তদন্তের ফল ‘শূন্য’

আপডেট : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, ০২:০৮
প্রায় কোটি টাকা ব্যয় করেও সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি খুনের ঘটনার চার বছরে তদন্তের ফলাফল এখন পর্যন্ত ‘শূন্য’। হত্যাকাণ্ডের মোটিভ, খুনিদের গ্রেফতার কিংবা উল্লেখযোগ্য কিছুই করতে পারেনি মামলা তদন্তকারী সংস্থা র্যাব। এরই মধ্যে র্যাবে মামলা তদন্তকারী কর্মকর্তা পরিবর্তন হয়েছেন। গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর মামলার নতুন তদন্ত কর্মকর্তা নিযুক্ত হন এএসপি মহিউদ্দিন আহমেদ। এর আগে পূর্বের তদন্তকারী কর্মকর্তা এএসপি মোহাম্মদ জাফর উল্লাহ র্যাব থেকে পুলিশে ফিরে যাওয়ায় নতুন কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয় বলে র্যাবের পদস্থ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
 
এদিকে, তদন্তে কোনো অগ্রগতি না দেখে বিচারের আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছেন নিহতের স্বজনেরা। নিহত রুনির ভাই নওশের আলম রোমান বলেন, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা যে পরিবর্তন হয়েছে, সেটি তারা জানেন না। এ বিষয়ে সাংবাদিকরা র্যাবের সঙ্গে যোগাযোগ করার পর মঙ্গলবার মামলার নতুন তদন্তকারী কর্মকর্তা তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তবে তারা এই মামলার তদন্ত নিয়ে একেবারেই হতাশ। এখন শুধু সাগর-রুনির একমাত্র সন্তান মাহীর সারওয়ার মেঘকে নিয়ে তাদের চিন্তা। তাকে মানুষের মতো মানুষ করে গড়ে তোলার দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
 
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এএসপি মহিউদ্দিন আহমেদের তথ্য দিয়ে র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া শাখার পরিচালক কমান্ডার মাহমুদ খান বলেন, এই মামলায় গ্রেফতার ৮ জনের মধ্যে ৩ জন জামিনে রয়েছেন। এরা হলেন স্কলাসটিকা স্কুলের প্রশাসনিক কর্মকর্তা তানভীর রহমান, সাগর-রুনির ফ্ল্যাটের দারোয়ান পলাশ রুদ পাল ও ডা. নিতাই হত্যা মামলার আসামি মিন্টু। এই মামলায় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী আছেন ডা. নিতাই হত্যা মামলার আসামি কামরুল হাসান অরুণ, পেশাদার ডাকাত রফিকুল ইসলাম, বকুল মিয়া, আবু সাঈদ ও সাগর-রুনির অ্যাপার্টমেন্টের আরেক সিকিউরিটি গার্ড হুমায়ুন ওরফে এনামুল হক। গত ১৭ সেপ্টেম্বর মামলার নতুন তদন্ত কর্মকর্তা নিযুক্ত হওয়ার পর ১৬ জানুয়ারি      আদালতে মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি এই মামলার আরো একটি তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করা হবে। মামলা তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, এ পর্যন্ত এই মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট ৪০টি প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করেছে র্যাব।
 
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ৫৮/এ/২, রশিদ লজ অ্যাপার্টমেন্টের ৫ম তলার ফ্ল্যাট থেকে মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সারওয়ার ও এটিএন বাংলার সিনিয়র রিপোর্টার মেহেরুন রুনির ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় রুনির ছোট ভাই নওশের আলম রোমান বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। এ মামলাটি বর্তমানে উচ্চ আদালতের নির্দেশে র্যাব তদন্ত করছে।
 
র্যাব মামলাটি তদন্তকালে ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা অন্তত অর্ধশত আলামতের ডিএনএ (ডি-অক্সিরাইবো নিউক্লিক এসিড) নমুনা পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের একটি পরীক্ষাগারে পাঠায়। যুক্তরাষ্ট্রের ডিএনএ পরীক্ষাগার থেকে পাওয়া রিপোর্টগুলো নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে বলা হয় যে, ঘাতক যারাই হোক দুইটি পৃথক ডিএনএ নমুনার সঙ্গে ঐসব ঘাতকের ডিএনএ নমুনার মিল পাওয়া যাবে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাঠানো ঐ ডিএনএ নমুনার রিপোর্টে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয় যে, এই দুটি ডিএনএ নমুনা বহনকারীরাই ঘাতক (কিলার)। দুই ডিএনএ নমুনা জাতীয় ডিএনএ নমুনা থাকলে, তার সঙ্গে মিলিয়ে নেয়ার পরামর্শ দেয় যুক্তরাষ্ট্রের ঐ পরীক্ষাগার। কিন্তু দেশের অপরাধী চক্রের ডিএনএ নমুনার ডাটাবেজ না থাকায় ঐ দুই ডিএনএ নমুনা দিয়ে সন্দেহভাজন ঘাতকদের শনাক্ত করা সম্ভব নয়। র্যাব এখন সাগরের ব্যবহূত দুটি ল্যাপটপের সন্ধান করছে। খুনের দিন তার ব্যবহূত ল্যাপটপ দুটি খুঁজে পাওয়া যায়নি। র্যাব ধারণা করছে, ঘাতকরা ঐ দুটি ল্যাপটপ নিয়ে গেছে। র্যাব এই দুই ল্যাপটপ উদ্ধারের জন্য মাঠে কাজ করছে।
 

কেমন আছে মেঘ: রাজধানীর ইন্দিরা রোডের ৬৬/১২ নম্বর বাড়িতে মামার বাড়িতে আছে মেঘ। বাবা-মাকে হারানোর চার বছর পর মেঘ এখন গুলশানের বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল টিউটোরিয়াল (বিআইটি)  স্কুলে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে। গতকাল ইন্দিরা রোডের বাড়িতে সাংবাদিকরা যান মেঘের খোঁজখবর নিতে। কেমন আছো জিজ্ঞেস করতেই জবাব মিলল, ‘ভালো’। মেঘ জানায়, এখন ভর্তি হয়েছে গুলশানের বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল টিউটোরিয়াল (বিআইটি) স্কুলে। আগে পড়ত সেন্ট জোসেফ স্কুলে। বড় হয়ে কী হতে চাও? জানতে চাইলে মেঘ বলে, ‘ক্রিকেটার’। প্রিয় ব্যাটসম্যান সৌম্য সরকার, আর বোলার মোস্তাফিজুর রহমান। তবে সবচেয়ে বেশি পছন্দ অলরাউন্ডার হিসেবে বিশ্বের শীর্ষ স্থানে থাকা সাকিব আল হাসানকে। ঘরে খেলা দেখার চেয়ে মাঠে খেলা দেখতেই তার বেশি ভালো লাগে। কে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে মেঘকে? জানায়, ‘মামা আমাকে স্কুলে নিয়ে যায়, বেড়াতে নিয়ে যায়, আমার সঙ্গে ক্রিকেট খেলে, আমাকে চকোলেট কিনে দেয়, হোমওয়ার্ক করতে সাহায্য করে। রাতে আমি মামার সঙ্গেই ঘুমাই।’ বলল, ‘আব্বু আর মামণিকে অনেক মিস করি, ওদের অনেক ভালোবাসি।’ চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ছিল অশ্রু। তারপর অনেকটা সময় একদম চুপ।