বিনা ভোটে চেয়ারম্যানের সংখ্যা বেড়ে ৫০

আপডেট : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬, ০০:২১
ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে বিনা ভোটে চেয়ারম্যানের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। এ পর্যন্ত ৫০ জন প্রার্থী বিনাভোটে চেয়ারম্যান হওয়ার পথে রয়েছেন। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় যারা নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন তারা সবাই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী। প্রথম ধাপের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষদিন (২রা মার্চ) পর্যন্ত এ সংখ্যা আরো বাড়বে। বাছাইয়ে বিএনপির আরো ৩২ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। মনোনয়নপত্র জমা না দিতে পারা ৭০ জনের পর এখন সব মিলিয়ে ১০২ ইউপিতে দলটির কোনো প্রার্থী নেই। মনোনয়নপত্র জমাদানে বাধা ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় একাধিক লিখিত অভিযোগ এলেও কোনো ব্যবস্থা না নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গতকাল বৃহস্পতিবার বৈঠক শেষে একাধিক নির্বাচন কমিশনার ইত্তেফাককে এ তথ্য নিশ্চিত করেন। এদিকে ইউপি নির্বাচনের ভোটকেন্দ্রে কমছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। আগামী ৩ মার্চ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বৈঠকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে ইসি।
 
ইসিসূত্রে জানা গেছে, প্রথমবারের মতো দলীয়ভাবে অনুষ্ঠেয় ইউপি নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমার শেষদিনে ২৫ জন আওয়ামী লীগ প্রার্থীর বিপরীতে অন্যকোনো প্রার্থী ছিল না। গত মঙ্গলবার ও বুধবার বাছাইয়ে বিএনপিসহ অন্যদলের প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল হওয়ায় আরো ২৫ জন প্রার্থী বিনা ভোটে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন। এর মধ্যে বাগেরহাটে ২৬ জন, মাদারীপুরের শিবচরে ১৩ জন, ঝালকাঠির নলছিটিতে ৫ জন, বরগুনা সদর, ভোলা সদর, মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান, সাতক্ষীরার কলারোয়া, খুলনার তেরখাদা ও বরিশালের বানারীপাড়ায় একজন করে প্রার্থী রয়েছেন।
 
যেসব চেয়ারম্যান প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন সেখানে প্রতিপক্ষের প্রার্থীদের মনোনয়ন জমায় বাধা দানের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও গত মঙ্গলবার ও বুধবার প্রথমধাপের প্রার্থী বাছাইয়ে ৭৩৮টি ইউপির মধ্যে বিএনপি মনোনীত ৩২ জন চেয়ারম্যান প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল করা হয়। ফলে ১০২টি ইউপিতে ধানের শীষ প্রতীকে কোনো প্রার্থী থাকছেন না। মনোনয়নপত্র বাতিলের তালিকায় আওয়ামী লীগের ৩ জন চেয়ারম্যান প্রার্থী আছেন। স্বতন্ত্র ও অন্যান্য মিলিয়ে শতাধিক চেয়ারম্যান প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। দুই শতাধিক সাধারণ ও সংরক্ষিত সদস্যের মনোনয়নপত্রও বাতিল হয়েছে।
 
বাগেরহাট জেলায় আওয়ামী লীগের ২৬ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন। গত বুধবার বাছাইয়ে এ জেলায় পাঁচটি উপজেলার সাতটি ইউপির নয়জন চেয়ারম্যান প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করায় এগুলোতে একক প্রার্থী হিসাবে আছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থীরা। যাঁদের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে তাঁরা হলেন সদর উপজেলার খানপুরের বিএনপির প্রার্থী ও স্বতন্ত্র দুজন, কচুয়া উপজেলার বাধালের বিএনপির প্রার্থী, রামপাল উপজেলার পেড়িখালীর বিএনপির প্রার্থী। চিতলমারী সদর ও শিবপুর এবং মোল্লাহাট উপজেলার গাওলা ও চুনখোলার একজন করে স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। এর আগে গত সোমবারই ১৯টি ইউপিতে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার ১০টি ইউপির মধ্যে পাঁচটিতে বিএনপির প্রার্থীসহ সাতজন চেয়ারম্যান প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। ইউনিয়নগুলো হলো-কুলকাঠি, রানাপাশা, সিদ্ধকাঠি, মোল্লারহাট ও দপদপিয়া।
 
খুলনার তেরখাদা ইউনিয়নে এখন একমাত্র প্রার্থী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এস এম অহিদুজ্জামান। এর আগে সোমবার ওই ইউপিতে বিএনপির প্রার্থী এইচ এম মহিবুল্লাহর মনোনয়নপত্র ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগ উঠে।
 
মাদারীপুরের শিবচরে ১৬ ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে বিএনপির ১৫ প্রার্থীসহ ২৬ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। এখানে ১৩ জন আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী বিনাভোটে নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন। ভোলার ২ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে ৬ জন ও কাউন্সিলর পদে ২৭ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। শম্ভুপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দলীয় মনোনীত দুই চেয়ারম্যান প্রার্থীও রয়েছেন। এছাড়া বাতিল হওয়া তালিকায় চেয়ারম্যান পদে বোরহানউদ্দিন উপজেলার বড় মানিকায় ২ জন, কুতুবা ইউনিয়নে ১ জন, দৌলতখান উপজেলার দক্ষিণ জয়নগর ইউনিয়নে একজন।
 
স্বরূপকাঠির সুটিয়াকাঠিতে বিএনপির ৩ চেয়ারম্যান প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। বানারীপাড়ায় চেয়ারম্যান পদে বিএনপির একজনসহ ২ জন, সাধারণ সদস্য পদে ২ জন এবং সংরক্ষিত মহিলা সদস্য পদে একজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। বরগুনার পাথরঘাটায় ৭টি ইউনিয়নে ২৪ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। এর মধ্যে চেয়ারম্যান পদে ২ জন (চরদুয়ানী ইউনিয়নের বিএনপির চেয়ারম্যান প্রার্থী ও বর্তমান চেয়ারম্যান এম কামরুল ইসলাম) এবং সাধারণ ও সংরক্ষিত আসনে ২২ জনের প্রার্থিতা বাতিল হয়। সিরাজদিখান উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে ২ জন এবং মেম্বার পদে ৩ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। চেয়াম্যান পদে বাতিল হয়েছে কোলা ইউনিয়নে বিএনপির প্রার্থী আবু তাহেরের এবং লতব্দি ইউনিয়নে বর্তমান চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী মো. হাফেজ ফজলুল হক। কাউখালী উপজেলার শিয়ালকাঠী ইউনিয়নে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী আওয়ামী লীগ নেতা জাকির হোসেন দুলাল এবং ৪ সদস্য প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হয়।  কক্সবাজারে ৩ উপজেলার ১৯টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী জিয়াউর রহমানসহ দুই চেয়ারম্যান প্রার্থী ও সদস্য পদে ৮ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। পাবনার বেড়া উপজেলার ৯ ইউনিয়নে বিএনপির প্রার্থীসহ চেয়ারম্যান ২, সংরক্ষিত মহিলা মেম্বর ২ এবং সাধারণ মেম্বর পদে ১১ জনের মনোনয়ন বাতিল করা হয়। বরিশালের বাবুগঞ্জের দেহেরগতি ইউপিতে বিএনপির প্রার্থীসহ ৭ জন সদস্যর মনোনয়ন বাতিল হয়ে যায়। রংপুরে বিএনপি ও  আওয়ামী লীগ প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল হয়।
 
অভিযোগ আমলে নেবে না ইসি
 
ইউপি নির্বাচন নিয়ে প্রার্থীদের কোনো অভিযোগ আমলে না নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। উচ্চ আদালত থেকে এ বিষয়ে কোনো নির্দেশনা এলে ব্যবস্থা নেবে ইসি। গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন কমিশন এই সিদ্ধান্ত নেয়। প্রথমধাপের ৭৩৮টি ইউপিতে অধিকাংশ নির্বাহী বিভাগের কর্মকর্তাকে রিটার্নিং অফিসার হিসাবে নিয়োগ দিয়েছে কমিশন। ৩৪৩ জন রিটার্নিং অফিসারের মধ্যে ২৩৯ জনই উপজেলায় কর্মরত নির্বাহী বিভাগের প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা। এছাড়া ১০৪ জন আছেন উপজেলা পর্যায়ে নির্বাচনী কর্মকর্তা। এবার একজন রিটার্নিং অফিসারকে সর্বোচ্চ ৩টি করে ইউপির দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
 
কমছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য
 

আগামী ৩ মার্চ বেলা ১১টায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বৈঠকের পরিকল্পনা করেছে নির্বাচন কমিশন। রাজধানীর আগারগাঁও এনইসি সম্মেলন কক্ষে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। তবে ওই বৈঠকের জন্য কমিশনের করা কার্যপত্রে গতবারের চেয়ে এবার আইন-শৃঙ্খলা সদস্যর কমানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ২০১১ সালের ইউপিতে প্রতি ভোটকেন্দ্রে ২০ জন আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য ছিল। এবার দুইভাগে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে পাঁচজন পুলিশ সদস্যসহ ১৪ জন আনসার ও ভিডিপি এবং সাধারণ ভোট কেন্দ্রে ৩ জন পুলিশসহ ১৪ জন আনসার ও ভিডিপি সদস্য রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। ইসির সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দলীয়ভাবে অনুষ্ঠেয় ইউপি নির্বাচনে গতবারের চেয়ে এবার সহিংতার পরিমাণ অনেক বেশি। যেসব ভোট কেন্দ্রে বেশি বেশি আইন-শৃঙ্খলা মোতায়নের কথা, সেখানে কম আইন-শৃঙ্খলা মোতায়ন মোটেই ভালো সিদ্ধান্ত হবে না। এতে নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হবে।