লোভী মত্স্য শিকারীরা সিলেট অঞ্চলের খাল-বিল, জলমহাল, হাওর ও জলাশয়গুলোর পানি সেচে পুরোপুরি শুকিয়ে ফেলে মাছ ধরছে। নির্বিচারে মত্স্য শিকারের ফলে মারা পড়ছে মা মাছ। এতে ব্যাহত হচ্ছে মাছের স্বাভাবিক প্রজনন। বংশ বিস্তার করতে না পারায় বিলুপ্তির পথে দেশীয় অনেক প্রজাতির মাছ। মা মাছ নিধনের ফলে ভবিষ্যতে জলাশয়গুলো পুরোপুরি মাছ শূন্য হয়ে যাবে বলে আশংকা সংশ্লিষ্টদের।
বাংলা কার্ত্তিক-অগ্রহায়ণ মাস থেকে শুরু করে ফাল্গুন-চৈত্র পর্যন্ত জলাশয় শুকিয়ে মাছ ধরা হচ্ছে। সরকারি উদ্যোগে এ সময়টাতে মাছের জন্য একটি অভয়াশ্রম তৈরির পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সরেজমিনে সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার বিভিন্ন উপজেলা ঘুরে দেখা গেছে, জলাশয়গুলোতে পানি কম থাকায় অনেক স্থানে স্থানীয়রা পাম্প মেশিন দিয়ে পানি সেচে শুকিয়ে মাছ শিকার করছে। এমনকি কাদার ভেতরে লুকানো মাছও ধরা হচ্ছে।
সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার অধিকাংশ জলমহাল শুকিয়ে মাছ ধরার মহোত্সব চলছে—এমন অভিযোগ করে স্থানীয়রা জানান, ভয়ে ইজারাদারদের বিরুদ্ধে এলাকার সাধারণ মানুষ মুখ খুলেন না।
জলমহাল নীতিমালার আলোকে বাংলা সাল হিসেব করে বিভিন্ন শর্তে এসব জলমহাল বন্দোবস্ত দেয়া হয়। প্রতিবছর মাঘ ও ফাল্গুন মাসের মধ্যে জলমহালগুলোর মাছ আহরণ করে ইজারাগ্রহীতারা। মত্স্য সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী জলমহালগুলোতে তিন ফুট পর্যন্ত পানি রেখে মাছ ধরার বিধান রয়েছে। এছাড়া নীতিমালার ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদে পানি শুকিয়ে মাছ ধরা যাবে না বলে শর্ত রয়েছে। কিন্তু সরকারি বিল ইজারাদাররা শর্ত লংঙ্ঘনের পাশাপাশি মত্স্য সংরক্ষণ আইন অমান্য করে বিলের পানি শুকিয়ে মাছ ধরছে।
জামালগঞ্জ উপজেলার ছয়হারা গঙ্গাধরপুর মৌজার ছয়হারা নদীতে দুটি পাওয়ার পাম্প মেশিন বসিয়ে বিল সেচা হচ্ছে। একইভাবে ভীমখালী ইউনিয়নের তেরানগরের ব্রিজের পাশে দোলতা নদীতে সেচের কাজ চলছে একটি বড় পাওয়ার পাম্প দিয়ে। কাশীপুর ও লক্ষ্মীপুর গ্রামের মাঝামাঝি গুল বিলে বড় কয়েকটি পাওয়ার পাম্প দিয়ে, গঙ্গাধরপুর গ্রামের সামনেরা বিলে ও বিনাজুড়ায় মেশিন দিয়ে চলছে বিল সেচ কাজ।
জেলা মত্স্য কর্মকর্তা সুলতান আহমদ গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, বিল-জলাশয় শুকিয়ে মাছ ধরা বেআইনি। তাছাড়া এই পদ্ধতিতে মাছ ধরলে মাছের অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। তিনি বলেন, অভিযোগ পেলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে এ বিষয়ে গণসচেতনতা তৈরি করতে হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মত্স্য গবেষক জহুরুল ইসলাম বলেছেন, বিল শুকিয়ে মাছ ধরার ফলে মাছের বংশবৃদ্ধির স্বাভাবিকধারা ব্যাহত হবে। মাছের বংশবৃদ্ধি না হলে মানুষ প্রোটিনের চাহিদা থেকে বঞ্চিত হবে। মাছের প্রজননের স্বার্থে মা-মাছগুলোকে অবশ্যই বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলের পশ্চিম ভাড়াউড়া এলাকা সংলগ্ন বিভিন্ন বিল-জলাশয়ে ইজারার শর্ত ভঙ্গ করে সেচের মাধ্যমে বিল শুকিয়ে মাছ ধরা হচ্ছে। গত বছরের ১৪ নভেম্বর হাইল হাওরের বিভিন্ন বিলে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে প্রায় তিন লাখ টাকার অবৈধ জাল জব্দ করে পুড়িয়ে দেয়া হয়।
শ্রীমঙ্গল উপজেলায় ছোট-বড় প্রায় ৬০টি জলমহাল রয়েছে। ২০ একরের ঊর্ধ্বে ২০ এবং ২০ একরের নিচে ৪০টি জলমহাল রয়েছে।
নলুয়ার হাওরে চাষাবাদ সংকটে:
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার বৃহত্ নলুয়ার হাওরে বিল শুকিয়ে মাছ নিধন করা হচ্ছে। এতে বিশাল আয়তনের বোরো জমি চাষাবাদ হুমকির মুখে পড়েছে। কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। প্রতিকার চেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট আবেদন করেছেন ভুক্তভোগী কৃষকরা। জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হুমায়ূন কবির বলেন, বিলের পানি সেচ বন্ধ করতে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
