সুরা মসজিদঃ ইসলামী স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন

আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, ১৪:২৯
 
দিনাজপুর জেলার স্থাপত্য ঐতিহ্যের এক অপরূপ নিদর্শন সুরা মসজিদ। মসজিদটি ঘোড়াঘাট থেকে প্রায় পাঁচ মাইল পশ্চিমে এবং হিলি থেকে প্রায় বারো মাইল পূর্বে হিলি-ঘোড়াঘাট সড়কে চরগাছা মৌজায় অবস্থিত।
 
মসজিদটি সুরা নামক স্থানে নির্মিত বলে এটি সুরা মসজিদ নামে পরিচিত। কেউ কেউ এটিকে সুজা মসজিদ নামেও অভিহিত করেন। এখানে রাস্তার উত্তর পার্শ্বে ৩৫০(২০০ গজ (প্রায়) আয়তনের একটি প্রাচীন দিঘি রয়েছে। দিঘির ১৫ ফুট উঁচু পাড়গুলো বেশ প্রশস্ত। দক্ষিণ পাড়ের মধ্যভাগে একটি প্রশস্ত ঘাট রয়েছে। কারো কারো মতে ঘাটটি প্রায় ৫০ ফুট প্রশস্ত ছিল। ঘাট থেকে প্রায় ১০০ ফুট দক্ষিণ-পশ্চিমে দীঘির দক্ষিণ পাড়ের পশ্চিমাংশের দক্ষিণ দিকে এবং সদর সড়কের উত্তর দিক বরাবর প্রায় ৪ ফুট উঁচু একটি সমতল প্লাটফর্ম রয়েছে। পূর্ব পশ্চিমে দীর্ঘ এ প্লাটফর্মের আয়তন প্রায় ১০০(৫০ ফুট। এ প্লাটফর্মের পশ্চিম ভাগেই সুলতানী বাংলার অনন্য স্থাপত্য সুরা মসজিদ অবস্থিত।
 
মসজিদটির একটি বর্গাকার এক গম্বুজ বিশিষ্ট নামাজ কক্ষ (জুল্লাহ) এবং পূর্ব ভাগে ছোট তিন গম্বুজ বিশিষ্ট একটি বারান্দা রয়েছে। এরূপ নকশার মসজিদ উত্তর বাংলায় পঞ্চদশ শতকের শেষ দিকে এবং ষোড়শ শতকে খুবই জনপ্রিয় ছিল। মসজিদের উত্তর ও দক্ষিণ বাইরের দেয়ালে ব্যবহূত ইটের সূক্ষ্ম রিলিফ নকশার সাদৃশ্য পাওয়া যায় ১৫২৩ সালে নির্মিত রাজশাহীর বাঘা জামি মসজিদের সাথে। মসজিদের আয়তন বাইরের দিকে ৪০(৬০ ফুট। মসজিদটি পূর্ব-পশ্চিমে দীর্ঘ।
 
মসজিদের বাইরে চারকোণায় এবং বারান্দায় দু’কোণে মোট  ছয়টি অষ্টভূজাকৃতি টাওয়ার রয়েছে। এটি সমসায়িক স্থাপত্যের প্রতিফলন। এই টাওয়ারগুলো মসৃণ কালো পথরে আবৃত। মসজিদের সমগ্র বহির্দেয়াল একটি পাথরের বর্ডার দ্বারা উপর নীচ দু’ভাগে বিভক্ত। এরুপ নকশা এক লাখি সমাধির প্রভাব বলে মনে হয়। কর্ণার টাওয়ারগুলো গোলাকৃতি নকশায় স্থরায়িত। পূর্বদিকে তিনটি খিলানপথ দিয়ে মসজিদের অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে হয় এবং এই খিলানপথগুলোর বরাবর বারান্দায় আরো তিনটি খিলানপথ দেখা যায়। যা দ্বারা বারান্দা থেকে নামাজ কক্ষে প্রবেশ করতে হয়। এছাড়া নামাজ কক্ষের উত্তর ও দক্ষিণে এবং আরান্দার উত্তর ও দক্ষিণে একটি করে আরো চারটি প্রবেশ পথ রয়েছে। বর্গাকার নামাজ কক্ষটির আয়তন ভিতরের দিকে ১৬(৭ ফুট। ইমারতের পশ্চিম ও পূর্বদিকের দেয়ালের প্রশস্ততা ৬ ফুট এবং উত্তর দক্ষিণ ও বারান্দার পূর্ব দেয়াল প্রত্যেকটি ৫ ফুট প্রশস্ত। মসজিদের নামাজ কক্ষের উপরে একটি বৃহত্ গম্বুজ এবং বারান্দায় তিনটি সমআকৃতির ছোট গম্বুজ ব্যবহূত হয়েছে। গম্বুজ নির্মাণে স্কইঞ্চ রীতি ব্যবহূত হয়েছে।
 
ইমারতের অভ্যন্তরে ইটের গাঁথুনির ওপরে পাথরের মোটা আবরণ ছাদ পর্যন্ত উঠে গেছে। এখানে পশ্চিম দেয়ালে মোট তিনটি মিহরাব রয়েছে। মিহরাব নির্মাণে পাথর ব্যবহূত হয়েছে। সুলতানী স্থাপত্য রীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য বক্রাকার কার্নিশ ছাদে দেখা যায়। বৃষ্টির পানি সহজে নেমে যাবার জন্য বাংলার দোচালা ও চৌচালা কুঁড়ে ঘরের ন্যায় ঢালু ছাদ সৃষ্টি করা হয়েছে। মসজিদের অবতলাকৃতির মিহরাব তিনটির মধ্যবর্তী মিহরাবটি অপেক্ষাকৃত বড়। কেন্দ্রীয় মিহরাবের বাইরে কিছু অংশ উদগত রয়েছে।
 
মসজিদটি নির্মাণে প্রধানত ইট ব্যবহূত হলেও মসজিদের প্রায় এক চতুর্থাংশ স্থান জুড়ে পাথরের ব্যবহার দেখা যায়। মসজিদের প্রত্যেক প্রবেশ পথে ব্যবহূত চৌকাঠ পাথরের তৈরি। মসজিদের প্লাটফরমটির চারদিকে ইট নির্মিত প্রশস্ত প্রাচীর ছিল বলে দৃষ্ট হয়। এখনও প্লাটফর্মের নিচের দিকে বিভিন্ন স্থানে প্রাচীন চিহ্ন বিদ্যমান। পূর্বদিকের দেয়াল প্রায় অটুট রয়েছে। সেদিকেই মসজিদের প্রবেশপথের সিঁড়ি। সিঁড়ির ব্যবহৃত পাথরগুলোতে মূর্তি উত্কীর্ণ ছিল, যা এখন প্রায় নিশ্চিহ। এতে মুসলিম স্থাপত্যে হিন্দু স্থাপত্য উপকরণ ব্যবহারের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়।
 
মসজিদের উত্তর ও উত্তর পূর্ব দিকে এবং দীঘির ঘাটে অসংখ্য প্রস্তরখণ্ড পাওয়া যায়। মসজিদের উত্তর দিকে একটি উন্নতমানের বেলে পাথরে একটি ছোট নারী মূর্তি উত্কীর্ণ ছিল। তবে মূর্তিটির পরিচয় জানা সম্ভব হয়নি।
 
ইমারতটিতে মসৃন পাথরের চমত্কার অলঙ্করণ দৃষ্ট হয়। এখানে ব্যবহৃত পাথরে খোদাই ও কাটা নকশা ছোট সোনা মসজিদকে স্মরন করিয়ে দেয়। মসজিদের মিহরাবে পাথরের উন্নত কারুকার্য ব্যবহূত হয়েছে। ইমারতে ইটের উপর অত্যন্ত সূক্ষ্ম  খোদাই নকশা দেখা যায়। এখানে কোন শিলালিপি পাওয়া যায়নি। এর গঠন প্রাণালী ও স্থাপত্য কৌশল দেখে এটিকে সুলতানী আমলের মসজিদ হিসেবে গ্রহণ করা হয়। মসজিদের সংযুক্ত ছয়টি টাওয়ারে ব্যবহৃত পাথরের আবরণ এবং মিহরাবে বক্রবার পাথরের ব্যবহার কুসুম্বা মসজিদের (১৫৫৮ খ্রিস্টাব্দ) কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আহমদ হাসান দানী মসজিটিকে হোসেন শাহী আমলের বলে অনুমান করেছেন।
 
যদিও মসজিদটির কোন শিলালিপি পাওয়া যায়নি তবু ষোড়শ শতকের বাংলার অন্যান্য সুলতানী মসজিদের সাথে এর সাদৃশ্য এটাকে সে সময়ের ইমারত হিসেবে প্রমাণ করে। মসজিদটির কারুকার্যগুলো শ্যাওলা পড়ে বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে, তাই তা সংস্কার করা আশু প্রয়োজন।