ভালোবাসা আর বই যেন একই সূত্রে গাঁথা। প্রিয়জনকে যে কথা মুখে বলা যায় না, লেখক সে কথাই যেন বলে দেন প্রেমিকের হয়ে। সেজন্যই প্রেমিক মন খোঁজে বইয়ের আশ্রয়। প্রিয়জনের হাতে তুলে দেয় প্রেমের প্রিয় পংক্তিমালা। মনের কথা কবির পংক্তিমালায় ভর করে প্রেমিককে জানান দেয় ভালোবাসার। লাল গোলাপের সাথে নতুন বই তুলে দিয়ে প্রিয়জনকে আজ অনেকেই করবেন প্রেম নিবেদন। আজ ভালবাসা দিবসে তাই বইমেলাই হয়ে উঠবে যেন প্রধান গন্তব্য। গতকাল বসন্ত উত্সবে মেতে বইমেলাকে রাঙিয়ে তুলেছিল তরুণ-তরুণীরা। আজ ভালবাসায় ভিজবে বইমেলা। তাই সকাল থেকেই মেলা জমে উঠবে বলে মনে করছেন প্রকাশকরা। ভালবাসা দিবস উপলক্ষে বইমেলার স্টলে চলে এসেছে উপন্যাস, গল্প, কবিতার বই।
বসন্ত জাগ্রত দ্বারে/ তব অবগুণ্ঠিত কুণ্ঠিত জীবনে/ কোরো না বিড়ম্বিত তারে— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের এ আহ্বানে সাড়া দিয়েই বসন্তকে দূরে ঠেলে দেয়নি রাজধানীবাসী। গতকাল বসন্ত উত্সবের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে বইমেলা প্রাঙ্গণে। অমর একুশে গ্রন্থমেলায় লেগেছিল বসন্তের রঙ। ঋতুরাজ বসন্তের প্রথম দিনে মেলা প্রাঙ্গণকে ঘিরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, রমনা পার্ক, শিল্পকলা একাডেমী, শহীদ মিনারসহ পুরো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নেমেছে মানুষের ঢল। সাপ্তাহিক ছুটি শনিবার বসন্তের প্রথম দিন হওয়ায় সকালে সবারই গন্তব্য ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ও গ্রন্থমেলা। কারণ সকাল থেকেই ঢাবির চারুকলার বকুলতলায় বসন্তবরণের উত্সব চলেছে। সেইসঙ্গে মেলার বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ছিল শিশু-কিশোরদের সাধারণ জ্ঞান ও উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব। সকাল ১১টায় মেলার ঝাঁপ খোলার সাথে সাথে বসন্তবরণ উত্সবে অংশ নেয়া তরুণ-তরুণীসহ সব বয়সী মানুষের ঢলটি নামে মেলা প্রাঙ্গণে। এছাড়া সে সকল শিশু-কিশোর প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের জন্য বাংলা একাডেমিতে এসেছে, তাদেরও একটা চাপ ছিল মেলায়। বাঙালির সংস্কৃতির এ বসন্ত উত্সবকে ঘিরে নারীরা বাসন্তী রঙের শাড়ি বা সালোয়ার-কামিজের সঙ্গে হাতে-খোঁপায় হলুদ গাঁদা ফুলসহ বাহারি ফুলে নিজেদের সাজিয়ে আসেন মেলা প্রাঙ্গণে। সেইসঙ্গে হাতে বাজে রিনিঝিনি শব্দে কাচের চুড়ি। অনেকে আবার পরিবারসহ মেলায় এসেছে বসন্তের সাজে। পুরুষরাও নিজেদের সাজ-পোশাকে রেখেছে বসন্তের ছোঁয়া। বসন্তের প্রথম দিনে মেলার অন্যান্য দিনের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বিক্রি হয়েছে বলে প্রকাশকরা জানান। শুধু পাঠকদের মাঝেই না, বসন্তের এ আগামনী ছোঁয়া লেগেছিলো স্টলগুলোতেও। বিক্রয়কর্মীরাও সেজে এসেছিলেন বসন্তের রঙে। প্রতিটি স্টলে ছিল বইপ্রেমীদের ভিড়। যাচাই বাছাই করে তাদের পছন্দের লেখকের বইটি কিনতে দেখা গেছে।
অর্থমন্ত্রীর রচনাবলির পাঠ উন্মোচন
উত্স প্রকাশনী প্রকাশ করেছে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের রচনাবলি। ১০ খণ্ডে এ রচনাবলি প্রকাশিত হয়েছে। শনিবার সন্ধ্যা ৬টায় বাংলা একাডেমির শামসুর রাহমান হলে বইগুলোর পাঠ উন্মোচন করা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান ও অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ।
হরিশংকর জলদাসের ‘একলব্য’র
প্রকাশনা উত্সব
গতকাল বিকাল ৫টায় বাংলা একাডেমির কবি শামসুর রাহমান হলে প্রকাশনা উত্সব হয় জনপ্রিয় লেখক হরিশংকর জলদাসের এপিকধর্মী উপন্যাস ‘একলব্য’-এর। মহাভারতের দুর্দমনীয় প্রান্তজন একলব্যকে নিয়ে এটি বাংলাভাষায় রচিত প্রথম উপন্যাস, যেখানে আর্য সমাজব্যবস্থার পাশাপাশি ব্রাত্যজনের জীবনও সুনিপুণভাবে এঁকেছেন লেখক। বইটি প্রকাশিত হয়েছে অন্যপ্রকাশ থেকে। প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ।
বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। ‘একলব্য’ বইটি নিয়ে আলোচনা করেন কথাশিল্পী জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত ও ইমদাদুল হক মিলন। স্বাগত বক্তব্য দেন অন্যপ্রকাশের প্রধান নির্বাহী মাজহারুল ইসলাম।
মেলা পরিদর্শনে আইজিপি
দুপুরে অমর একুশে গ্রন্থমেলা প্রাঙ্গণে আসেন পুলিশের মহাপরিদর্শক একেএম শহীদুল হক। তিনি বইমেলা ঘুরে দেখেন। পরে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আজ লোকসমাগম বেশি। বইমেলার সামগ্রিক পরিস্থিতি দেখতে মেলায় আসা। এ পর্যন্ত বইমেলায় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। মেলায় নিরাপত্তাসহ পরিবেশ ঠিক রাখতে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী যথেষ্ট সতর্ক আছে।’
১৮ কল্পকাহিনী গ্রন্থের মোড়ক উন্মোচন
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মোড়ক উন্মোচন মঞ্চে একসঙ্গে উন্মোচিত হল ১৮টি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর বইয়ের মোড়ক। যার আয়োজক বাংলাদেশ সায়েন্স ফিকশন সোসাইটি। বইগুলোর মোড়ক উন্মোচন করেন জনপ্রিয় শিশু সাহিত্যিক মুহম্মদ জাফর ইকবাল। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন জাফর ইকবালের সহধর্মিণী ড. ইয়াসমিন হক, সময় প্রকাশনের ফরিদ আহমেদ, অন্বেষা প্রকাশনের শাহাদাত হোসেন, অনিন্দ্য প্রকাশের আফজাল হোসেন প্রমুখ। অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন সোসাইটির সভাপতি মোশতাক আহমেদ। এছাড়া বইগুলোর লেখকরাও উপস্থিত ছিলেন।
নতুন বই
বাংলা একাডেমির তথ্যমতে, শনিবার মেলায় এসেছে ১৩৫টি নতুন বই। এর মধ্যে গল্প ২৫, উপন্যাস ২২, প্রবন্ধ ১, কবিতা ৪২, গবেষণা ৩, ছড়া ৫, জীবনী ৫, রচনাবলী ১, মুক্তিযুদ্ধ ৬, নাটক ১, বিজ্ঞান ১, ভ্রমণ ৩, চিকিত্সা/স্বাস্থ্য ১, কম্পিউটার ১, সায়েন্স ফিকশন ১ ও অন্যান্য ১৭টি।
উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে আগামী থেকে হাসনাত আবদুল হাইয়ের ‘শুচিতা’, আফসার ব্রাদার্স থেকে মুহম্মদ জাফর ইকবালের ‘যখনি জাগিবে তুমি’, মাওলা ব্রাদার্স থেকে মহাদেব সাহার ‘মধুর মুহূর্তগুলি চলে যায়’, বেঙ্গল পাবলিকেশন্স থেকে শাহ্নাজ মুন্নীর ‘থেমেছে শহর’, প্লাটফর্ম থেকে আবু হাসান শাহরিয়ারের ‘কিছু দৃশ্য অকারণে প্রিয়,’ ঝিঙেফুল থেকে রণজিত্ কুমার বিশ্বাসের ‘দুরন্ত দুপুর’, কাব্যগ্রন্থ থেকে তুষার আবদুল্লাহর ‘তোমাকে পাঠ করিব’, অন্য প্রকাশ থেকে ‘সেলিনা হোসেনের সেরা ১০ গল্প,’ পূরবী বসুর ‘সেরা ১০ গল্প’, বটেশ্বর বর্ণন থেকে আলী ইমামের ‘জাতক কাহিনী’, কথা প্রকাশ থেকে আহসান হাবীবের ‘অরম্য রম্য’, জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী থেকে বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির ‘ভাষা আন্দোলনের দলির সংকলন’, স্বরবৃত্ত থেকে সেলিনা হোসেনের ‘সোনার তরীর ছোট মনিরা’, শামীম পাবলিশার্স থেকে শাহজাহান আবদালীর ‘ছোটদের প্রিয় শেখমুজিব’। বইমেলায় ছায়াবীথি প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে তানভীর অপুর ভ্রমণকাহিনী ‘যাত্রা হলো শুরু’। বইটিতে বর্ণনা করা হয়েছে পাঁচ দেশের পাঁচ শহরে ভ্রমণের কাহিনী। শহরগুলো হলো রেগভিক, ল্যাপল্যান্ড, কোপেনহেগেন, স্টকহোম ও হেলসিংকি। বইটিতে ভ্রমণ বর্ণনার পাশাপাশি রয়েছে আলোকচিত্র।
মূলমঞ্চের আয়োজন
গতকাল সকাল ১০টায় বাংলা একাডেমির মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় শিশু-কিশোর সাধারণ জ্ঞান ও উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্ব। প্রতিযোগিতায় বিচারক ছিলেন শিশু সাহিত্যিক সুজন বড়ুয়া, নাট্যজন মাসুম রেজা এবং বাংলা একাডেমির পরিচালক শাহিদা খাতুন। বিকাল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় ‘বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধচর্চা: অতীত থেকে বর্তমান’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন অধ্যাপক মেসবাহ কামাল। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন ইতিহাসবিদ অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, ড. মোহাম্মদ সেলিম ও দিব্যদ্যুতি সরকার। সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক সনত্কুমার সাহা। অনুষ্ঠানের শুরুতে প্রয়াত কবি কায়সুল হকের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আবৃত্তি পরিবেশন করেন আবৃত্তি শিল্পী নিমাই মণ্ডল ও তামান্না নীপা। সোহেল রহমানের পরিচালনা নৃত্য পরিবেশন করেন নৃত্য সংগঠন ‘শিখর কালচারাল অর্গানাইজেশন’-এর শিল্পীরা। এছাড়াও সঙ্গীত পরিবেশন করেন কণ্ঠশিল্পী জিনাত রেহানা, বদরুন্নেসা ডালিয়া, শ্যামা সরকার, জয় শাহরিয়ার, পল্লব গোমেজ, রাজু আহমেদ ও জুলি শারমিলী।
আজকের আয়োজন
আজ রবিবার মেলা শুরু হবে বিকাল ৩টায় এবং চলবে রাত ৮টা পর্যন্ত। বিকাল ৪টায় গ্রন্থমেলার মূলমঞ্চে অনুষ্ঠিত হবে ‘বাংলাদেশে রবীন্দ্রচর্চা: অতীত থেকে বর্তমান’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠান। বিকাল ৪টায় বাংলা একাডেমির শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে অনুষ্ঠিত হবে বিরূপাক্ষ পাল রচিত ‘সিডনির পথে পথে’ বইটির প্রকাশনা উত্সব।
