সাঈদ সাহেদুল ইসলাম
চলছে মাসব্যাপী জামাই আদর মেলা। চল্লিশোর্ধ্ব জাহিদের মন আজ বেশ চাঙা। তার গায়ে আর ছেঁড়া-ময়লা কালো কোট নেই। ভাঙা বাইসাইকেলটায়ও হাতে নিতে হবে না আর। তার কপাল খুলেছে। কুড়ি টাকায় টিকেট কিনে জামাই আদর মেলায় লটারি লেগেছে তার—মোটর বাইক। নিয়ম অনুযায়ী তাকে জামাই বেশে সাজিয়েছে মেলার কর্তৃপক্ষ। তাজ পরেছে বিয়ের, গলায় ফুলের মালা, দেহে বরের পাঞ্জাবি-পায়জামা। পায়ে নতুন নাগড়া। আহা কী আনন্দ! কী জামাই আদর!
বাসায় ফেরার পথে হঠাত্ মনে হলো তার বিবি বাসায় নেই। সে মেলায় যাওয়ার আগে পাশাপাশি বাপের বাড়িতে গেছে তার বিবি রাজিয়া বানু। মনে হলো তাকে চমকে দেবে। বাইকে করে নিয়ে যাবে নিজের বাড়িতে। মনে পড়ে কাছাকাছি বিয়ে হওয়াতে কোনো পেট্রোল-ডিজেল চালিত বাহন ছাড়া রিকশা করে তার বিবিকে ঘরে তুলেছিল সে।
শ্বশুর বাড়ির পথে যেতে পাড়াতো শ্যালিকা সখিনার দেখা। দ্বিগুণ আগ্রহে বাইকে তুলে নিয়ে চলছে শ্বশুরালয়ে। শ্যালিকা তার সাজসজ্জার কারণ জিজ্ঞেস করলে জাহিদ জানাল, জামাই আদর মেলায় লটারিতে বাইক পেলে মেলার কর্তৃপক্ষ এভাবেই তাকে জামাই আদরে সাজিয়ে দিয়ে বাসায় পাঠিয়ে দেয়।
মেলা থেকে ফিরতে সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। জাহিদের বিবি রাজিয়া বানু ঘনঘন পথ চেয়ে আছে। রাতে স্বামীর বাড়ি ফিরতে কোলের মেয়েটার না আবার ঠাণ্ডা লাগে। আর অষ্টম শ্রেণিপড়ুয়া তার বড় ছেলেটা আগেই বাড়িতে চলে গেছে।
গোধুলির রং জাহিদের শরীরে। তার শরীরে জামাইসজ্জা। পিছনে সখিনা। নতুন বাইক এসে থামে শ্বশুরবাড়ির উঠোনে। আলো-আঁধারের খেলায় তার বিবি রাজিয়া বানু স্বামীর শরীরে বিয়ের সজ্জা আর সঙ্গে মেয়েটাকে দেখে আশ্চর্য। জাহিদ আবার বিয়ে করেছে তাহলে? কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই কোলের মেয়েটাকে মাটিতে নামিয়ে দিয়ে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করে রাজিয়া বানু, ‘কে কোথায় আছিস বাবা, আয় রে...! ও আমার কপাল ভেঙেছে রে...! ও আবার বিয়ে করে নতুন বউ নিয়ে এসেছে রে...!’
জাহিদ কিছু বলার আগেই রাজিয়া বানুর কান্নায় তাকে ঘিরে সবাই উপস্থিত। চাচা শ্বশুর মতিয়ার কোনো কথা না বলেই জাহিদের জামাইসজ্জা দেখে তার বাম গালে একটা চড় বসিয়ে দেন।
সঙ্গে আসা সখিনা দৌড়ে গিয়ে রাজিয়া বানুর কান্নারত কোলের শিশুটিকে বুকে জড়িয়ে জাহিদের দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হেসে বলল, ‘দুলাভাই, বুড়ো বয়সে নতুন জামাই সাজার সাজা-শাস্তিটা ভোগ করো তো এবার...।’
