পাহাড়ের দুর্গম এলাকাতেও লেগেছে উন্নয়নের ছোঁয়া

আপডেট : ১৫ মার্চ ২০১৯, ২২:৫৩

পার্বত্য চট্টগ্রাম এখন আর পিছিয়ে পড়া জনপদ নয়। সম্প্রতি এই তিন জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে সর্বত্র ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। অনেক উন্নয়ন প্রকল্প চলমান রয়েছে। বেসামরিক প্রশাসন ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় দুর্গম এলাকাতেও লেগেছে উন্নয়নের ছোঁয়া। প্রায় প্রতিটি পাড়ায় প্রাথমিক বিদ্যালয়, নিভৃত লোকালয়ে ঘরে ঘরে সৌর বিদ্যুত্ ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্বাধীনতার আগে পার্বত্য অঞ্চলে যেখানে মাত্র ৪৮ কি.মি. রাস্তা ছিল এখন সেখানে রয়েছে দেড় হাজার কিলোমিটারের বেশি রাস্তাসহ অসংখ্য ব্রিজ ও কালভার্ট। সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার করে সেনাবাহিনীকে ছয়টি স্থায়ী সেনানিবাসে প্রত্যাবর্তন, সামাজিক উন্নয়ন ও প্রত্যন্ত এলাকায় বিদ্যুত্ সরবরাহ করা হচ্ছে। ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় এককালের পশ্চাত্পদ জনগোষ্ঠীর জীবনমানের অনেক উন্নতি হয়েছে।

এই ব্যাপক উন্নয়নযজ্ঞ সত্ত্বেও পাহাড়ি জনপদের কাঙ্খিত উন্নয়ন হয়নি বলে বরাবরই দাবি করে আসছে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন আঞ্চলিক সংগঠনগুলো। তারা উপজাতিদেরকে বঞ্চিত জনগোষ্ঠী দাবি করে দেশে-বিদেশে বাংলাদেশ সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠায় নিয়োজিত নিরাপত্তা বাহিনী এবং সেখানে বসবাসরত বাঙালিদের জড়িয়ে নেতিবাচক প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন পার্বত্য বাঙালি সংগঠনের নেতারা এই প্রচারণাকে ‘উদ্দেশ্যমূলক’ উল্লেখ করে বলছেন, সরকারের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার কারণে উপজাতীয়দের জীবন যাত্রার মান অনেক বৃদ্ধি পেলেও তারা বাংলাদেশ বিরোধী প্রচারণা চালিয়ে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। তাদের এই অব্যাহত প্রচার প্রপাগান্ডা ও আক্রমণাত্মক মনোভাবের কারণে বাঙালিরাই এখন কোণঠাঁসা জনগোষ্ঠীতে পরিণত হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে- স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, নিরাপত্তা বাহিনী বাঙালিদের চেয়ে উপজাতিদের স্বার্থেই বেশি কাজ করে। বেশিরভাগ এনজিও উপজাতিদের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত। পার্বত্য জেলা পরিষদ, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডসহ বিভিন্ন সংস্থা বাঙালিদের সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণ করছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক হওয়া সত্ত্বেও বাঙালিরা সাংবিধানিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। অথচ পার্বত্য শান্তি চুক্তিতে পাহাড়ি ও বাঙালিদের মধ্যে কোনো ধরনের বৈষম্য না করার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার রয়েছে। গত বছরের ১ নভেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব রীভা চাকমা স্বাক্ষরিত এক পরিপত্রে বাঙালিদের প্রতি সহানুভূতিশীল ও মানবিক আচরণ এবং হেয় প্রতিপন্ন না করতে নিরাপত্তা বাহিনী ও প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদানসহ চার দফা পরামর্শ প্রদান করা হয়। পাবর্ত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা প্রশাসকের উদ্দেশে প্রেরিত ওই পরিপত্রে বাঙালি সংগঠন কর্তৃক বিভিন্ন কর্মসূচি পালন ও বাঙালিদের আইনগত অধিকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ, সোনামিয়া টিলাসহ বাঙালিদের বেদখল হয়ে যাওয়া ভূমি উদ্ধারে পূর্ণ প্রশাসনিক ও আইনী সহায়তা প্রদান করার ব্যবস্থা গ্রহণ, পার্বত্য চট্টগ্রাম হতে সমতলে বাঙালিদের সম্ভাব্য স্থানান্তর রোধকল্পে তাদের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনার কার্যকরী পরিকল্পনা প্রণয়ন করার পাশাপাশি এদের শিক্ষা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে এনজিও, স্থানীয় প্রশাসন এবং নিরাপত্তা বাহিনীকে কার্যকরী ভূমিকা পালনে নির্দেশনা প্রদান করার অনুরোধ জানানো হয়।

পার্বত্য অধিকার ফোরামের সভাপতি মাঈনউদ্দিন বলেন- পাহাড়ে বাঙালিরা পদে পদে নির্যাতিত ও নিপীড়িত। তাদের ভূমির অধিকার নেই। সোনা মিয়া টিলাসহ বিভিন্ন গুচ্ছগ্রামে ৩০ হাজার বাঙালিকে একরকম বন্দি জীবনযাপন করতে হচ্ছে। তাদের বেদখল হয়ে যাওয়া ভূমি উদ্ধারে সরকারি নির্দেশনা প্রতিপালন হচ্ছে না। অথচ পিছিয়েপড়া হিসেবে শুধু উপজাতীয়রা সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে। সাংবিধানিক অধিকারের দাবিতে পাহাড়ি বাঙালিরা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসলেও প্রশাসন এতে ভ্রূক্ষেপ করছে না। বিভিন্ন সরকারি সংস্থায় কর্মরত প্রভাবশালী উপজাতিরা বাঙালিদের স্বার্থ রক্ষায় বাধা সৃষ্টি করছে।

স্থানীয় বাঙালিরা জানান, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড প্রদত্ত শিক্ষাবৃত্তি প্রাপ্তদের তালিকা দেখেই বৈষম্যের বিষয়টি আঁচ করা যায়। ২০১৫ সালে তিন পার্বত্য জেলায় সর্বমোট ৪৭৫ জনকে এই বৃত্তি দেওয়া হয়। এর মধ্যে উপজাতীয় শিক্ষার্থী ছিল ৩৬৪ জন আর বাঙালি (মুসলিম, হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী) ছিল ১১১ জন। এছাড়া চাকরি ও শিক্ষাক্ষেত্রে উপজাতি কোটা থাকলেও বাঙালিরা এ ধরনের সুযোগ পায় না। সরকারি ব্যাংক থেকে উপজাতিরা স্বল্প সুদে ঋণ গ্রহণ করতে পারে (৫% সুদ হারে), বাঙালিদের এ সুযোগ নেই। উপজাতিরা আয়কর প্রদান হতে অব্যাহতিপ্রাপ্ত। কিন্তু বাঙালিদেরকে আয়কর দিতে হয়। উপজাতিদের ভোটাধিকার রয়েছে এবং তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের যে কোনো জায়গায় জমি ক্রয় করতে পারে। কিন্তু শান্তিচুক্তি অনুযায়ী শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী ঠিকানাসম্বলিত বাঙালিদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে কিন্তু অন্যান্যের বেলায় সে সুযোগ রাখা হয়নি। জমি ক্রয়ের ক্ষেত্রেও রয়েছে নানাবিধ জটিলতা। স্থায়ী সনদ প্রাপ্তির  ক্ষেত্রে উপজাতি সার্কেল চিফদের নিকট থেকে সার্টিফিকেট নিতে গিয়ে বাঙালিরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

বাঙালিদের প্রতি বৈষম্যের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মেজবাহুল ইসলাম ইত্তেফাককে বলেন, পিছিয়েপড়া জনপদ হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামের বিষয়টিকে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করছে। ফলে ওই অঞ্চলে ইতোমধ্যে ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে এবং আরো অনেক প্রকল্প চলমান রয়েছে। সব কর্মকাণ্ড সরকারের গাইডলাইন অনুসারে পরিচালিত হচ্ছে। কোনো জনগোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্য করা হচ্ছে না।