নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের মসজিদে জুমার নামাজ চলাকালে ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞের পর নব্য নািসবাদী সন্ত্রাসী সংগঠন ‘ব্ল্যাক সান’ নিয়ে বিশ্বজুড়ে হৈচৈ শুরু হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো বলছে, হামলাকারী শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী সন্ত্রাসী ব্রেন্টন টারান্ট কুখ্যাত ‘ব্ল্যাক সান’র সদস্য। টুইটারে তার প্রকাশিত ৭৪ পাতার ইশতেহারের প্রচ্ছদে ‘ব্ল্যাক সান’ এর লোগো ব্যবহার করেছেন ব্রেন্টন। নিউইয়র্ক টাইমস, ডেইলি টেলিগ্রাফ, ডেইলি মেইল, সান হেরল্ড, নিউইয়র্ক পোস্টসহ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম জানাচ্ছে,অস্ট্রেলিয়ার ২৮ বছর বয়সী সন্ত্রাসী ব্রেন্টন টারান্ট নিজেকে কট্টর শ্বেতাঙ্গবাদী মানুষ হিসাবে উপস্থাপন করে আসছিলেন। তার ইশতেহারে নানামুখী আদর্শ, অভিবাসন ও মুসলিম বিদ্বেষের কথা তুলে ধরেছেন ব্রেন্টন। উগ্র শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠার জন্য সে যোগ দিয়েছে ‘ব্ল্যাক সান’ সোসাইটিতে।
বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্কট মরিসন বলেছেন, ক্রাইস্টচার্চে হামলাকারী একজন উগ্র মনোভাবের অধিকারী ডানপন্থী উন্মত্ত জঙ্গি। অন্যান্য সংবাদ মাধ্যম বলছে, ইতিপূর্বে ‘ব্ল্যাক সান’ এর সদস্য অ্যান্ডার্স বেহরিং ব্রেইভিক ২০১১ সালের ২২ জুলাই নরওয়ের লেবার পার্টির বার্ষিক ইয়ুথ ক্যাম্পে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ৭৭ জনকে হত্যা করে। তার ২২ বছরের জেল হয়েছে। ২০১৬ সালের জুলাই মাসে জার্মানির মিউনিখে শপিং সেন্টারে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ৯ জনকে হত্যাকারী যুবক ছিল ‘ব্ল্যাক সান’ এর সদস্য। নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, ব্রেন্টন টারান্ট দাবি করেছেন নরওয়েজিয়ান গণহত্যাকারী অ্যান্ডার্স বেই্রভিকের সঙ্গে তার ‘সংক্ষিপ্ত যোগাযোগ’ ছিল, তিনি এই হামলার জন্য তাকে ‘আশীর্বাদ’ দিয়েছেন।
এদিকে ‘ব্ল্যাক সান’কে বলা হচ্ছে শ্বেতাঙ্গ উগ্রবাদী সন্ত্রাসীদের আঁঁতুর ঘর। ব্ল্যাক সান সোসাইটি মনে করে পশ্চিমের দেশগুলোতে কেবল শ্বেতাঙ্গরা বসবাস করার অধিকার সংরক্ষণ করে। অভিবাসী বা মুসলিমরা সেখানে থাকার যোগ্য নয়। তারা কট্টর শ্বেতাঙ্গদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করে। এই সংগঠন কবে কোথায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা জানা যায়নি। সম্পূর্ণ গোপন এই সংগঠন বিশ্বজুড়ে হিটলারের আদর্শের অনুসারীদের নিয়ে কাজ করে। জার্মান একনায়ক হিটলারের সময় থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত জার্মানির উত্তরাঞ্চলে ওয়েলসবার্গ দুর্গটি হিটলারের বাহিনীর (এসএস) জেনারেলদের জন্য ব্যবহার হতো। ওয়েলসবার্গ দুর্গের মেঝেতে ১৯৩৩ সালে হিটলারের সময়ে একটি লোগো স্থাপন করা হয়। লোগোতে কালো গোলাকৃতির মধ্যে ১২টি সাদা রঙের ফাঁকা অংশ রয়েছে। তত্কালীন জার্মানিতে হিটলারের পরে দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি জেনারেল হেনরিক হিমলারের নেতৃত্বে এই লোগোটি বসানো হয়, যা দেখতে অনেকটা চাকার মতো। লোগোটি নািস বাহিনীর দলীয় লোগোর সাথে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে ‘ব্ল্যাক সান’ ওয়েলসবার্গের ওই চিহ্নটিই তাদের লোগো হিসেবে ব্যবহার করছে। সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত সংগঠনটি নব্য নািসবাদীদের সংগঠন হিসেবে সারাবিশ্বে পরিচিত। ১৯৯১ সালে লেখক রাসেল ম্যাক ক্লাউড এ বিষয়ে একটি বই প্রকাশ করেন। তার ‘জার্মান দ্য ব্লাক সান অব তাসি লুনপো’ নমের বইটিতে ব্ল্যাক সানের সন্ত্রাসী গোপন কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রথম লিখিত তথ্য প্রকাশ করা হলে সারাবিশ্বে ব্যাপক হৈচৈ শুরু হয়। ওই সময় বইটি বেস্ট সেলার হয়। খ্যাতিমান লেখক নিকোলাস গডরিক ক্লার্ক বইটিকে ‘অকাল্ট নািস থ্রিলার’ হিসেবে সজ্ঞায়িত করেন।
নািসবাদীরা ‘ব্ল্যাক সান’ লোগো নিজেদের ঐতিহাসিক আদর্শের প্রতীক বলে মনে করে। হিটলারের আদর্শ থেকেই তারা নিজেদের সংগঠনের নাম দেয় ‘ব্ল্যাক সান’। এই সংগঠন গোপনে সারা বিশ্বে তাদের স্বার্থ হাসিলের জন্য নানামুখী অপকর্ম চালাচ্ছে। এর সদস্যরা নিজেদেরকে কট্টর ডানপন্থি শ্বেতাঙ্গ বলে পরিচয় দিয়ে থাকে।
