জলম্ধর

আপডেট : ১৪ মার্চ ২০১৯, ১৯:২৭

মনো ডাক্তারের দেড়মণের কলাইর বস্তাটা নূরুল ইসলামের মাথায়। গরুর গাড়ি থেকে নামিয়ে বেশ কিছুক্ষণ হয় মাথায় নিয়েছে। এঁকে বেঁকে সে বাইজানা পুলের মাঝামাঝি পৌঁছাল। বেলা তখন বেশির ভাগ নেই। তার পা কাঁপছিল। ইউনিয়ন বোর্ডের কাঠের পুরাতন পুল। ওপারে গিয়ে সাহস জোগাতে জোগাতে ডাক্তার বলছিল—‘হ্যাঁ-হ্যাঁ, সামনে পা দে; না না বাঁয়ে।’ ওর পা আপ-ডাউন করতে বুড়ো মানুষের দাঁতের মতো নড়বড় করছিল পুলটি। এর বেশি অর্ধেক আসতে বিশ মিনিট লেগে গেছে। এখন ধৈর্য নেই। দৌড়ে আসতে চেয়েই বিপত্তিটা ঘটাল। কোনোমতে নিজেকে বাঁচাল; কিন্তু বস্তাটি পড়ল বাইজানা খালের কিনার ঘেঁষে ডান দিকে।

‘দিলি তো মাডি কইর্যা’ মনো ডাক্তারের মুখে বিরক্তির ছাপ। নূরুল ইসলামের তাতে কিছুই আসে-যায় না। মাথাটা তার হালকা। ক্লান্তিতে বসে পড়ল সে। অল্পের জন্যে কাজ উদ্ধার হলো না। বিরক্তির সাথে সাথে ডাক্তারের চোখে মুখে হতাশার ছাপ। সে নরম সুরে ডাকল, ‘অ... নূর...উ।’ ‘কইন কাহা’। নূরু গলা বাড়াল। ‘কালাই গুলাইন ভিজ্যা যাবো তো, তাড়াতাড়ি কর।’ ডাক্তারের কথা শেষ হতেই নূরু গলা হাঁকালো। ‘একখান বিড়ি দেইন আগে।’ ‘একখান না, একখান না; যা এক প্যাকেট দিমুনে, তোল।’ ডাক্তারের ওপর হতাশা-বিরক্তি ভর করেছে। ‘খাবার দিবাইন কাহা’—নূরুল ইসলাম দাঁত বের করল। ‘দিমুনে-দিমুনে।’ চোয়াল শক্ত হলো ডাক্তারের। ...

নিচে নেমে নূরুল ইসলাম বস্তাটা নাড়িয়ে দেখল; এক অংশ ভিজে গেছে। বস্তা আগের চেয়ে ভারী। নূরুল ইসলাম ডাক ছাড়ল—‘কাহা।’

‘কী, কস্।’

‘তুলন তো যায় না।’ 

ডাক্তার ভেবে পাচ্ছিল না। জনৈক পথচারী পেয়ে ডাকল, ‘কেডা যায়...?’

‘আমি মোতালেব’। বলে সামনে আসলো মোতালেব।

‘বাবা মোতালেব।’

‘কইন।’  

‘অইডারে বস্তাটা একটু ধইর্যা দেও না।’ ডাক্তার নূরুল ইসলামকে দেখাল।

হোক কমপাউন্ডার। গ্রামের মানুষের কাছে সেই বড় ডাক্তার। হাতযশ বেশ ভালো। গ্রামের সবেধন নীলমণি ডাক্তার বলে মোতালেব না করতে পারল না। নিচে তাকিয়ে দেখল—নূরুল ইসলাম বোকার মতো দাঁত বের করে হাসছে।

‘অই, এই বস্তাডা তুলবার পাস না; খাস তো কম না।’ বীরত্ব দেখাল মোতালেব। কিন্তু নিচে নেমে বস্তা ধরে ‘থ’। শেষ পর্যন্ত বস্তাটি উঠেছিল নূরুল ইসলামের মাথায়। বস্তা নেয়ার পর খ্যাতি-কুখ্যাতি দুটোই বাড়ল। কুখ্যাতিটি খাওয়ার জন্য। মনো ডাক্তারের বউ সেদিন তিন বার ভাত চড়াল। শূন্য থালা চাটতে দেখে ডাক্তার বলছিল, ‘কী রে আরো লাগবো?’ নূরুল ইসলামের সাফ কথা, ‘তিন দিন বাত খাইনাই তো।’

‘আইছ্যা আইছ্যা। ও বিমলের মা’; ডাক্তার বউকে ডাকল। বউ খেঁকিয়ে উঠল, ‘এমুন মাইনষেরে মাইনষে খাওয়ায়? তার থেইক্যা পাঁচ সের কালাই দিবার পারছিল না?’ নূরুল ইসলাম এসবে কান না দিয়ে আঙুলগুলো চুষনি চাটা চাটছিল। ডাক্তার সিগারেটে টান দিয়ে গলা ঝারল। ‘আরে দেও দেও, নিত্যি তো আইতো না।’ মহিলা ঘরঘর শব্দ করে, পুরো গামলা ভাতসহ তরকারি-ডাল, ঢেলে দিল ওর পাতে। নূরুল ইসলাম খাচ্ছে। ছোটরা ওর দর্শক। যেন নাটক দেখছে। গায়ে কোনো সুতা নেই, ধান বাড়ানির সেই ছেলে দু’বার ভাতের নলা চেয়ে ব্যর্থ হয়েছে। খাওয়া শেষে পাতাটা দূরে ফেলল সে। লেপল খানিক। হিন্দুবাড়ির ওসব কাজের কৌশল তার জানা। কানে গোঁজা বিড়ি ধরাতে ডাক্তারের সাহায্য চাইল। ডাক্তার ওর পেটটা দেখছিল। বড় সাইজের যেন একটা কলসি। খাবার পেটে বেশি পড়লে পেটুক বলে। এখানকার লোকেরা বলে জলম্ধর। পেটুক নূরুল ইসলাম হঠাত্ নাম পেল জলম্ধর। খেয়ে ঢেকুর তোলে, ঠোঁট-খোলা হাসিতে বলল, ‘তিনদিন খাই নাই তো।’ ডাক্তার বিড়ি ধরাতে নিজের জ্বলন্ত সিগারেটের শেষ অংশটা দিয়ে বলল—‘হুন, তরে একটা কতা কই’

‘কন কাহা’ নূরুল ইসলামের তৃপ্তির গলা।

‘কতা অইলো খাওয়নডা সবসময় রইয়া সইয়া খাওয়ন লাগে। ডাক্তারি বিদ্যা তা-ই কয়। ডাক্তার ক্যান, গেরামের মাইনষে কয় হুনস না। ‘উনা ভাতে দুনা বল/অতি ভাতে রসাতল।’ হুন্ বেশি কইরা জল খাবি। বুঝলি?’

‘হ’ অহন আহি কাহা।’

‘আয়’ বলে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়াল ডাক্তার। নূরুল ইসলাম বিড়িটার আয়ু শেষ করে ধোঁয়া ছেড়ে, ছুটল বাজারের দিকে। পঙ্গপালের মতো পেছন ছুটল ছেলেরা। ওরা চেঁচাল—‘নূরুল ইসলাম জলম্ধর/ খাইয়া খাইয়া মরণ তর।’ নূরুল ইসলাম ভয় দেখানোর ভঙ্গিতে পেছন তাকাতেই ছেলেরা চুপচাপ দাঁড়িয়ে গেল। স্মিত হেসে ও যখন শব্দ করে বায়ু ছাড়ল ছেলেরা তখন একযোগে নাক ধরেছে। রাজ্যের ঘিন্নায় ওরা বলল, ‘ওয়াক থু’। নূরুল ইসলাম বাঁশ ঝোপটা অতিক্রম করে; একটু করে ও হারাচ্ছিল। ওর সমস্যাটা এখন বড়। গায়ে পড়ে যে কারো কাজে সে যেমন নাছোড়; চেনা-জানার মধ্যে কাজ দিতে তেমনি যে কেউ নারাজ। জগাই বাড়ির বষ্টি বুড়ি, যার দেড় ঠ্যাং শ্মশানে; সেও চিত্কার করছে, ‘অরে কাম দিয়ো না বউমা। সাক্ষাত্ জলম্ধর। দেড় মুন চাইলের বাত খায় বইস্টায়—।’ অনেকে মিলে বলেছে, ‘অ আবুতারার মা, তোমার নূরুরে জিনে ভর করছে।’ যে গৃহস্থের মাঠের তাড়া, সে গলা বাড়াল, ‘কবিরাজ ডাহো। আমরা খরফাতু দফাদারের কাছে হুনছি, হের দাদাও এই রহম খাইতো। সবাই অবাক, এত খাবার রাহে কই? হুনছি পরে; হে যা যা খাইতো, কবিরাজ আইয়া বাইর করতো। সব দফাদারের পুষ্কুনির পাড়ে জইম্যা থাকতো। আরে মিছা না।’ বলতে বলতে লাঙল-জোয়াল কাঁধে নিয়ে সে বেরিয়ে পড়ল। আরেকজন কিছু বলার আগেই আবুতারার মায়ের গলার ঝাঁজ— ‘নির্বইংশারা, মাথা খাওরা, চোখ খাওরারা, ফুইল্যা মরে।’ বাড়ির দিকে গেল সে। বাপ-মরা সংসারে নূরুল ইসলাম বড়, আবু তাহের মানে আবুতারা ছোট। বাটুল মেঝো। সংসার চলে বাটুলের দিন চুক্তি কাজে। আবুতারা ঘাটুর দলে মেয়ের পার্ট করে। ওরটা চলে কোনোমতে। নূরুল ইসলামের আগে চলত। এখন অসুবিধে। বাড়িতে সে বেকার। সপ্তাহখানেক যখন ও মায়ের অন্ন ধ্বংসে লিপ্ত, তখনই মা অভিযোগটা করেছে বাটুলকে। ‘অ বাডুল, এই দুরমুইশ্যাডারে বাইর কর। সাতদিন ধইর্যা ভাতের মার খাইতাছি।’ খেঁকিয়ে ওঠে বাটুল—‘ক্যা মার খাওকে ? চাইল দেই হেডি কী অয়?’ ‘জানস না বাড়িত একটা রাক্ষস আছে। অর লাঙ্গেরা খাবার দেয় না, অহন আমার ভাগ মাইর্যা খায়।’ ওর মা নূরুল ইসলামকে বুঝাল। মুহূর্তে রক্তটা মাথায় উঠল বাটুলের। দেউরির খুঁটি দিতে যে খুন্তিটা ব্যবহার করছিল তা-ই উঠল নূরুল ইসলামের মাথায়।

চিত্কার হৈ-হল্লায় লোক ভরে গেল। মোড়ল ও মৃধা বাড়ির লোকজন ওদের বাড়ি উপচে পড়েছে। বাটুল যেতে পারেনি। লোকজন পিঠমোড়া বেঁধে ঘা কতক দিচ্ছিল। চিত্কার পেরে সে তা হজম করছিল। মা-ফিরাতে এসে কয়েক ঘা খেয়েছে। গ্রামের বিশ্বস্ত কদ্দুস কেরানী; ফার্মেসির গেদা ও মনোরঞ্জন ডাক্তার কিছুটা কারিশমা দেখিয়ে মুক্তাগাছার হাসপাতালে পাঠিয়েছে নূরুল ইসলামকে। বনবাংলা গ্রামের সবার মুখে এখন নূরুল ইসলামের প্রশংসা। যেন দেবদূত হয়ে ফিরে এসেছে।

সবাই বলল, ‘পেটুক হোক মানুষ তো’। ‘কারো তো কোনো ক্ষতি করেনি’। এমন হাওয়া থাকতেই নূরুল ইসলাম হাসপাতাল থেকে বিদায় নিয়ে এসেছে। ওর মাথা ন্যাড়া। সেলাই পড়েছে চারটি। ব্যান্ডেজ মাথায়। হাটের লোকেরা প্রশ্ন করে, ‘নূরু অহন কীরম, বেদনা করে?’ ‘এট্টু-এট্টু’। নূরুল ইসলাম দাঁত বের করল। ব্যান্ডেজ খোলার পর পর্যন্ত রাক্ষুসে ক্ষুধাটাকে সে যে কীভাবে সামলিয়েছে নিজেও জানে না। ডাক্তার তাকে নিষেধ করেছে ভারী কিছু নিতে। কিন্তু তা কেয়ার করলে উপোস থাকতে হয়। পুরনো নেশা তাই ছাড়তে পারল না সে। বুধবারে বড় বাজার। ইয়াকুব বয়াতি ধানের বস্তা নিয়ে বয়সের ভারে কুলোতে পারছিল না। নূরু বলল, ‘চাচা আমি লই।’ শক্ট পাওয়ার মতো ছিটকে উঠল বয়াতি, ‘আরে না না, লাগত না।’

‘আন্নের যা খুশি দেইন যে।’ নরম গলা ওর। বয়াতি বলল, ‘দুইটা বিড়ি পাবি।’ তাতেই বস্তাটা নিল সে। তার পরদিন; রাস্তার যত লোককে  সে অনুরোধ করেছে, সবারই এক ভয়, এক কথা, ‘খাবার দিবার পারতাম না।’ নূরুল ইসলাম খাবার চায়নি তবু ওরা ভয়ে বোঝা দেয়নি। কিছুদিন পর বষ্টি বুড়ি কোলে লাকড়ি নিয়ে ও-পথ দিয়ে বাড়ি যাচ্ছিল। ভাবছিল জিরুবে কি-না। হঠাত্ বাজপাখির মতো ছোঁ-মেরে লাকড়ির আঁটিটা নিয়ে নিল। তারপর ভোঁ দৌড়। বষ্টি বুড়ি ঘাটা-বকা করে যখন বাড়ি এল; তখন নূরুল ইসলাম কলাপাতা নিয়ে বসা। বষ্টি বুড়ি পারলে ওকে চিবিয়ে খায়। বকবক করতেই থাকে, ‘হুদাই ভাইয়ে মাতা ফাডায় তর।’ একটু থেমে খিস্তি দেয়, ‘নির্বইংশা। অহন আমার খড়ি গুলাইন ধোয়ন লাগবো।’

‘ধয়ন লাগবো ক্যা’—নুরুল ইসলামের কণ্ঠে সরল প্রশ্ন। ‘হারামজাদা, জানস না তুই মুচলমান।’ খেঁকিয়ে ওঠে বুড়ি। বষ্টি বুড়ির ছেলে-বউ একথাল ভাত কলাপাতায় ঢেলে বলল, ‘খাক, আমি ধুইয়া দেইরো।’ তেলে-বেগুন পড়া অবস্থা বুড়ির। ভ্যাঙ্গাল—‘আমি ধুইয়া দেইরো। অত সাওগারি লাগতো না।’ বষ্টিবুড়ির ছেলেবউ নূরুল ইসলামের গোল করে রাখা পাতার মধ্যে ভাত ক’টা ছাড়তেই বুড়ির জ্বলনিটা বাড়ল—‘অত পিরিত মন লয়, বাপের বাড়িত থেইক্যা আইন্যা দিবার পায় না।’ শরীর পড়লেও গলা পড়েনি। একটু দমে আবার বলল, ‘এমন জলম্ধররে মাইনষে খাবার দেয়!’ কথাগুলো শুনতে শুনতেই নূরুল ইসলাম রাস্তা মাপে।

এরপরে অনেকদিন গত। নূরুল ইসলামের সঙ্গে কারো দেখা নেই। সবার ধারণা খাবার জন্যেই গ্রাম ছেড়েছে সে। এখন বলাবলিও হয় না। সত্যি বলতে গ্রামে সে এখন অতীত। হঠাত্ নূরুদ্দিন মাস্টারের ছেলে মোস্তফার মাথায় কী বিগার চেপেছে, যাকে পায় তাকে ধরেই বলে, ‘জলম্ধরডা আমারে খোয়াব দেহাইছে, খালি কয়, আর খামু না। আমি ওরে ভাত খাওয়াইছিলাম। বারো কামলার ভাত। কামলারাও কইলো নূরু খাওচে দেহি। ও এই যে খাওয়া লইলো। হুদা মুসুরির ডাইল দিয়া, আমি বাপের জনমেও এমন খাইতে দেহি নাই। পেটটা ফুটবলের মতো অইয়া গেল। আমরা কইলাম ব্যাডাই তুই একটা। ও খাইল। শেষ নলাডা দিতেই অর চোখ গুলাইন বলদের চোক্ষের মতো অইয়া গেল। তারপরে ওই জঙ্গলডার মধ্যে যে ঢুকলো আর বাইরোইতে দেহি নাই। তারপর মোস্তফা জঙ্গলটা দেখাল।

জায়গাটা বসতহীন। নূরুল ইসলামের লাশ দেখার জন্য একদল পড়িমরি করে ছুটল জঙ্গলে। কিছুপরে নাকবন্ধ করে এল সড়কে। মোস্তফার কথা কেউ বিশ্বাস করল, কেউ করল না, অনেকেই বলল—‘ওডা জিনের কাম।’ এ সময় ভিড় ঠেলে ষাটোর্ধ্ব গেতুর বাপ বলল, ‘আরে জিন না, জিন না। তোমরা জানো না।’ সবারই চোখ বড় হয়ে উঠল। গেতুর বাপ তখন গল্পটা জুড়ল—‘হেইদিন শুক্কর বাইর্যা দিন। তিন রাস্তার মোড়ে ওই যে মনতার মায়ের পাগারপাড়ডা যে... অইহানে ঠান্ডার বাপ বহাবহি কইর্যা আগুন জ্বালাইতেছে। পাশের বাড়ির রমণী ধর জিগাইলো ‘ঠান্ডার বাপ, ওহানে কী করো গো?’ ঠান্ডার বাপ রাগ কইর্যা কইলো— ‘হারামজাদা জলম্ধরডা খালি রাস্তার মইধ্যে হাগে। অরে হাগাইতাছি। মন্ত্রপড়া দিছি। তিন দিনের মইধ্যে ও যদি পেট-ফাঁইপ্যা না মরে, তাইলে আমার নাম ঠান্ডার বাপ না।’ অনেকেই পরম উত্সাহে গেতুর বাপের কথাগুলোর সায় দিচ্ছিল। কেবল, আবুতারার মায়ের মুখ থেকে একটি কান্নার স্বরই বেরুচ্ছিল,—‘আমার পোলাডা কার বাড়াভাতে ছাই দিছিলো গো...’