একসময় টেলিফোনে ‘রং নাম্বার’ একটা চালু বিষয় ছিল। একজনের নাম্বারে ফোন দিতে গেলে আরেকজনের কাছে তা চলে যেতো। এখনও অনেকে রং নাম্বারে ফোন দেন, রং নাম্বার থেকে ফোন আসে। তবে আমাদের এই আজব দেশে কেবল টেলিফোনের ক্ষেত্রেই নয়, আরও নানা ক্ষেত্রে ‘রং নাম্বার’ হয়ে যায়। আসামি ধরার ক্ষেত্রে অনেক সময় এ ঘটনাটি বেশি ঘটে। একজনকে ধরে আনার বদলে আরেকজনকে বেঁধে আনা হচ্ছে। ইদানীং আমাদের দেশে মামলার ক্ষেত্রেও দেখা যাচ্ছে, যার নামে মামলা হওয়ার কথা, যার জেল খাটার কথা, যার আসামি হওয়ার কথা, তা না হয়ে আরেকজন জেল খাটছে বা আসামি হচ্ছে। ‘রং নাম্বারের’ মতো ‘রং ব্যক্তি’ জেল খাটছেন। এমনি একটি আলোচিত ঘটনা নিয়ে দেশব্যাপী তোলপাড় চলছে। এ ব্যাপারে সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনকে ভর্ত্সনা করেছেন হাইকোর্ট। টাঙ্গাইলের জাহালমকে ‘ভুল’ আসামি করার বিষয়টি তদন্তে উঠে এলেও তাকে মামলা থেকে অব্যাহতি বা জামিন না দেওয়ার ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) ভর্ত্সনা করে হাইকোর্ট বলেছে: ‘যে বিড়াল ইঁদুর ধরতে পারে না, সে বিড়াল থাকার দরকার নেই।’
আমরা ‘রং নাম্বার’ বা ‘রং ব্যক্তির’ জেল-খাটা নিয়ে বেশি কথা বলব না। আমরা বরং মহামান্য হাইকোর্ট কথিত ‘যে বিড়াল ইঁদুর ধরতে পারে না, সে বিড়াল থাকার দরকার নেই’-বিষয়ক বাক্যটি নিয়ে খানিক আলোচনা করে নিতে পারি।
মাননীয় হাইকোর্টের মন্তব্য থেকে কিছু প্রশ্ন মনের মধ্যে উঁকি দেয়। ইঁদুর ধরাই কি বিড়ালের একমাত্র কাজ? আর ইঁদুর ধরতে না পারলে সে বিড়াল থাকবে না? সবসময় সব বিড়াল যে ইঁদুর ধরতে পারবে, তার কি কোনো নিশ্চয়তা আছে? মানুষই যেখানে সবসময় সব কাজ করতে পারে না, সেখানে বিড়াল আর কোন্ ছার! এসব জেনেশুনেও মাননীয় হাইকোর্ট এমন একটা কথা কেন বললেন? অবশ্য এর ঘোর অর্থও থাকতে পারে।
তবে এমন কথায় দেশের বিড়াল-সম্প্রদায় বেজার হতে পারেন। অবশ্য আমাদের দেশের মানুষ প্রাণিকূলের প্রতি খুব একটা সংবেদনশীল নন। এখানে মানুষরাই প্রতিনিয়ত একে-অন্যকে আঘাত দেয় বা আঘাত করে কথা বলে। আর বিড়ালের মর্যাদা তো এখানে তুচ্ছ!
পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে বিড়াল খুব জনপ্রিয় পোষা প্রাণী। অনেক দেশে সন্তান-সন্ততির পরিবর্তে মানুষ বিড়াল পালেন। কিন্তু আমাদের দেশে বিড়াল খুব একটা জনপ্রিয়তা পায়নি। এর স্বভাবের কারণেও এটা হতে পারে। কারণ বিড়াল খুবই আরামপ্রিয় একটা প্রাণী। এরা নরম বিছানা ছাড়া ঘুমাতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না। পক্ষান্তরে আমরা হলাম খুবই ব্যতিক্রমী এক জাতি। আমরা আর যা কিছুই পছন্দ করি বা না করি, অন্যের সুখ বা আরাম-আয়েশ মোটেও সহ্য করতে পারি না। সেই কারণেই সম্ভবত বিড়াল আমাদের দেশে খুব একটা জনপ্রিয় হয়নি।
অবশ্য শুধু মানুষের দোষ দিয়ে লাভ নেই, বিড়ালের স্বভাবও এ ক্ষেত্রে কম দায়ী নয়। বিড়াল নিজেও খুব ‘চোর স্বভাবের।’ ওকে যতই ইঁদুর-সাপ-ব্যাঙ ভাত-রুটি দিন না কেন, ও চুরি করবেই। চুরি করে খাওয়া হলো বিড়ালের সবচেয়ে বড় বদভ্যাস। তাও ভালো জিনিসগুলো সে চুরি করে বেশি। যেমন: মাছ-মাংস-ডিম-দুধ। এগুলো রান্না করে রাখামাত্র বিড়াল তাতে ভাগ বসানোর চেষ্টা করে।
স্বভাব-চরিত্র যেমনই হোক না কেন, বিড়াল কিন্তু হাজার হাজার বছর ধরে পোষা প্রাণী হিসেবে মানুষের কাছে বিশেষ মর্যাদা পেয়ে আসছে। একসময় নাকি বিভিন্ন মন্দিরে বিড়ালের পূজা করা হতো। ইঁদুর ধরে বলে বিড়ালকে অতিপ্রাকৃতিক ক্ষমতার অধিকারী পশু বলে বিবেচনা করা হতো। বিড়াল শুরু থেকে এত আদুরে বা অলস ধরনের প্রাণী ছিল না। প্রায় কয়েক হাজার বছর ধরে কৃষক এবং নাবিকদের হয়ে তারা ইঁদুর ধরেছে এবং অনেক অনেক উপকার করে এসেছে। প্রকৃতপক্ষে বিড়ালই মানুষের সঙ্গ বেছে নিয়েছিল। এতে দুই পক্ষেরই লাভ হয়েছে।
বিড়াল অনেক ক্ষেত্রে মানুষের চেয়েও চৌকস। যেমন- দৃষ্টিশক্তির ক্ষেত্রে। পৃথিবীর সব প্রাণীর মধ্যে শরীরের অনুপাতে বিড়ালের চোখই সবচেয়ে বড়? হাতি খুব বড়, তিমি মাছও বিশাল, তাদের চোখ কিন্তু শরীরের অনুপাতে বিড়ালের তুলনায় অনেক ছোট? বিড়াল নিশাচর প্রাণী। বিড়ালের চোখের রেটিনা কুইনাইন নামক একটি পদার্থ দ্বারা আবৃত, যার কারণে এদের চোখ আলোক সংবেদনশীল হয়। এ কারণে রাতেরবেলায় আমরা বিড়ালের চোখ জ্বলতে দেখি। বিড়ালের চোখের পর্দা তিনস্তর বিশিষ্ট। এদের ঘ্রাণশক্তি খুবই উন্নত। এরা শুধুমাত্র ঘ্রাণ নিয়ে তারপর খাবার খায়। বিড়ালের শ্রবণশক্তি মানুষের তুলনায় ছয় গুণ বেশি। এজন্য এরা কোনো শব্দ শুনলে খুব দ্রুতই ঘাড় মাথা ঘুরিয়ে দেখার চেষ্টা করে এবং খুব সামান্য শব্দেই চমকে যায়।
বিড়ালের মধ্যে হিংসা-ঈর্ষা ইত্যাদি ব্যাপারগুলোও মানুষেরই মতো। এরা খুবই আদর-যত্ন-ভালোবাসা পছন্দ করে। কোনো বাড়িতে যদি একই সঙ্গে একটি ছোট বাচ্চা এবং একটি বিড়াল থাকে, তাহলে বিড়ালটি ওই বাচ্চাটিকে তার প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে। কারণ স্বভাবতই বাচ্চাটির প্রতি সকলের আদর-যত্ন একটু বেশিই থাকে।
বিড়াল সবটুকু খাবার শেষ করে না। অনেক সময় ধরে খেয়ে খাবারের কিছু অংশ বাঁচিয়ে রাখে। এটা তারা মনিবের কাছ থেকেই শেখে। যে-সকল বাড়িতে মনিব তার বেঁচে যাওয়া খাবার থেকে বিড়ালকে খেতে দেয়, সেই সকল বাড়িতেই বিড়ালগুলো নিজের খাবার মনিবের জন্য বাঁচিয়ে রাখতে শেখে।
বিড়াল খুব একটা ক্ষতি না করলেও কেন জানি আমরা এই নিরীহ প্রাণীটিকে খুব একটা পছন্দ করি না। আমাদের প্রবাদ প্রবচনগুলোও বিড়াল বিদ্বেষে পরিপূর্ণ। যেমন—বকো-ঝকো মার লাথি, লাজ নেই বেড়াল জাতি। অনেকক্ষণ ধরে চলা ঝগড়াকে বলা হয় ‘বিড়ালের ঝগড়া।’ ‘ইঁদুর বলে বেড়াল মাসি/তোকে বড় ভালোবাসি।’ ‘কামারের বাড়ির বেড়াল ঠকঠকানিতে ভয় পায় না।’ ‘বউয়ের রাগ বেড়ালের ওপর, বেড়ালের রাগ বেড়ার ওপর।’ ‘চন্দ্র সূর্য অস্ত গেল/জোনাকির পোঁদে বাতি/বাঘ পালাল বিড়াল এলো/ধরতে এবার হাতি।’ ‘বেড়ালের ভাগ্যে শিকে ছেঁড়া’, ‘অনেক যদি মাছ পায়/বেড়াল কাঁটা বেছে খায়’, ‘ভিজে বেড়াল’ (জড়োসড়ো হয়ে থাকলেও ঠিকই শিকার ধরে)। যাকে মারতে পারলে মন খুশিতে ভরে উঠে তার জন্য দুঃখ প্রকাশের ভণিতাকে বলা হয় মাছের ‘মাছের শোকে বেড়াল কাঁদে।’ ‘বিড়াল যখন দুধ খায় বুঁজিয়ে দুই চোখ/ভাবে তখন চোখ বুঁজে আছে সব লোক।’ ‘খোড়া বিড়ালের আরশোলা পথ্য।’ এ ছাড়া ইঁদুর বিড়াল খেলা, থলের বিড়াল, বিড়াল ঠেলায় পড়লে গাছে ওঠে, বিড়াল বনে গেলে বনবিড়াল (বাঘ) হয়, বিড়াল তপস্বী (দেখতে সাধু হলেও ভণ্ড) ইত্যাদি অসংখ্য প্রবাদ-প্রবচন-উপকথা রয়েছে বিড়াল নিয়ে।
ইংরেজিতে ক্যাট, সংস্কৃতে মার্জার, বাংলায় বিড়াল, বিলাই, মেকুর যাই বলি না কেন, বেশিরভাগ প্রবাদ-প্রবচনে এই প্রাণীটিকে ছোট বা হেয় করে দেখা হয়েছে। যেমন ‘মেও ধরে কে’ বলে একটা কথা চালু আছে। এই প্রবাদের উত্পত্তি বিষয়ক গল্পে বলা হয়েছে- বিড়ালের অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্যে ইঁদুররা পরামর্শ করল বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বেঁধে দিতে হবে। তাহলে তার গতিবিধি আগেই টের পেয়ে ইঁদুররা সহজেই নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে পারবে। তারা পরিকল্পনা করল, ঘণ্টা বাঁধার জন্যে। ঠিক হলো, কেউ বিড়ালের কান ধরবে, কয়েকজন মিলে পা, কয়েকজন মিলে লেজ। কিন্তু একজন বৃদ্ধ ইঁদুর প্রশ্ন তুলল— বিড়াল যখন ‘মেও’ বলে ডেকে উঠবে তখন তো সবাই ভয়ে না পালিয়ে বাঁচবে না। তখন ‘মেও’ ধরবে কে? এ প্রবাদের মধ্যে নিহিত অর্থ হলো- দুরূহ কাজের মূল ঝুঁকির ব্যাপারটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।
আবার ‘শুঁটকির নৌকায় বিড়াল পাহারাদার’, বাংলায় এমন একটি প্রবাদ আছে। এর অর্থ হচ্ছে বিড়ালের কাছে শুঁটকি বা মাছ যেটাই রাখা হোক না কেন বিড়াল সেটা খেয়ে ফেলবেই। তাই বিড়ালের কাছে মাছ রাখা যাবে না। কিন্তু আমাদের দেশে এখন অনেক ক্ষেত্রে সত্যি সত্যি বিড়াল মাছের পাহারা দিচ্ছে!
পুনশ্চ:পরিশেষে বিড়াল নিয়ে একটি ইতিবাচক উপকথা। এক বাসায় কুকুর আর বিড়ালের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে সবসময় ঝগড়া হতো! বিড়াল বলত: আমি মাছ-মাংস দুধ ইত্যাদি অভিজাত খাবার খাই। বিছানায় ঘুমাই! কাজেই আমিই সেরা! কুকুর সম্পর্কে বিড়ালের মূল্যায়ন: তুমি ডাস্টবিন নর্দমার খাবার খাও! এমনকি মল পর্যন্ত খাও! ঘুমাও মাটিতে! তুমি তো মহা-নিকৃষ্ট!
একদিন বাড়ির গিন্নি মুড়িঘণ্ট রাঁধবেন বলে রুই মাছের মাথা ভেজে রেখেছেন! অন্য সব প্রস্তুতির পর যখন মুড়ো কড়াইয়ে দিবেন তখন দেখেন মুড়োটা বিড়ালে খাচ্ছে! চরম ক্ষুব্ধ গৃহিণী বিড়ালের গলায় দড়ি বেঁধে কাজের ছেলেকে নির্দেশ দিলেন, বিড়ালটাকে নিকটস্থ নদীতে ফেলে দিয়ে আসতে!
গলায় দড়ি বেঁধে যখন বিড়ালকে টেনে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন কুকুরটি বিড়ালকে প্রশ্ন করল:
‘এত দিন শুনেছিলাম তোমার মুখে বড় বড় কথা,
মরার দড়ি গলায় দিয়ে যাওয়া হচ্ছে কোথা?’
বিড়ালের উত্তর: ‘যার যেখানে মন,
তুলসি মালা গলায় দিয়ে চলছি বৃন্দাবন!’
n লেখক :রম্যরচয়িতা

