষাভাষী জাতি তাদের বুকের তাজা রক্ত দিয়ে মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠা করেনি বা ভাষার প্রশ্নে এমন আত্মত্যাগ করতে হয়নি। আমরা কি সালাম, বরকত, রফিক, শফিকের সেই আত্মত্যাগের মর্যাদা দিতে পেরেছি?

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়