নিউজিল্যান্ডে ক্রাইস্টচার্চে দুটি মসজিদে অজ্ঞাত বন্দুকধারীদের হামলায় নিহতদের মধ্যে তিনজন বাংলাদেশি রয়েছেন বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশের অনারারি কনসাল শফিকুর রহমান। এদের একজন হলেন কুড়িগ্রামের ড. আবদুস সামাদ, অন্যজন সিলেটের হোসনে আরা পারভীন বেগম। নিহত অন্যজনের নাম পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত কোন তথ্য মেলেনি। নিহতদের পরিবারে লোকেরা শোকে কাতর হয়ে পড়েছেন।
আমাদের নাগেশ্বরী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা জানান, নিউজিল্যান্ডে ক্রাইস্টচার্চে দুটি মসজিদে অজ্ঞাত বন্দুকধারীদের হামলায় নিহত বাংলাদেশিদের মধ্যে একজন কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার মধুরহাইল্যা গ্রামের জামাল উদ্দিন সরকারের বড় ছেলে ড. আবদুস সামাদ। নাগরিকত্ব নিয়ে সপরিবারে সেদেশে স্থায়ীভাবে বাস করা বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি তত্ত্ব বিভাগের সাবেক ওই শিক্ষক ক্রাইস্টচার্চ শহরের হ্যাগলি পার্কমুখী সড়ক দীন এভিনিউতে ‘মসজিদে নূর’ মসজিদের মোয়াজ্জিন ছিলেন। ওই ঘটনায় ড. আবদুস সামাদের স্ত্রী কেশোয়ারা সুলতানা অক্ষত রয়েছেন। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকায় বসবাসরত ড. আবদুস সামাদের বড় ছেলে তোহান মোহাম্মদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলে এই প্রতিবেদক নিশ্চিত হয়েছেন যে, কেশোয়ার সুলতানা অক্ষত রয়েছেন।
পরিবার জানায়, মেধাবী আব্দুস সামাদ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা শেষে সেখানেই কৃষি তত্ত্ব বিভাগের শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। পিএইচডি করেন নিউজিল্যান্ডে। পরবর্তীতে তিনি ওই বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সালে চাকরি ছেড়ে দিয়ে নাগরিকত্ব নিয়ে স্ত্রী ও তিন পুত্রকে নিয়ে স্থায়ীভাবে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চ শহরে বসবাস শুরু করেন। এসময় তিনি ‘মসজিদে নূর’-এ মুয়াজ্জিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে কিছুদিন বসবাস করার পর তার বড় ছেলে তোহান মোহাম্মদ দেশে ফিরে ঢাকায় বসবাস করছেন। অপর দুই ছেলে তারেক, তানভির ও স্ত্রী কেশোয়ারা সুলতানাকে নিয়ে ড. আব্দুস সামাদ ক্রাইস্টচার্চে থাকতেন।
গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টায় ঢাকায় বসবাসরত তোহান মোহাম্মদ এর সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, সর্বশেষ গত দুইদিন আগে তার বাবার সঙ্গে পারিবারিক বিভিন্ন বিষয়ে কথা হয়েছিল। গতকাল তিনি বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমের খবরে জানতে পারেন নিউজিল্যান্ডের স্থানীয় সময় শুক্রবার বেলা দেড়টায় ক্রাইস্টচার্চ শহরের হ্যাগলি পার্কমুখী সড়ক দীন এভিনিউতে ‘মসজিদে নূর’ ও ‘লিংউড’ মসজিদ দুইটিতে হামলা চালিয়েছে অজ্ঞাত বন্দুকধারী। এতে ৩ বাংলাদেশিসহ ৪৯ নিহত ও প্রায় ৪০ জন আহত হয়েছেন। এ খবর জেনেই তিনি তার মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তার মা জানান, ঘটনার পরপরেই তিনি ছুটে গেছেন হাসপাতালে। কিন্তু পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের হাসপাতালে ঢুকতে দেয়নি। তারা বলেছেন, গুরুতর আহতদের চিকিত্সা চলছে। এ মুহূর্তে কোনো কিছুই জানানো সম্ভব নয়। এছাড়া পরিস্থিতি শান্ত না হওয়া পর্যন্ত তারা কোনো কিছুই প্রকাশ করবে না বলে জানিয়েছে। তাই তিনি, তার মা কেউই নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না- তার বাবা মৃত না জীবিত। এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে তাদের আরো বেশ কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে।
এদিকে ড. আব্দুস সামাদ নিহতের সংবাদ পৌরসভার মধুরহাইল্যা গ্রামে তার নিজ বাড়িতে পৌঁছালে শোকে কাতর হয়ে পড়ে স্বজন ও পরিবারের লোকজন। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ভাইয়ের শোকে বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন ছোটভাই মতিয়ার রহমান। তারা কোনভাবে মেনে নিতে পারছেন না এ ঘটনা। এ ঘটনার প্রতিবাদে এদিন সন্ধ্যায় ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নাগেশ্বরী উপজেলা শাখা একটি বিক্ষোভ মিছিল করে।
স্বামীকে বাঁচাতে গিয়ে
বিশ্বনাথ (সিলেট) সংবাদদাতা জানান, নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে আল-নূর মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়ে সন্ত্রাসীর গুলিতে নিহত হয়েছেন সিলেটের বিশ্বনাথের এক পুত্রবধূ। নিহতের নাম হোসনে আরা পারভীন বেগম (৪৫)। তিনি বিশ্বনাথ সদর ইউনিয়নের উত্তর মিরেরচর গ্রামের ফরিদ উদ্দিনের স্ত্রী। এ ঘটনায় নিহতের পরিবারে চলছে শোকের মাতম।
জানা গেছে, নিউজিল্যান্ডের আল-নূর মসজিদে নামাজ পড়তে যান হোসনে আরা পারভীন ও স্বামী ফরিদ উদ্দিন। ফরিদ উদ্দিনকে পুরুষ কক্ষে রেখে মহিলা কক্ষে নামাজ পড়তে যান তিনি। এসময় সন্ত্রাসীরা গুলি চালায় মুসল্লিদের ওপর। পুরুষদের কক্ষে গুলাগুলির শব্দ শুনে অসুস্থ স্বামীকে বাঁচাতে গিয়ে সন্ত্রাসীর গুলিতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন ফরিদ উদ্দিনের স্ত্রী।
নিহতের ভাসুর মঈন উদ্দিন জানান, গতকাল বিকালে টেলিফোনে ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারেন হোসনে আরা পারভীন সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হয়েছেন। তিনি বলেন-ফরিদ উদ্দিন একজন প্যারালাইসিস রোগী। গতকাল মসজিদে হুইল চেয়ারে করে নামাজ পড়াতে নিয়ে যান স্ত্রী। দীর্ঘ ২৮ বছর ধরে ভাই (ফরিদ উদ্দিন) নিউজিল্যান্ডে আছেন। তিনি প্রথমে ভিজিট ভিসায় নিউজিল্যান্ডে যান এবং পরে সে দেশের নাগরিকত্ব লাভ করেন। ফরিদ উদ্দিন সেখানে মুসলিম কমিউনিটির সাধারণ সম্পাদক। তিনি প্রতি শুক্রবার আল-নূর মসজিদের ইমামের আরবী খুতবা পাঠকে (ইংরেজিতে) অনুবাদ করে মুসল্লিদের শুনান।
