বইয়ের হাটে বসেছিল কবিদের মিলনমেলা। বুধবার অমর একুশে গ্রন্থমেলায় বাংলা একাডেমির মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসব। এতে স্লোভাকিয়া, মরক্কো, সুইডেন, তাইওয়ান, যুক্তরাজ্য, ভারত ও বাংলাদেশের কবিরা অংশ নেন। কবিদের আনাগোনায়, কবিতার পংক্তিমালা উচ্চারণে দিনভর মুখর ছিল একাডেমি প্রাঙ্গন।
সকাল ১০টায় উৎসবের প্রথম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয় একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে। এতে বাংলা কবিতার অতীত ও সামপ্রতিক ধারা বিষয়ে প্রবন্ধ পাঠ করেন বাংলাদেশের কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা। জীবনানন্দ দাশের কবিতা অনুবাদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন ব্রিটিশ কবি ও জীবনানন্দ গবেষক জো উইন্টার। এ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক।
উৎসবে বাংলাদেশি কবিরা ছাড়াও কবিতাপাঠে অংশ নেন সুইডেনের কবি বেনত বার্গ, স্লোভাকিয়ার কবি মিলান রিচার, মরক্কোর কবি বেনাইসা বোমালা, নরওয়ের কবি এরলিং কিতেনসেন, তাইওয়ানের কবি লি কুই-শিন, লীন ফো-অর, লী রিও-ইয়াং, ড. ফাং ইয়া-চীন, তাই চীন-চো, চিন জিউ-জেন, নেপালের কবি বিধান আচার্য, চেট নাথ ক্যানেল প্রমুখ।
এবার মেলা জমবে: প্রকাশকরা বলছেন এবার মেলা জমবে। প্রতিবছর বইমেলার রিপোর্ট করতে গেলেই ‘ঘিঞ্জি মেলা’ নিয়ে পাঠক-লেখকরা বিরক্তি প্রকাশ করতেন। এবার সেই অবকাশ নেই। মেলার পরিধি তিন গুণ বেড়েছে। গোছানো মেলায় পাঠকরা ঘুরছেন স্বাচ্ছন্দ্যে। ইতিমধ্যেই জনপ্রিয় লেখকদের বেশকিছু বই চলে এসেছে মেলায়। ফলে এই ছিমছাম পরিবেশে মেলা জমে না উঠবার কোন কারণ নেই।
‘সত্য প্রকাশের যন্ত্রণা আছে’: গতকাল মেলায় এসেছিলেন মৌলবাদীদের হামলায় নিহত প্রকাশক দীপনের বাবা অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক। বিকালে জাগৃতি প্রকাশনীর স্টলের সামনে তাকে ঘিরে রীতিমত ভিড় জমে গিয়েছিল। তাকে দেখামাত্র গণমাধ্যমকর্মীরা ঘিরে ধরেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘বাংলা একাডেমি বিদেশ থেকে এত লোক নিয়ে আসে, মূল মঞ্চে কত বুদ্ধিজীবী কত বক্তব্য দেন, অথচ তাদের কেউই দীপন-অভিজিত্ বা তার খুন হওয়া ছেলেদের সম্পর্কে কিছুই বলেন না। মিথ্যের পতাকা হাতে নিয়ে সবাই। আমি সত্য বলতে এসেছি। সত্য প্রকাশের যন্ত্রণা আছে।’ তিনি দুঃখ করে বলেন, ‘বুদ্ধিজীবীরা যদি মারা যাওয়া এসব সোনার ছেলেদের নাম উচ্চারণ না করেন, তা হলে তারা কীভাবে প্রগতিশীল হন?’
নতুন ৬৩ বই:বাংলা একাডেমির তথ্যকেন্দ্র থেকে জানা যায়, বুধবার মেলায় নতুন বই এসেছে মোট ৬৩টি। উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে অনন্যা এনেছে ইমদাদুল হক মিলনের ‘ছোট সবুজ মানুষ;, অনুপম এনেছে করুণাময় গোস্বামীর ‘রবীন্দ্রনাথ হান্টিংটন ও ভারতভাগ’, চন্দ্রদীপ এনেছে মনিরুজ্জামানের ‘লোক-চিন্তার পঞ্চকথা’, সময় এনেছে হাসান ফেরদৌসের ‘একাত্তর, যেখান থেকে শুরু’, কথাপ্রকাশ এনেছে শহীদ ইকবালের ‘বাংলাদেশের সাহিত্যের সম্পূর্ণ ইতিবৃত্ত’। আরো রয়েছে অবসর থেকে প্রকাশিত হরিশংকর জলদাসের ‘চিত্তরঞ্জন অথবা যযাতির বৃত্তান্ত’, অন্যপ্রকাশ থেকে নওশাদ জামিলের কবিতার বই ‘ঢেউয়ের ভেতর দাবানল’, পিয়াস মজিদের গল্পগ্রন্থ ‘নগর ঢাকায় জনৈক জীবনানন্দ’, ঐতিহ্য থেকে দেওয়ান বারীন্দ্রনাথের ‘প্রাইভেট লাইফ অব ইয়াহিয়া খান’, আফসার ব্রাদার্স থেকে মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘যখনি জাগিবে তুমি’, চৈতন্য থেকে আসমা বীথির কবিতার বই ‘টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ি’, চারুলিপি থেকে ড. আশরাফ সিদ্দিকীর ‘বাংলাদেশের লোককাহিনী, একই প্রকাশনা থেকে সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ‘যখন সাংবাদিক ছিলাম’, অনুপম প্রকাশনী থেকে যতীন সরকারের ‘রচনাসমগ্র-৫’, দ্বিজেন শর্মার ‘সাহিত্যসমগ্র’, মুহম্মদ জাফর ইকবালের ভৌতিক কাহিনি ‘অন্য জীবন’, আগামী থেকে রশীদ হায়দারের ‘তিন, একজনই’, মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘কলামসমগ্র-৩’, মাওলা ব্রাদার্স থেকে মহাদেব সাহার ‘মধুর মুহূর্তগুলি চলে যায়’, বেঙ্গল পাবলিকেশনস থেকে শাহনাজ মুন্নীর ‘থেমেছে শহর’, সংকলনগ্রন্থ ‘স্থপতি মাজহারুল ইসলাম’, উত্স প্রকাশন থেকে স্বকৃত নোমানের ‘তাজউদ্দিন আহমেদ’ প্রভৃতি।
এছাড়া জনপ্রিয় লেখক প্রয়াত হুমায়ুন আহমেদের প্রাক্তন স্ত্রী গুলতেকিন খানের কবিতার বই ‘আজো কেউ হাঁটে অবিরাম’ মেলায় এসেছে। বইটি প্রকাশ করেছে তাম্রলিপি।
আজকের আয়োজন:আজ বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টায় মূল মঞ্চে ‘বাংলা একাডেমির হীরকজয়ন্তী : গবেষণা কার্যক্রম, অতীত থেকে বর্তমান’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে। প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন অধ্যাপক আবুল আহসান চৌধুরী। আলোচনায় অংশ নেবেন অধ্যাপক মনসুর মুসা, ড. ভূঁইয়া ইকবাল, ড. আমিনুর রহমান সুলতান। সভাপতিত্ব করবেন ড. মনিরুজ্জামান। এ ছাড়া সন্ধ্যায় রয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।
