আর্থিক অন্তর্ভুক্তি দ্রুত এগিয়েছে বাংলাদেশ

আপডেট : ১৫ মার্চ ২০১৯, ২১:০৮

g এম. এ. মাসুম

 

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশ বিশেষ করে বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ধারণাটি ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। সারাদেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে আর্থিক সেবা সহজে ও দ্রুততার সঙ্গে পৌঁছে দেয়াই আর্থিক অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্য। আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কার্যক্রমের মাধ্যমে দেশের ব্যাংকিং খাতে গ্রামের মানুষের ক্ষুদ্র হিসাবের সংখ্যা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে তাদের রাখা আমানতের পরিমাণও। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য থেকে জানা যায়, ২০০৯ সাল থেকে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত কৃষকসহ সুবিধাবঞ্চিত মানুষের ১ কোটি ৭৯ লাখ ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে। গত ১০ বছরে ক্ষুদ্র আমানতের হিসাবের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ২ দশমিক ৩৭ গুণ। 

 

সম্প্রতি বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) এর এক গবেষণা থেকে জানা যায়, সাতটি দেশের মধ্যে একমাত্র পাকিস্তান বাদে অন্যসব দেশের তুলনায় বাংলাদেশের ব্যাংক হিসাবধারীর সংখ্যা সর্বনিম্ন। এ দেশগুলো হচ্ছে-ভারত, শ্রীলংকা, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান ও মালয়েশিয়া। পাকিস্তানে ১৩ শতাংশ মানুষের ব্যাংক হিসাব আছে। বাংলাদেশে ব্যাংক হিসাবধারীর সংখ্যা মাত্র ৩১ শতাংশ মানুষের। তাছাড়া, নেপাল ও ভুটানের ব্যাংক হিসাব আছে যথাক্রমে ৩৩ দশমিক ৮ এবং ৩৩ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষের। সর্ব্বোচ্চ ৮২ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষের ব্যাংক হিসাব আছে শ্রীলংকায়। মালয়েশিয়ায় এ সংখ্যা ৮০ দশমিক ৭ শতাংশ। ভারতে অর্ধেকের বেশি মানুষের ব্যাংক হিসাব রয়েছে। অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশের ব্যাংক হিসাবের মালিকানায় লিঙ্গ ব্যবধান রয়েছে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেবার বাইরে যত মানুষ রয়েছে তার ৬৫ শতাংশই নারী। 

বাংলাদেশে ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতের প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমের মূলধারায় সামাজিক দায়বোধ জোরদার করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকার বাংলাদেশে নিম্ন আয়ের মানুষ ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে ব্যাংকিং খাতের সেবার আওতায় আনতে নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অংশ হিসাবে গরিব কৃষকদের ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় সরকারের বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অর্থ বিতরণ, অসহায় মুক্তিযোদ্ধা, ক্ষুদ্র জীবন বীমাগ্রহিতা, বেকার তরুণ, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, গার্মেন্টস শ্রমিক, অতি দরিদ্র উপকারভোগী, অতি দরিদ্র মহিলা উপকারভোগী, ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির সুবিধাভোগী, ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দুস্থ পুনর্বাসনের অনুদানপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা এমনকি পথশিশুও ব্যাংক হিসাব খুলতে পারছে। এ ধরনের হিসাবের বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ন্যূনতম স্থিতি রাখার বাধ্যবাধকতা নেই, নেই কোনো চার্জ বা ফি। দেশের সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর প্রায় ২ কোটি মানুষ এখন ব্যাংক হিসাবধারী। ১০ বছর আগে সমাজের সুবিধাবঞ্চিত এ মানুষেরা ছিলেন আর্থিক সেবার বাইরে। এখন মাত্র ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খুলতে পারছেন হতদরিদ্র, ছিন্নমূল ও কর্মজীবী পথশিশু এমনকি ভিক্ষুকও। এদের মধ্যে অতি দরিদ্র রয়েছে ২৫ লাখ ২৮ হাজার। ছিন্নমূল ও কর্মজীবী পথশিশু রয়েছে ৪ হাজার ৭৯৪। কৃষক রয়েছে ৯৯ লাখ ৬৫ হাজার।

তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার ব্যাংকিংয়ের বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। মোবাইল ব্যাংকিং এরই মধ্যে অর্থ স্থানান্তরের ক্ষেত্রে গ্রামীণ জনজীবনে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে জানা যায়, ২০১৮ সালের অক্টোবর শেষে মোবাইল ব্যাংক ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৬ কোটি ৫০ লাখ। প্রতিদিন গড়ে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন হয় প্রায় ১ হাজার ২৪ কোটি টাকা। শৈশবকাল থেকে শিশুকে মিতব্যয়ী হওয়ার শিক্ষা দিয়ে তাদের সঞ্চয়ী হওয়ার মনোভাব গড়ে তুলতে কয়েক বছর ধরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ‘স্কুল ব্যাংকিং’ কার্যক্রম। বর্তমানে ১৬ লাখ ৯ হাজার ৯৬১ জন শিক্ষার্থী স্কুল ব্যাংকিং হিসাবে ১ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা জমা রয়েছে ব্যাংকে। উল্লেখ্য, ২০১০ সাল থেকে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে ‘স্কুল ব্যাংকিং’ কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

আধুনিক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিভিত্তিক ব্যাংকিং সেবা প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চালু হয়েছে এজেন্ট ব্যাংকিং। মূলত ২০১৬ সাল থেকে দেশে এজেন্ট ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর ফলে একদিকে প্রান্তিক মানুষ আর্থিক সেবার মাধ্যমে উপকৃত হচ্ছেন, অন্যদিকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির বিকাশের কারণে সামষ্টিক অর্থনীতিও শক্তিশালী ভিতের ওপর দাঁড়াচ্ছে। ডিসেম্বর ১৮ পর্যন্ত ১৯টি ব্যাংকের ৬,৯৩৩ এর বেশি এজেন্ট আউটলেটের মাধ্যমে ২৪ লাখ ৫৭ হাজার একাউন্ট পরিচালিত হচ্ছে। নিয়মিত ব্যাংকিং সেবার পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভাতা প্রদান, স্কুল ব্যাংকিং, বিল পরিশোধে এজেন্ট ব্যাংকিং বিশেষ ভূমিকা রাখছে।

দিন যত যাচ্ছে ব্যাংকিং সেবায় যুক্ত হচ্ছে নতুন মাত্রা। মোবাইল, ব্যাংকিং, এজেন্ট ব্যাংকিং প্রভৃতির পর এবার আসছে বুথভিত্তিক ব্যাংকিং। জানা যাচ্ছে, অল্প খরচে ব্যাংকিং সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে নতুন এ সেবা চালু করতে যাচ্ছে ব্যাংকগুলো। অনেক সুবিধাই মিলবে বুথভিত্তিক এ ব্যাংকিং থেকে।

বাংলাদেশের এসডিজি অর্জনে ব্যাংক খাতের সঙ্গে আরও অধিক জনসংখ্যার সম্পৃক্ততা বাড়ানোর উপর জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। বর্তমানে অধিকাংশ বেসরকারি ব্যাংকের কার্যক্রম শহরাঞ্চলকেন্দ্রিক হওয়ায় গ্রামের অধিকাংশ মানুষ এর আওতার বাইরে থেকে যান। তাছাড়া, ব্যাংকগুলোর ঋণের ৮৫ শতাংশই ঢাকা ও চট্টগ্রামে দেয়া হয়। দেশের ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে বিপুল সংখ্যক জনগোষ্ঠী এখনও ব্যাংকিং সেবার বাইরে আছে। এসব মানুষকে ব্যাংকের আওতায় আনতে যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।