আদর্শবান ব্যাচেলর

আপডেট : ১৬ মার্চ ২০১৯, ১৯:০৮

 

 শফিকুল ইসলাম শফিক

 

আমরা ক্ষুব্ধ ব্যাচেলর। তাই বলে এ জীবন তুচ্ছ নয়। বেশি বেশি ডিম খাই। অনেকে সহ্য করতে পারে না। সহ্য করার জন্য কারও হাতে-পায়ে ধরার ইচ্ছে নেই। সবাই আমাদের পছন্দও করে না। মনের দুঃখ মনেই পুষতে হয়। আমাদের যেমন জাত-কুল-মান আছে। তেমনি ডিমেরও জাত-কুল-মান আছে। যে ডিমে বাচ্চা হয়, সে ডিম খাই না। আমরা আদর্শবান ব্যাচেলর। যত খুশি পোল্ট্রির মুরগির ডিম খাই। প্রতিদিন খাওয়ার রুটিনে যে কোনো বেলা ডিম থাকে। কারণ, ডিম ব্যাচেলরের জাতীয় খাবার। ব্যাচেলররা ডিম না খেলে দেশের অর্থনীতির চাকা কিভাবে সচল থাকে? এটা না বুঝে অনেকেই অহেতুক প্রশ্ন করে। আমাদের ঘরে যে কেউ এলে সর্বপ্রথম ডিমের গন্ধ পাই। সে জন্য হাতের নাগালেই ডিম রাখি। এটা কি আমাদের অপরাধ?  

দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে একটি বাসায় ভাড়া থাকি। বাসার স্মৃতি ধরে রাখার জন্য ছাড়তেও পারি না, আবার কোথাও যেতেও পারি না। একা একা থাকতে হলে প্রথমে রান্না শিখতে হয়। ভাবতাম, কার কাছে রান্না শিখব? অবশ্য কিছুদিন একটা অ্যান্টির কাছে ফ্রিতে রান্নার কোর্স কমপ্লিট করেছি। এখন নির্ভয়ে সবকিছু রান্না করতে পারি। বিশেষ করে সুস্বাদু হয় ডিমের রান্না। রান্নার ঘ্রাণে মহল্লার সবাই হাড়ে হাড়ে টের পায়। অনেকে দেখতে আসে। তাদের খাওয়ার নিমন্ত্রণ জানাই। ব্যাচেলর বলে আবার নাক সিটকে দূরে চলে যায়। অন্তত যে কেউ একবার খেলেই তরকারি নাকে মেখে সারা এলাকায় ঘুরবে। সেটা গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি। আচ্ছা, খাওয়ার জন্য কি টাকা দিতে হবে? ফ্রি ডিম বিলিয়ে দিতে চাই। তবে লোকের কেন এত ভয়? আজও সেটা ক্যালকুলেটরে হিসাব করেও মিলাতে পারি না।

আমার রুমের পাশেই আরও কয়েকটি রুম আছে। সেখানে আগে যারা ভাড়া থাকত, তারা কেউ আমাকে অপছন্দ করত না। তারা যাওয়ার পর নতুন ভাড়াটিয়া আসে। বর্তমানে আমি সুষ্ঠু রান্না করতে পারি না। তারা বলে, ডিম ছাড়া আমি নাকি কিছুই খাই না! এত ডিম খেলে নাকি অরুচি জন্মে! তাদের জ্বালায় কলিজা একদম তিতা হয়ে গেছে। মাঝে মাঝে সবজি, ডাল, গোশত খাই। তখন কেউ পরখ করতে আসে না। কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করাই বুঝি তাদের জন্মগত স্বভাব। ওরা কি জীবনেও ডিম খায় না? না খেলে এসব কথা হজম করতে পারতাম।

গত একমাস বাড়িতে ছিলাম। মা ডিম রান্না করলে নানা আপত্তি জানাতাম। বলতাম, ‘ডিম খেতে আর ভাল্লাগে না। আর কত ডিম খাব?’ তবু ডিমের কথা শুনলে লোভ সামলাতে পারি না। একটু পেলে গাপুস-গুপুস খাই। যেখানেই যাই, ডিম যেন আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। কেউ ডিমের খবার নষ্ট করলে মনে হয় তার গালে নগদ একটা চপেটাঘাত করি। আবার ভাবি, তাকে মারার সাহস কোত্থেকে পাব? ওটা তো আর আমি নই। এমনকি গ্রাম বা শহরে কোনো মেহমান এলেই খাবার মেন্যুতে ডিম থাকে। তাদের কেউ আপত্তি জানায় না। আমার বেলায় যত্তসব আপত্তি! এ আবার কেমন নিয়ম? আর কত নিয়ম মেনে চলতে হবে? প্রশ্ন পাঠকদের কাছে রেখে গেলাম।

 

কিছুদিন আগে শীতের ছুটি শেষে শহরে এলাম। বাড়ি থেকে কয়েক কেজি টাটকা শিমও আনলাম। ভেবেছি, এবার ডিমের মেন্যুর পরিবর্তে বেশি বেশি শিমভাজি বা শিমের তরকারি খাব। দেখি এবার ঠেকায় কে? মাত্র দু-একদিন খেতে না খেতেই পাশের আন্টি বললেন, ‘শুধু শিমভাজি খাওয়া যায়? তার সাথে ডিমভাজি খান। মুখে আরও রুচি বাড়বে।’ তার কথায় যুক্তি আছে। মনে মনে অভিনন্দন জানালাম। তিনি নীরবে বুঝতে পেরেছেন। সেদিন রাতেই বাজার থেকে একহালি ডিম কিনে আনলাম। তখন অনেক রাত। মহল্লার দোকানও বন্ধ করে দিয়েছে। স্টভ ঝাঁকিয়ে দেখলাম, তেলের আওয়াজ নেই। সলতে একটু ভিজা ছিল। হালকা ডিমভাজি করলাম। অবশেষে ডিম ও শিমভাজি দিয়ে মাখো মাখো করে পেটপুরে ভাত খেলাম। ডিমের স্বাদ কোনো অংশেই কম হয়নি। আহা কী স্বাদ!

কনইল, নওগাঁ