প্রেমরোগ

আপডেট : ১৬ মার্চ ২০১৯, ১৯:০৮

 

 শেখ বিপ্লব হোসেন

 

বিজয়বাবু অফিস থেকে ঘরে ফিরতে না-ফিরতেই শুরু হয়ে গেছে বউয়ের যত সব ঘ্যানর-ঘ্যানর। ঘরে এটা নেই সেটা নেই। নানা ধরনের বায়না বউয়ের। বউয়ের কা-কা শব্দে কান ঝালাপালা। প্রিয়তমা স্ত্রীর বকবকানিকে উপেক্ষা করেই নিজের কাপড়চোপড় পরিবর্তন করতে করতে বললেন, ‘তোমার কবিতা পাঠ রেখে আমাকে এক কাপ চা করে দাও! গলাটা একটু ভিজিয়ে নিই। গলাটা যেন শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।’

বিজয় বাবুর কথা শুনে, স্ত্রী রান্নাঘর থেকে একটু চেঁচিয়ে বললেন, ‘চা-টা হবে না এখন। ঘরে চিনি নেই। দোকানে গিয়ে চিনি নিয়ে এসো। তারপর  নাহয় ভেবে দেখব।’

স্ত্রীর কথা শুনে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন বেচারা বিজয়বাবু। ভাবলেন, তাহলে আর কী  করা! দোকানে গিয়ে চিনি নিয়ে আসি। নাহলে চা আর কপালে জুটবে না আজ। এই ভেবে আবার জামাকাপড় পরতে গেলেন। হঠাত্ ফোন বেজে উঠল। বিজয় বাবু মনে মনে ভাবলেন, এই সন্ধ্যাবেলা আবার কে ফোন করল? ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো, ‘কাকু, তাড়াতাড়ি আমাদের বাসায় চলে আসুন। একটা বড় সমস্যা হয়ে গেছে।’

কী সমস্যা? কার সমস্যা? কিছুই বোঝা গেল না। তিনি সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। রাস্তায় দাঁড়িয়ে অটোরিকশাওয়ালাকে ডাকলেন। রিকশাওয়ালা কাছে এলে, বললেন, ‘ইউনিক যাবে?’ রিকশাওয়ালা মাথা নেড়ে সম্মতি জানালে রিকশায় উঠে বসলেন। রিকশা তার নিজস্ব গতিতেই চলল। বিজয়বাবু রিকশায় বসে বসে কী যেন গভীরভাবে ভাবছেন। রিকশাওয়ালাও দুই কানে ইয়ারফোন লাগিয়ে মনের সুখে হিন্দি গান শুনছে আর রিকশার হ্যান্ডেল ধরে বসে আছে। রিকশা হাইস্কুল মোড় পার হয়ে যেই তিন সতীনের পুকুর পাড়ে এসে হাজির, হঠাত্ কে যেন ‘ও মা’ বলে চিত্কার দিয়ে উঠল! তার চিত্কার-চেঁচামেচিতে আশপাশের লোকজন ছুটে এলো। এসে দেখে যে একটা রিকশা খাদে পড়ে গেছে। আর রিকশার যাত্রী পড়ে গেছে পুকুরের পচা কাদা-জলে। রিকশার চালক রিকশাটাকে টেনে তোলার চেষ্টা করছে। ওদিকে সবাই বিজয়বাবুকে টেনে তুললেন রাস্তার ওপরে। রিকশাওয়ালা তো ভয়ে কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রিকশার পাশে। বিজয়বাবু উঠে দাঁড়ালেন। তিনি রাগান্বিত স্বরে বললেন, ‘পাঠার মতো দেহ নিয়েও ঠিকমতো রিকশা চালাতে পার না! তোমার রিকশায় ওঠাই ভুল হয়েছে আমার।’

মনে বিরক্তিভাব নিয়ে তিনি পাশের বাসায় গিয়ে ট্যাপের পানি ছেড়ে নিজের গায়ে লেগে থাকা কাদা-মাটি কোনোমতো পরিষ্কার করে নিলেন। তিনি আর রিকশায় উঠলেন না। পায়ে হেঁটেই আবার রওনা হলেন গন্তব্যের উদ্দেশে।

চাকরির সুবাদে বিজয়বাবুর দুই ভাগিনা আর দুই ভাতিজা অনেকদিন হলো এই ইউনিক এলাকায় থাকে। পোশাকশিল্পে চাকরি করে তারা। গ্রামের বাড়ি সিরাজগঞ্জের বেলকুচিতে। বিজয়বাবুর অনেক স্বপ্ন ছিল সবুজ-শ্যামল ছয়াঘেরা কোনো এক গ্রামের স্কুলে শিক্ষকতা করবেন। কিন্তু, কপালদোষে তা আর সম্ভব হয়নি। তিনি দীর্ঘদিন একটি এনজিওতেও চাকরি করেছেন। সেখানে ভালো সুযোগ-সুবিধা না-থাকায় শেষমেশ একটি প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করছেন ঢাকার উত্তরায়। কর্মস্থল উত্তরাতে হলেও বসবাসের জন্য বেছে নিয়েছেন আশুলিয়ার সবুজে ঘেরা এই গ্রামটিকে। বিজয়বাবুর এক ছেলে এক মেয়ে। তার স্ত্রী আয়শা বেগমকে বাইরে থেকে যতটা শক্ত মনের মানুষ মনে হয়, আসলে ততটা খারাপ নয় সে। তার ভিতরটা অনেক নরম। তার মন প্রকৃতির মতোই সহজ-সরল। স্বামীর প্রতি অগাধ ভালোবাসা তার। অনেক শ্রদ্ধাবোধ। শুধু মাঝে মাঝে একটু মাথা গরম হয় এই আর কী!

বিজয়বাবু ভাতিজার বাসায় গেলেন। বাসায় ঢুকে দেখলেন, ভাতিজা হোসাইন বর বেশে বসে আছে চেয়ারে। কিন্তু, এ কী! তার হাত-পা বাঁধা কেন? দেখে মনে হচ্ছে কেউ উত্তম-মধ্যমও দিয়েছে তাকে। ‘কী হয়েছে? ওকে এভাবে বেঁধে রেখেছ কেন?’ মনে কৌতূহল নিয়ে প্রশ্ন করলেন বিজয়বাবু। বিজয়বাবুর প্রশ্নের জবাবে রাজ বলল, ‘মামা, আপনি জানেন না যে, ও কী করেছে?’

—কী করেছে?

—ও একটা মেয়েকে পছন্দ করে।

—তো কী হয়েছে! এ বয়সে কাউকে পছন্দ হতেই পারে। তাই বলে...

—আমাদের কাউকে না-জানিয়েই ওই মেয়েকে আজ বিয়ে করতে গিয়েছিল ও।

—তারপর।

—তারপর আমরা খবর পেয়ে সবাই কাজি অফিসে গিয়ে ধরে নিয়ে এসেছি ওকে।

—বলিস কী? তা মেয়ে দেখতে কেমন? কোথায় থাকে? কার মেয়ে?

—এসব ওর কাছেই শোনেন।

বিজয়বাবু এবার হোসাইনের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কী বাবাজি! এসব কী শুনছি? এসব কী সত্যি?’

হোসাইন কোনো কথা বলে না। নিচের দিকে মাথা ঝুলিয়ে চপচাপ বসে আছে।

বিজয়বাবু আবার বললেন, ‘কী রে? কোনো কথা বলছিস না কেন? কী হয়েছে আমাকে খুলে বল!’

হোসাইন এবারও কোনো কথা বলল না। এমতাবস্থায় আবারও রাজ উত্তম-মধ্যম দিল ওকে। এবার মুখ খুলল সে। অন্যদিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমার ওকে ভালো লাগে। আমি ওকে বিয়ে করতে গিয়েছিলাম। ওরা আমাকে কাজি অফিস থেকে ধরে এনেছে। ওরা আমাকে বিয়ে করতে দিল না আজ।’

বিজয়বাবু বললেন, ‘সে তো বুঝলাম। তা মেয়ের বাসায় কে কে আছেন?’

—মেয়ের বাবা নেই, মা আছে।

বিজয়বাবু আবার বললেন, ‘মেয়ের আর কে আছে?’

—ক্লাস থ্রি-পড়ুয়া একটি ছেলে আছে।

‘মানে?’ ভাতিজার কথা শুনে বিজয়বাবুর চোখ যেন কপালে উঠে গেল।

বেলকুচি, সিরাজগঞ্জ