১৯৭৯ সালে চারুকলায় পাঠ শুরু করা শিল্পীদের দ্বিতীয় দলগত প্রদর্শনী এখন চলছে জয়নুল গ্যালারিতে। গত বছরের জানুয়ারিতে তাঁদের প্রথম প্রদর্শনী হয়েছে। এবারের প্রদর্শনীতে ২৩ জন শিল্পী অংশ নিয়েছেন ।
এই ব্যাচের শিল্পীরা নানা পেশায় নিয়োজিত। টেলিভিশন, খবরের কাগজ, সমাজসেবা ও বিসিক নকশাকেন্দ্রে সম্পৃক্ত আছেন বেশ কয়েকজন। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছেন। বিজ্ঞাপন সংস্থা ও প্রকাশনাশিল্পে কয়েকজন নিয়োজিত। কেউ মডেলিং ও অভিনয় করছেন। পেশাদার শিল্পচর্চায় নিয়োজিত আছেন কেউ কেউ।
ইউনেস্কো ঘোষিত বিশ্বঐতিহ্য—পয়লা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রার ধারণা প্রথম এসেছে— যশোর চারুপীঠের উদ্গাতা ভাস্কর মাহাবুব জামাল শামিম ও শিল্পী হিরন্ময় চন্দের মাথা থেকে। এই দুই কৃতিশিল্পী ১৯৭৯ ব্যাচের। এ দলের ছয় জন শিল্পী ২০১৩ সালে ৫৫তম ভেনিস বিয়েনালে অংশগ্রহণ করেছেন। তাঁরা হলেন—চারুকলা অনুষদের ভাস্কর্য বিভাগের অধ্যাপক লালা রুখ সেলিম, ভাস্কর মাহাবুব জামাল শামিম, শিল্পী মোখলেসুর রহমান, রোমপ্রবাসী শিল্পী উত্তম কুমার কর্মকার, ডাকসুর সাবেক সাংস্কৃতিক সম্পাদক শিল্পী অশোক কর্মকার ও জাহিদ মুস্তাফা। আশির দশকে আলোচিত শিল্পীদল সময়ে-এর সাথে যুক্ত ছিলেন ভাস্কর সেলিম আহেমদ।
প্রদর্শনীতে নিজের গড়া মৃিশল্পকর্ম ‘রাজাহাতি’ নিয়ে অংশ নিয়েছেন চারুকলা অনুষদের মৃিশল্পের সহযোগী অধ্যাপক স্বপন কুমার সিকদার। শিল্পী টেপামাটির পুতুল তৈরির ঐতিহ্যকে ধরে রেখে শিল্পিত সুষমায় তিনটি হাতির বহর উপস্থাপন করেছেন। শিল্পী রুস্তম আলী দু’টি টাইলসে প্রকৃতির ছবি এঁকেছেন।
শিল্পী আফরোজা জামিল কংকা ও মিনি করিম জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা প্রদর্শনী ও ওয়ার্কশপে অংশগ্রহণ করেন। আফরোজা তাঁর দু’টি ক্যানভাসে অ্যাক্রিলিক রঙে সুন্দরবনের গহন রূপটি তুলে ধরেছেন আলোছায়ার পর্দা তৈরি করে। সবুজ আর হলুদ ও সাদা বর্ণের সমন্বয়ে দু’টি দৃষ্টিনন্দন ছবি এঁকেছেন মিনি করিম। শিল্পী ধনঞ্জয় মণ্ডল তিন দশক ধরে ইংরেজিমাধ্যম স্কুলের শিক্ষার্থীদের আঁকা শেখান, নিজেও আঁকেন। এ প্রদর্শনীতে ক্যানভাসে অ্যাক্রেলিক মাধ্যমে আঁকা তাঁর দু’টি কাজ প্রদর্শিত হচ্ছে।
দশম এশীয় চারুকলা প্রদর্শনীতে গ্র্যান্ড পুরস্কার পেয়েছিলেন শিল্পী মোখলেসুর রহমান। পৃথিবীর নানা দেশে তাঁর চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হয়েছে। এ প্রদর্শনীতে মিশ্রমাধ্যমে বাস্তবানুগ করে আঁকা তাঁর ‘শাপলার বন’ প্রদর্শিত হয়েছে। এটি আমাদের জলমগ্ন প্রকৃতির রূপকে মনে করিয়ে দেয়।
নানা মাধ্যমে কাজ করে প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন—এক দৈনিক পত্রিকায় কাজ করা তিন শিল্পী। তাঁরা হলেন শিল্পী অশোক কর্মকার, মাসুক হেলাল ও মাহবুবুর রশিদ মজনু। অশোক মাটি ও প্রাকৃতিক রঙ দিয়ে ক্যানভাসের কেন্দ্রস্থলে সরাফর্মে এক বংশীবাদকের ছবি এঁকে বাংলার ঐতিহ্যবাহী চিত্রধারাকে নতুন আঙ্গিকে তুলে ধরেছেন। মাসুক কলম দিয়ে মোটারেখার দুজন বিশিষ্ট মানুষের প্রতিকৃতি এঁকেছেন। মাহবুবুর রশিদ মজনু জ্যামিতিক ও স্কয়ার ফর্ম নিয়ে নানাবর্ণে ক্যানভাসে খেলেছেন।
শিল্পী সৈয়দ সাইফুর রহমানও তাঁর চিত্রপটে জ্যামিতিক বর্গ নিয়ে নয়নরঞ্জক ছবি এঁকেছেন। তাঁর আরেকটি চিত্রের জ্যামিতিতে নগরকেন্দ্রের নান্দনিকতা উঠে এসেছে। আনোয়ার আরিফ ‘মাছের ভয়’ শিরোনামে নীল জলাশয়ে ও জালে আটক রঙিন একদল মাছের দু’টি ছবি এঁকেছেন।
শিল্পী হিরন্ময় চন্দ অঙ্কন প্রধান কাজ করেন। এবার জলরঙে প্রকৃতির মুগ্ধতাকে এঁকেছেন। আলতাফ হোসেন শরীফ বাংলার নিসর্গ নিয়ে বাস্তবানুগ ছবি আঁকেন। তাঁর চিত্রকর্মে নদীর ধারে খুঁটির ওপর বসে বক ও অনতিদূরের নদীবক্ষে নৌকায় মানুষের পারাপারের চিত্র দক্ষতার সাথে তুলে ধরেছেন। মিজানুর রহমান চিত্রপটে নদীর আবহ তৈরি করে একদল রঙিন মাছের অনুকৃতি যুক্ত করেছেন। মনোজ পাল আঁকেন আলোছায়াময় ফিগারেটিভ ছবি। শাহিন আকতার অ্যাক্রেলিক ও তেলরঙে জ্যামিতিক নানা বর্গ ও আয়তাকার নিয়ে খেলেছেন। ইশরাত শেখ জলাশয়ে শাপলার রূপকে বিশ্লেষণ করেছেন।
মানুষ ও প্রাণিজগতের প্রেম শিল্পীদের একটি প্রিয় বিষয়। ভাস্কর হাবিব কাঠখোদাই করে ফুল ও লতাপাতার আবহে দুই জোড়া পাখির পারস্পরিক আকর্ষণ তুলে ধরেছেন। তথৈবচ রেজা লোহার রড প্রয়োগ করে গড়া তাঁর ভাস্কর্যে দুই দম্পতিকে তুলে ধরেছেন। সায়মা টাইলসে দম্পতির অবয়ব গড়েছেন। নাকভিন পোড়ামাটিতে দু’টি পাখির অবয়ব গড়েছেন। তাঁদের কাজে ভালোবাসার টান প্রতিফলিত হয়েছে।
সেলিম আহেমদ টিভি নাটকের অভিনেতা, প্রচ্ছদশিল্পী, লেখক ও ভাস্কর। তিনি মাইক্রোফোনের নানামুখ গড়েছেন রাজনীতি, টকশো-র পক্ষ-বিপক্ষ উপলক্ষ করে। সহপাঠীদের সাথে আমার অংশগ্রহণ বসন্ত ঋতুর বর্ণিলতার সাথে প্রকৃতির পরিবর্তন নিয়ে আঁকা দু’টি চিত্রকর্ম নিয়ে।
প্রদর্শনী দেখে শিক্ষক শিল্পী রফিকুন নবীর অভিমত—অঙ্কনে ও কর্মসাধনায় এই শিল্পীদলের অনেকেই এগিয়েছে। বছরে একবার করে এই শিল্পীদলটির এক হওয়াকে অন্যদের জন্য অনুকরণীয় বলে তিনি এই শিল্পীদলকে অভিনন্দিত করেছেন। এই প্রাপ্তিটুকু তো কম নয়!
চারুকলার জয়নুল গ্যালারি-১-এ সপ্তাহব্যাপী আয়োজিত এ প্রদর্শনী চলবে আগামী ১৫ মার্চ শুক্রবার প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত।
