সিসিমপুরের হালুম আর টুকটুকির সঙ্গে মাতামাতি

আপডেট : ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, ০৯:১৫
মানুষের স্রোত আর থামছেই না। রাতে মেলার সময়সীমা শেষ হয়ে যাওয়ার পরও বইপ্রেমীদের স্রোত ছিল বাঁধভাঙ্গা জোয়ারের মত। গতকাল ছিল শিশুপ্রহর। ছোট শিশু-কিশোরদের নিয়ে মেলায় এসেছিলেন অভিভাবকরা। বিদগ্ধ পাঠক যারা বই নেড়েচেড়ে খানিকটা বুঝে বই কেনেন— তারাও সকালের দিকেই এসেছিলেন।
 
দুপুরের পর সূর্যের উত্তাপ কমে আসার সাথে সাথে বেড়েছে মেলার উত্তাপ। পাঠকের উষ্ণ প্রাণস্পর্শ পুরো মেলাকে করে তুলেছিল উৎসবমুখর। প্রথমবারের মত প্রাণ প্রাচুর্যে ভরপুর হয়ে জেগে উঠেছিল ভাষার মাসের অমর একুশে গ্রন্থমেলা।
 
জনপ্রিয় লেখকদের বই যেসব স্টল থেকে প্রকাশিত হয়েছে সেসব স্টল ঘিরে ভিড় ছিল প্রচণ্ড, নিঃশ্বাস ফেলার ফুরসত নেই বিক্রেতাদের। এদিকে, নজরুল মঞ্চে মোড়ক উন্মোচন আর খোলা জায়গাগুলোতে পাঠকদের জমজমাট আড্ডা জমে উঠেছিল।
 
শিশুপ্রহর ও চিত্রাঙ্কন
শিশুদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিল বাংলা একাডেমি। সে সময়ে শিশুরা এসেছিল দল বেঁধে। তাদের হুটোপুটি রাঙিয়ে তুলেছিল বইমেলা প্রাঙ্গণ। তবে বই কেনার পাশাপাশি শিশুদের মন কেড়েছে সিসিমপুরের হালুম-ইকরি-টুকটুকি-শিকু। সেখানে তাদের জন্য বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে ছিল তারা। তাদের সঙ্গে মেতে উঠেছিল খুদে বিচ্ছুর দল। শিশুদের জন্য তৈরি মঞ্চে নানা ধরনের শিক্ষণীয় খেলায় অংশ নিয়ে অন্যরকম এক দিন পার করেছে শিশুরা।
 
সকালে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয় শিশু-কিশোর চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা। প্রধান অতিথি হিসেবে প্রতিযোগিতা উদ্বোধন করেন শিল্পী সমরজিত্ রায়চৌধুরী। প্রতিযোগিতায় সর্বমোট ৫৬২ জন প্রতিযোগী অংশগ্রহণ করে। আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি ফলাফল ঘোষণা করা হবে। আজ শনিবারও শিশুপ্রহর ঘোষণা করেছে একাডেমি কর্তৃপক্ষ।
 
শিশুদের জন্য বাংলা একাডেমি এবার বেশ কয়েকটি নতুন বই প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বাংলা একাডেমি ছোটদের অভিধান-এর নতুন সংস্করণ, রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই সম্পাদিত আমার প্রথম লেখা, আখতার হুসেন সম্পাদিত হাবীবুর রহমান কিশোর রচনাসংগ্রহ, সৈয়দ শামসুল হকের বঙ্গবন্ধুর বীরগাথা বইয়ের সাধারণ ও ব্রেইল সংস্করণ, আসাদ চৌধুরীর বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, বেবী মওদুদের রাসেলের গল্প, শাহজাহান কিবরিয়ার আফ্রিকার রূপকথা এবং চালাক শিয়াল ও বোকা শিয়াল। অন্যান্য প্রকাশনা সংস্থাসমূহ এ পর্যন্ত মেলায় ২১টি শিশুতোষ বই প্রকাশ করেছে। মানুষের ভিড়ে মেলা হয়ে উঠেছিল ধুলিধূসর। ধুলো মাড়িয়ে সবাই ছুটে গেছেন পছন্দের বইটি কিনতে।
 
মেলায় সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের
বিকালে বইমেলা পরিদর্শনে আসেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। গতবছর সেতুমন্ত্রীর একটি উপন্যাস বেরিয়েছিল বইমেলায়। এবার বেরিয়েছে তার সাংবাদিকতা জীবন নিয়ে একটি বই ‘যখন সাংবাদিক ছিলাম’। চারুলিপি প্রকাশনী থেকে বেরিয়েছে এ বই। আর শুক্রবার সেখানেই আসেন তিনি। স্টলের ভেতর বসেন। তার বইয়ের ক্রেতাদের অটোগ্রাফ দেন।
 
নিরাপত্তা পরিদর্শনে পুলিশ কমিশনার
বিকালে বইমেলা পরিদর্শনে আসেন ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া। তিনি পুরো মেলা প্রাঙ্গণের ভেতর-বাহির পরিদর্শন করেন এবং বিভিন্ন স্টলের বিক্রয়কর্মীদের সঙ্গে নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলেন। নিরাপত্তা নিয়ে কোনো সংশয় নেই জানিয়ে আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, ‘মেলার নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোনো ঘাটতি আছে কি না সেটা দেখার জন্য আমি এসেছি। পুরো মেলা প্রাঙ্গণে মোট ৭টি ওয়াচ টাওয়ার রয়েছে। দূরবীন দিয়ে তারা সার্বক্ষণিক নজরদারি করছে। এ ছাড়া সিসি ক্যামেরায় সব ভিডিও ফুটেজে প্রত্যেক দর্শনার্থীর আগমন-নির্গমন পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।’
 
নতুন বই
গতকাল মেলায় নতুন ২৫৬টি বই এসেছে। এর মধ্যে গল্প ৪০, উপন্যাস ৪৯, প্রবন্ধ ৮, কবিতা ৬৪, গবেষণা ৪, ছড়া ৮, শিশুসাহিত্য ১৩, জীবনী ৮, মুক্তিযুদ্ধ ৪, নাটক ১, বিজ্ঞান ৩, ভ্রমণ ৪, ইতিহাস ৫, রাজনীতি ৪, কম্পিউটার ১, ধর্মীয় ২, অনুবাদ ১, অভিধান ৫, বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনী ২ এবং অন্যান্য বিষয়ে ৩০টি।
 
এর মধ্যে রয়েছে এমিরেটাস অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলামের ‘বাংলা ভাষা আন্দোলন’ ময়ূরপঙ্খি ও ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়’ আগামী; নির্মলেন্দু গুণের ‘না প্রেমিক না বিপ্লবী’, কবি প্রকাশন; ড. সন্্জীদা খাতুনের ‘প্রভাতবেলার মেঘ ও রোদ্র’, নবযুগ প্রকাশনী; আবুল আহসান চৌধুরীর ‘অন্নদাশঙ্কর রায় : মনমননের পত্রালি’, পলল প্রকাশনী; মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘যখনি জাগিবে তুমি’, আফসার ব্রাদার্স; শামসুজ্জামান খানের ‘নিষ্ঠুর রাজা ও দশ ভাই’ ও সেলিনা হোসেনের ‘যখন বৃষ্টি নামে’, রাতুল গ্রন্থপ্রকাশ; ইমদাদুল হক মিলনের ‘রেশমি’, অনন্যা; মোরশেদ সফিউল হাসানের ‘ছোটদের গ্যালিলিও’ ও ‘জানার মধ্যে কত মজা’, আন্দালিব রাশদীর ‘ট্যারা মাখনার নোবেল প্রাইজ; কথা প্রকাশ; রকিব হাসানের ‘কিশোর মুসা রবিন : সাগরে আতঙ্ক’ ও আহসান হাবীবের ‘কেঁচো খুঁড়তে অ্যানাকোন্ডা, অক্ষর প্রকাশনী; হাসান হাফিজের ‘আট দেশের রূপকথা’, ঝিঙেফুল; আনিসুল হকের ‘লিফটে আটকে পড়া যুবক যুবতীরা’ ও পিয়াস মজিদের ‘কবিকে নিয়ে কবিতা’, সময় প্রকাশনা; সুমন্ত আসলামের ‘হঠাত্ তোমার জন্য’, কাকলী প্রকাশনী; শুভাশিষ সিনহার ’আবছায়াদের রূপকথা’, ঐতিহ্য; পলাশ মাহবুবের ’মা করেছে বারণ’, ঐতিহ্য; শাহরিয়ারের ‘কল্পশিকারী’।
 
মেলামঞ্চে অনুষ্ঠান
গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় বাংলা একাডেমির হীরকজয়ন্তী : অভিধান ও ব্যাকরণ কর্মসূচি, অতীত থেকে বর্তমান  শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক স্বরোচিষ সরকার। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন অধ্যাপক হাকিম আরিফ এবং অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক আহমদ কবির।
 
প্রাবন্ধিক বলেন, প্রতিষ্ঠার গোড়ার দিক থেকেই বাংলা একাডেমি অভিধান প্রণয়ন ও প্রকাশ কর্মসূচিকে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, ড. মুহম্মদ এনামুল হকের মতো পণ্ডিত ব্যক্তিবর্গ যেসব অভিধান কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাই পরবর্তীকালে বিকশিত হয়ে বাংলা একাডেমির অভিধানকে জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছে।
 
সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন বেগম রাহিজা খানম ঝুনু-এর পরিচালনায় ‘বাংলাদেশ একাডেমি অব ফাইন আর্টস লি.’-এর শিল্পীবৃন্দ। সংগীত পরিবেশন করেন শিল্পী আবদুল লতিফ শাহ্, শফি মন্ডল, রণজিত দাস বাউল, মমতা দাসী বাউল, ভজন কুমার ব্যাধ এবং কোহিনুর আকতার গোলাপী।
 
আজকের অনুষ্ঠানসূচি
শিশুপ্রহর: আজ মেলা শুরু হবে সকাল ১১ টায়। শিশুপ্রহরের সময় দুপুর একটা পর্যন্ত। শিশুদের অভিভাবকসহ স্বাচ্ছন্দ্যে বই কেনার সুবিধার্থে শিশুপ্রহর ঘোষণা করা হয়েছে।
 
শিশুকিশোর সাধারণ জ্ঞান ও উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতা: শনিবার সকাল দশটায় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হবে শিশুকিশোর সাধারণ জ্ঞান ও উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতার প্রাথমিক বাছাই।