পরিবেশ ও বনমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি বলেছেন, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা না গেলে মানুষের অস্তিত্বও হুমকির মুখে পড়বে। আর পরিবেশ রক্ষায় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের বিকল্প নেই। বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে। দেশীয় বরাদ্দ ও বিদেশি সহায়তায় বনায়ন এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। বন্যপ্রাণী ধরা, শিকার ও পাচার নিষিদ্ধ করার পাশাপাশি আইনের কঠোর বাস্তবায়নে জোর দেয়া হয়েছে। বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সকল শ্রেণীর মানুষকেও সচেতন ও আন্তরিক হতে হবে।
গতকাল শনিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বনভবনে এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বিশ্ব বন্যপ্রাণী দিবস উপলক্ষে এ সভার আয়োজন করে বন অধিদপ্তর। এ বছর দিবসটির মূল প্রতিপাদ্য ‘আমরাই পারি বন্যপ্রাণী বাঁচাতে’।
পরিবেশ ও বনমন্ত্রী বলেন, শিকার মানুষের একটি আদিম প্রবৃত্তি। একসময় বাঘ শিকার করা ছিল বীরত্বের প্রতীক। এখন এটি অপরাধ। কিন্তু আগের অভ্যাস এখনও অনেকের মনে রয়ে গেছে। এ অভ্যাস বদলাতে হবে। বন্যপ্রাণী শিকারীদের আইনের আওতায় এনে বিচার করা হবে। তিনি বলেন, প্রাণীর অবাধ বিচরণের জন্য অভয়ারণ্য প্রয়োজন। বাংলাদেশের মত ঘনবসতিপূর্ণ দেশে বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ করা কঠিন। তবে এ কঠিন কাজটি করার চ্যালেঞ্জ আমাদেরকে গ্রহণ করতে হবে। সফল হতে হবে।
আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এমপি বলেন, আমাদেরকে মানুষ ও বন্যপ্রাণী দুটিকেই বাঁচাতে হবে, রক্ষা করতে হবে। বন সংরক্ষণে প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়েও ভিন্ন বা বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
তিনি বলেন, আমাদের দেশ ছোট হলেও জীববৈচিত্র্যে ভরপুর। এ জীববৈচিত্র্য রক্ষার মাধ্যমে পরিবেশ সংরক্ষণ করতে হবে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে সমুদ্রের পানির উষ্ণতা ও লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমাদের কৃষি, পরিবেশ ও বন রক্ষায় জলবায়ু পরিবর্তনজনিত হুমকি মোকাবিলায় কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে ও হচ্ছে। বন্যপ্রাণী রক্ষায় জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যার পাশাপাশি মানবসৃষ্ট হুমকিগুলোও মোকাবিলা করা হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ ও বন সচিব ড. কামালউদ্দিন আহ্মদ বলেন, আমাদের গর্ব করার মত বন্যপ্রাণী ও প্রাণীসম্পদ রয়েছে। শুধু বনে নয়, লোকালয়েও বন্যপ্রাণী রয়েছে। এগুলো সংরক্ষণ করতে হবে। বিপন্নপ্রায় কিংবা বিরল প্রজাতির প্রাণী সংরক্ষণে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে কয়েকটি ক্ষেত্রে আমরা সাফল্যও পেয়েছি।
সভাপতির বক্তব্যে প্রধান বন সংরক্ষক মো. ইউনুছ আলী বলেন, সংরক্ষিত বন দিয়ে রাস্তা হচ্ছে। এটি যতটা সম্ভব বনবান্ধব করা প্রয়োজন। ট্রান্স ন্যাশনাল করিডোরের পার্বত্য চট্টগ্রাম অংশে হাতির চলাচলের নয়টি করিডোর পড়েছে। এ স্থানগুলোতে ট্রেন উপর দিয়ে চলাচলের ব্যবস্থা করার জন্য রেল বিভাগকে চিঠি দিয়েছি। হাতি রক্ষায় এটি করা দরকার।
আইইউসিএন’র দেশীয় পরিচালক ইশতিয়াকউদ্দীন আহমদ বলেন, বন্যপ্রাণী নিয়ে বাণিজ্য হয়। এ অবৈধ বাণিজ্য বন্ধ করতে পারলে প্রাণী সংরক্ষণ করা যাবে ও মানুষ বাঁচবে। বন্যপ্রাণী রক্ষায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিশেষ নজর দিতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, শুধু সরকারি উদ্যোগে বন্যপ্রাণী হত্যা রোধ করা সম্ভব নয়। তবে আইন প্রয়োগে সরকারকে কঠোর হতে হবে। প্রাণীহত্যা রোধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মনিরুল এইচ খান বলেন, মানুষ সামাজিক ও আর্থিক প্রয়োজনে অপরিকল্পিত ও অদূরদর্শী উন্নয়নমূলক তত্পরতায় মেতে উঠেছে। ফলে প্রতিনিয়তই তার চারপাশের বন, ঝোপঝাড় ও গাছপালা কেটে বাজার, বন্দর, শহর, নগরী ও শিল্প-কারখানা গড়ে তুলছে। বন্যপ্রাণী রক্ষায় পরিকল্পিত নগরায়ণের পাশাপাশি পরিকল্পিত বনায়নও করতে হবে। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন উপ-প্রধান বন সংরক্ষক মো. আকবর হোসেন, সদ্য বিদায়ী উপ-প্রধান বন সংরক্ষক ড. তপন কুমার দে, বন সংরক্ষক (বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ) অসিত রঞ্জন পাল।
আলোচনা সভার আগে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের আহবান জানিয়ে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র থেকে একটি শোভাযাত্রা বের হয়ে বনভবন প্রাঙ্গণে এসে শেষ হয়। এছাড়া ওই প্রাঙ্গণে ‘বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ মেলা’ আয়োজন করা হয়।
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ২৩ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভায় ৩ মার্চকে বিশ্ব বন্যপ্রাণী দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এ দিবসের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে বন্যপ্রাণী সম্পর্কে জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংরক্ষণের জন্য জনগণকে সোচ্চার করে তোলা। ২০১৪ সাল থেকে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।
