সন্ত্রাসকবলিত ফেনীর সেই আলোচিত পরশুরাম উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের ভোট স্থগিত করে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। একইসঙ্গে তিন ইউপিতে প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র দাখিল করতে কেন যায়নি– সে বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এদিকে নির্বাচনের আচরণ বিধি লঙ্ঘন করে এলাকায় অবস্থান করায় আওয়ামী লীগের দুইজন সংসদ সদস্যকে চিঠি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইসি। তাদের সংশ্লিষ্ট এলাকা ত্যাগ ও ওই এলাকায় না যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে। আজ বুধবার পরশুরামের ভোট স্থগিত ও দুই এমপির এলাকা ত্যাগের চিঠি সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠানো হবে।
এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনার মোহাম্মদ আবু হাফিজ ইত্তেফাককে বলেন, ‘পরশুরামে ইউপি নির্বাচন কমিশনের কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। এ কারণে ভোট স্থগিত করে তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে কমিশন আগামীতে আরো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. জাবেদ আলী ইত্তেফাককে বলেন, ‘কমিশন সব জায়গায় অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করতে চায়। পরশুরামের তিনটি ইউপির ভোট স্থগিতের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি সংসদ নির্বাচনেও পরশুরামে ভোট অনুষ্ঠিত হয়নি। গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত পরশুরামের পৌরসভা নির্বাচনেও মেয়র, কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদে বিনা ভোটে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা নির্বাচিত হন। একই ধারাবাহিকতায় ইউপি নির্বাচনে বিনা ভোটে নির্বাচিত করার কৌশল গ্রহণ করে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। ৩১ মার্চ দ্বিতীয়ধাপে অনুষ্ঠেয় পরশুরাম উপজেলার তিনটি ইউপিতে ভোটের আগেই আওয়ামী লীগ মনোনীত তিনজন চেয়ারম্যানসহ ২৬ জন প্রার্থী নির্বাচিত হওয়ার পথে রয়েছে। পরশুরামের চিথিলা, বক্সমাহমুদ ও? মির্জানগর ইউপিতে গত ২রা মার্চ মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষদিনে বাধার কারণে অনেক প্রার্থী মনোনয়ন জমা দিতে পারেননি বলে কমিশনে অভিযোগ করেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ৩রা মার্চ পর্যন্ত মনোনয়ন দাখিলের সময়সীমা বৃদ্ধি করা হয়। এরপরেও আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্যকোন পক্ষের প্রার্থী মনোনয়ন দাখিল করেনি। তিনটি ইউপিতে আওয়ামী লীগের ৩ জন চেয়ারম্যান, ২৭টি সাধারণ সদস্যর মধ্যে ১৫ জন সদস্য, ৯টি সংরক্ষিত সদস্যের ৮ জন নারী সদস্য বিনাভোটে নির্বাচিত হতে চলেছেন। মোট ৩৯টি পদের মধ্যে ২৬টিতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হচ্ছেন প্রার্থীরা।
ইসির সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মঙ্গলবার সকালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে পরশুরামের তিনটি ইউপির ভোট স্থগিতের সিদ্ধান্ত হয়। ইসির সচিবালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব শাহেদ-উন-নবী চৌধুরীর নেতৃত্বে দুই সদস্যর কমিটিও করা হয়।
এর আগে ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার চেয়ারম্যান আবদুল আলিম ইউপি নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের কারণে ওই উপজেলার ৫টি ইউপির ভোটের তফসিল বাতিল করে কমিশন। গত ২রা মার্চ ফুলগাজী উপজেলার ফুলগাজী, আমজাদহাট, দরবারপুর, জিএম হাট, মুন্সিরহাট, আনন্দপুর ইউপির ভোটের তফসিল বাতিল করে উপজেলা চেয়ারম্যানকে বরখাস্তের সুপারিশ করে ইসি। একইসঙ্গে উপজেলা চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পুলিশ সুপারকে চিঠি দেয়া হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ফুলগাজী চেয়ারম্যানসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে পুলিশ মামলা করে। গত ৬ মার্চ স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে ফুলগাজী উপজেলা চেয়ারম্যানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
দুই এমপিকে এলাকা ত্যাগের নির্দেশ
ইউপি নির্বাচনে আচরণ বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের দুই এমপিকে নির্বাচনী এলাকা ত্যাগের নির্দেশের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। সংশ্লিষ্ট এলাকার রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে আজ বুধবার এ সংক্রান্ত লিখিত নির্দেশনা পাঠাতে যাচ্ছে ইসি সচিবালয়। এই দুই এমপি হলেন বরগুনা-২ আসনের শওকত হাচানুর রহমান রিমন এবং পাবনা-২ আসনের খন্দকার আজিজুল হক আরজু।
ইসি সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, কমিশনের অনুসন্ধানে এই দুই এমপির বিরুদ্ধে আচরণ বিধি লঙ্ঘনের বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। তারা নিজ উপজেলার ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীদের সমর্থনে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিচ্ছেন। এমনকি প্রকাশ্যে জনসভায় বক্তৃতা দেয়া ও মিছিল-মিটিং করছেন বলে কমিশন জানতে পেরেছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আচরণ বিধি অনুযায়ী সংসদ সদস্যরা নির্বাচনে প্রচারে অংশ নেয়ার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইসি কার্যালয়ের সচিব মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, কমিশনের লিখিত নির্দেশনা পাওয়ার পরে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে চিঠি পাঠানো হবে।
এর আগে পৌরসভা নির্বাচনেও বরগুনা-২ আসনের এমপি রিমনকে আচরণ বিধি লঙ্ঘনের কারণে ইসি থেকে শোকজ (কারণ দর্শানোর নোটিস) করা হয়। জবাবে এমপি রিমনের পক্ষ থেকে লিখিতভাবে দুঃখ প্রকাশ করা হয় এবং তিনি নিজে সশরীরে কমিশনে গিয়ে এর পুনরাবৃত্তি না ঘটানোর বিষয়ে অঙ্গীকার করে আসেন। কিন্তু পৌর নির্বাচন চলাকালে তার বিরুদ্ধে আবারও আচরণ বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছিল। ওই সময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের সূত্র ধরে কমিশন পদক্ষেপ নিলেও এবার নিজস্ব অনুসন্ধানেই তার বিরুদ্ধে আচরণ বিধি লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
ইউপি নির্বাচনের আচরণ বিধি লঙ্ঘনের দায়ে ছয় মাসের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে।
