‘আমার বাচ্চাটা কোথাও বের হতে চায় না। স্কুল আর বাসা। কারো সঙ্গে খেলে না। মোবাইলে গেমে মাথা গুঁজে রাখে, আর না হলে টিভিতে কার্টুন দেখে। কী যে করি!’ ব্যস্ত এই শহরে শিশু সন্তানকে নিয়ে ব্যস্ত মা-বাবাদের এই আক্ষেপ এখন মুখে মুখে। এটাই এখন শহুরে জীবনে বাস্তবতা। মূলত বাড়তি লেখাপড়ার চাপ আর খেলার মাঠের অভাবে ক্রমেই ঘরকুনো মুখ লুকানো বদ্ধ জীবনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে আমাদের শিশুরা। চোখের সামনেই আমাদের সন্তানেরা অন্য রকম হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এটা কোনভাবেই স্বাভাবিক নয়। মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এতে শিশু-কিশোররা সাময়িক বিনোদন খুঁজে পেলেও এটা তাদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে।
শিশু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের জীবনে বিনোদন নেই। সে জন্য তারা আকাশ-সংস্কৃতির দিকে ঝুঁকছে। স্কুলে খেলার মাঠ নেই, পাড়ায় খেলার মাঠ নেই। কিন্তু এটাও সত্যি যে নগর জীবনে এ বাস্তবতা আমাদের মেনে নিয়েই এগোতে হবে। রাজউকের নিয়ম করা উচিত, নতুন বাড়ি তৈরির সময় কমন স্পেস রাখা। যেখানে শিশুরা খেলবে। প্রতিটি এলাকার খোলা জায়গায় সরকারি উদ্যোগে শিশু পার্ক গড়ে তোলা জরুরি। তবে শিশুদের এই অবস্থা থেকে মুক্তি দিতে স্কুল কর্তৃপক্ষ ও মা-বাবার দায়িত্বও কম নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের পেন স্টেট ইউনিভার্সিটি ও জন হপকিনস ইউনিভার্সিটির বিশেষজ্ঞরা শিশুদের মানসিক চাপ বিষয়ক এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলেছেন, ‘শিশুর উপর মানসিক চাপ তার মোটা হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। আর এই স্থূলতা অন্য অনেক রোগের উপসর্গ হয়ে দেখা দেয়। শিশুদের ওপর লেখাপড়ার যে চাপ পড়ে এর কারণে অনেকের মাঝে স্কুলভীতিও তৈরি হয়। সে কারণে প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক শিক্ষা যথাসম্ভব আনন্দময় হওয়া দরকার।’ কিন্তু আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা শিশুদের অনেক বেশি পড়ার এবং পরীক্ষার চাপ দিচ্ছে। আজকাল বেশিরভাগ স্কুলে শিশুদের ৮-১০টি বই পড়তে হচ্ছে। অথচ প্রথম শ্রেণিতে জাতীয় পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের নির্ধারিত বইয়ের সংখ্যা মাত্র তিনটি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে পাঁচ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুদের ১৮.৩৫ শতাংশ মানসিক রোগে আক্রান্ত। শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশ একে অপরের পরিপূরক হলেও আমরা এতদিন শিশুর শারীরিক বিকাশকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে আসছি। কিন্তু একই সঙ্গে শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ছাড়া শিশু তথা মানুষের পরিপূর্ণ বিকাশ সম্ভব নয়। সম্প্রতি বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের মস্তিষ্কের বৃদ্ধি ও বিকাশ সবচেয়ে দ্রুত হয় মাতৃগর্ভে, যা প্রায় শতকরা ৮০ ভাগ।
এদিকে বিশ্বজুড়েই যন্ত্রপাতির প্রতি মানুষের একটা বিশেষ আকর্ষণ তৈরি হয়েছে। যাকে ‘গ্যাজেট প্রেম’ বললে হয়তো ভুল হবে না। স্মার্টফোন, আইফোন, ট্যাবলেট, ল্যাপটপ, ডিজিটাল ক্যামেরার প্রতি বড়দের দেখে শিশুদেরও আকর্ষণ তৈরি হচ্ছে। কারো কারো কাছে এসব ব্যবহার করতে পারাও স্মার্টনেসের পরিচয়। শিশুরা বড়দের কাছ থেকে এসব মানসিকতা গ্রহণ করছে। ফলে বেশির ভাগ ছেলেমেয়ে মাঠে গিয়ে খেলাধুলার পরিবর্তে কম্পিউটার-মোবাইল ফোনের ছোট স্ক্রিনেই সময় কাটাচ্ছে ।
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, শিশুকে প্রতি মুহূর্তে দিতে হবে মধুর অভিজ্ঞতা, সুন্দর সাজানো সময়। শিশুকে প্রচুর খেলাধুলার সুযোগ দিতে হবে। খেলার মাধ্যমে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বাড়ে। শিশুদের আচার-আচরণ ও ব্যক্তিত্ব বিকাশে বড়দের প্রভাব অত্যন্ত বেশি। বড়রা যদি শিশুদের প্রতি দয়া, সুবিবেচনা ও ভালবাসা দেখায় তবে শিশুরাও এসব দৃষ্টান্ত অনুসরণ করবে। এতে তার মানসিকতা ইতিবাচক দিকে প্রবাহিত হতে থাকবে।
মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও সাহিত্যিক ড. মোহিত কামাল বললেন, আমাদের ছেলেমেয়েরা অসামাজিক হয়ে পড়ছে এটা সত্য। এর পেছনে অনেক কারণের মধ্যে মা-বাবা অসচেতনতা অন্যতম। মা-বাবার সুস্থ সম্পর্ক না থাকা, শিশুদের সামনে ঝগড়া করা, ছেলেমেয়েদের নিজেরা সময় না দিয়ে ডে কেয়ার সেন্টারে ভর্তি করে দেয়ার কারণে শিশুদের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। কিন্তু এভাবে শিশুর চরিত্র তৈরি হবে না। তাই মা-বাবাকেই সবচেয়ে বেশি সময় দিতে হবে। খেলার সুযোগ না থাকলে প্রতি সপ্তাহে ছুটির দিনে আত্মীয়-বন্ধুদের বাসায় বেড়াতে গেলে বাচ্চারা সামাজিকতা শিখবে।
শিক্ষা বিজ্ঞানের সর্বজনীন নির্দেশনা হল, শিশুকে শিক্ষিত করে তুলতে হলে তাকে তার শরীর, মন ও মস্তিষ্ক সব কিছুরই চর্চা করার যথেষ্ট সুযোগ দিতে হবে। এ বিষয়টি তুলে ধরে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইংরেজিতে একটা কথা প্রচলিত আছে ‘অল স্টাডি নো প্লে, মেকস জ্যাক এ ডাল বয়’। আমাদের দেশের রাজধানীর শিশুরা নানা নাগরিক সুবিধা পেলেও খেলার সুযোগ পাচ্ছে না। বিদ্যালয়েও শিক্ষার্থীদের স্বাধীনভাবে, মুক্ত আলো-বাতাসে খেলার বা শরীর চালনা করার কোনো সুযোগ বা ব্যবস্থা নেই; বাড়ির সামনে তো নয়ই। বরং এমনও দেখা গেছে স্কুলের মাঠে আয় বৃদ্ধির নামে স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে। ফলে শিশু-কিশোররা ভিডিও গেমে অভ্যস্ত হচ্ছে, ভুলে যাচ্ছে শরীর নির্ভর খেলা। তাদের শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি সঠিকভাবে হচ্ছে না, এতে প্রায় শিশুরা খিটখিটে মেজাজের হয়ে উঠছে, অপরিপক্ব আচরণ করছে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নেহাল করিম বলেন, পৃথিবীর সব শহরেই এই সমস্যা রয়েছে। তবে সরকারের সদিচ্ছা থাকলে এ সংকট কমে আসবে। আর পরিবারের সদস্যদের সচেতন হতে হবে সবচেয়ে আগে। তাদের বুঝতে হবে শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধিতে তাদের দায়িত্ব রয়েছে, সব দায়িত্ব শুধু সরকার বা স্কুল শিক্ষকের নয়।
রাজধানীর ৯৫ ভাগ স্কুলে মাঠ নেই: রাজধানী ঢাকার ৯৫ শতাংশ স্কুলে মাঠ নেই। অলিগলিতে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে স্কুল। এসব স্কুলে মাঠ তো দূরের কথা, ক্লাস রুমই নেই প্রয়োজন অনুযায়ী। পরীক্ষায় ভালো ফল করা দামি স্কুলগুলোর অবস্থাও একই, সেখানে লেখাপড়াই হয় শুধু আর কিছু না। শিশুরা খেলাধুলার জন্য কোনো মাঠ পায় না। খেলতে পারে না। অথচ স্কুল কোনো খণ্ডিত শিক্ষার স্থান নয়, সার্বিক শিক্ষার জায়গা।
খেলাধুলা ও ছোটাছুটি না করলে শিশুদের কী ক্ষতি হয় এ বিষয়ে জানতে চাইলে মনোবিজ্ঞানী মোহিত কামাল বলেন, খেলাধুলা বা ছোটাছুটি করতে না পারা শিশুরা পরবর্তীকালে নানা সমস্যায় ভোগে। মাঠে খেলাধুলার সময় শিশুদের শরীরে রক্ত প্রবাহ অনেক বেড়ে যায়। এটা শিশুদের দেহ-মন গঠন এবং সুস্থ জীবনের জন্য অত্যন্ত জরুরি। তিনি বলেন, আজকাল রাজধানীর স্কুলে খেলার মাঠ না থাকায় শিশুরা ঘরের মধ্যেই বড় হচ্ছে। খেলাধুলা-মেলামেশার মাধ্যমে শিশুরা নানা পরিস্থিতি সামাল দিতে শেখে। আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। পরাজয় মেনে নিতে শেখে। জয়কে ধারণ করতে শেখে। জয়-পরাজয় মেনে নেয়া শিখতে না পারলে জীবনে ভেঙ্গে পড়ে। এর ফলে পরবর্তী জীবনে নানা মানসিক সমস্যায় ভুগতে হয় শিশুদের। তিনি আরো বলেন, খেলাধুলার কোনো বিকল্প নেই। খেলাধুলার মাধ্যমে মেধা-মনন শাণিত হয়, দক্ষতা বাড়ে। খেলাধুলার পরিবর্তে শিশুরা এখন ঘরে বসে কম্পিউটারে ভিডিও গেম খেলে, যা ভালো ফল বয়ে আনে না বলে তিনি মনে করেন।
এদিকে নগর-বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকা শহরের আয়তন ও এলাকার বিন্যাস অনুযায়ী অন্তত ৯২টি পার্ক থাকার কথা। রাজউক এবং ঢাকা সিটি করপোরেশনের খাতাপত্রের হিসাবে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সরকারি সম্পত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত পার্কের সংখ্যা ৫৪। তবে বাস্তবে অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে বড়জোর ১৫টির। সেগুলোও রয়েছে বেদখল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে।
