হাওরের ৪৬ প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত

আপডেট : ০২ এপ্রিল ২০১৬, ০৯:৩৪
প্রাকৃতিক সম্পদ সিলেটের হাওরগুলো থেকে ৪৬ প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। নদ-নদী ও জলাশয় ভরাট, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ এবং অবাধে মত্স্য নিধনের ফলে আরো কয়েক প্রজাতির মাছ হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন মত্স্য বিশেষজ্ঞরা।
 
সংশ্লিষ্টরা জানান, সেচের মাধ্যমে মত্স্য আহরণ, জলাশয়ে যত্রতত্র বাঁধ দিয়ে পানি প্রবাহে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি, জলবায়ুর পরিবর্তন, অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারসহ নানা কারণে দেশীয় প্রজাতির মাছের প্রজনন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে দেশীয় প্রজাতির বিভিন্ন মাছ। অথচ সিলেটের বিভিন্ন অঞ্চল বিশেষ করে সুনামগঞ্জ জেলা ছিল মাছের জন্য প্রসিদ্ধ।
 
সম্প্রতি মত্স্য অধিদফতরের সহায়তায় পরিবেশ অধিদফতরের উপকূলীয় ও জলাভূমি প্রকল্প জরিপ নামে একটি জরিপ কার্যক্রম চালানো হয়। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এনসিআরএস, আইডিয়া ও প্রচেষ্টা এই জরিপ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে। এই জরিপে দেখা গেছে, সিলেটের হাওরগুলোর ১০৭ প্রজাতির মাছের মধ্যে ৪৬ প্রজাতিই বিলুপ্ত হয়ে গেছে ও আরো কিছু প্রজাতি বিলুপ্তির পথে। জরিপের ফলাফলে বিলুপ্তপ্রায় মাছের প্রজাতিকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়। এগুলো হচ্ছে মহাবিপন্ন, সংকটাপন্ন এবং বিপন্ন। এর মধ্যে মহাবিপন্ন প্রজাতির মাছের মধ্যে রয়েছে টাটকিনি, বাগাড়, রিঠা, রাণী, পাঙ্গাস, বামোশ, নাফতানি, চিতল, একথুটি ও চাকা। সংকটাপন্ন প্রজাতির মাছের মধ্যে রয়েছে বাচা, ছেপচেলা, ঢেলা, বাঁশপাতা, কুঁচিয়া, নাপতেকই, বাতাসিয়া টেংরা, ফলি ও গুজিআইড়। এবং বিপন্ন প্রজাতির মাছের মধ্যে রয়েছে- গুলশা, ঘইন্যা, দাড়কিনা, আইড়, পাবদা, বড়বাইন, গজার, তারাবাইন, তিতপুঁটি, নামাচান্দা ও কালিবাউশ।
 
সিলেট বিভাগীয় মত্স্য অধিদপ্তরের সূত্র অনুযায়ী, হাকালুকি, টাঙ্গুয়ার, দেখার হাওর, শনির হাওরসহ বেশ কিছু হাওর ও নদী রয়েছে যেগুলোকে মাছের অভয়াশ্রম বলা হয়। এই অভয়াশ্রমগুলোতে প্রতি বর্ষায় মাছ ডিম ছাড়ে। আর ভরা বর্ষায় এই ডিমগুলো স্রোতের টানে ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন জলাশয়ে। সিলেট বিভাগের হাওরগুলো দেশীয় মাছের অন্যতম উত্স। দেশের মত্স্য চাহিদার একটি বৃহত্ অংশ এই হাওরগুলো থেকে আহরণ করা হয়।IMG0
 
এদিকে বিলুপ্ত প্রজাতির মাছ সংরক্ষণে ২০১১ সাল থেকে একটি প্রকল্প হাতে নেয় মত্স্য অধিদফতর। এই প্রকল্পের মাধ্যমে বিলুপ্তপ্রায় দেশীয় প্রজাতির মাছ চাষ, প্রজনন ও বংশবৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া হয়। এছাড়া বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাও একই লক্ষ্যে হাওর এলাকায় কাজ করছে। কর্মকর্তারা আশা করছেন আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এর সুফল দেখা যাবে।
 
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সিলেটে ৪ লাখ ৭০ হাজার ৫৫৬ হেক্টরজুড়ে হাওর, বিল ও জলাশয় রয়েছে। এসব উত্স থেকে প্রতিবছর  দেড় লাখ টন মাছ আহরণ করা হয়। তবে এক দশক আগে মাছ আহরণের পরিমাণ আরও বেশি ছিল।  সিলেট জেলা মত্স্য কর্মকর্তা শঙ্কর চন্দ্র পাল জানিয়েছেন, এই জরিপে উল্লেখিত প্রজাতিগুলোর মধ্যে কিছু প্রজাতির মাছ নদীতে ও বদ্ধ জলাশয়ে পাওয়া গেলেও হাওরে আর পাওয়া যাচ্ছে না। এছাড়া এই তালিকার বাইরেও আরো কিছু প্রজাতি আছে যা এখন বিলুপ্ত হতে  যাচ্ছে। যেমন চাপিলা মাছ, বালিগড়া, গুতুম, খাকি, উপল, চেলাপাতা, লাড়িয়া প্রভৃতি।
 
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আইডিয়ার নির্বাহী পরিচালক নজমুল হক বলেন, দেশীয় প্রজাতির মাছের বিলুপ্তিরোধ ও বিস্তারে হাওর অঞ্চলের মত্স্যজীবীদের মধ্যে তারা সচেতনতা সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। অসময়ে পোনা মাছ ধরা বন্ধ, মাছের ডিম ছাড়ার মৌসুম বৈশাখ থেকে শ্রাবণ মাস পর্যন্ত মত্স্যজীবীদের বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা ও ভিন্ন পেশা গ্রহণে উত্সাহিত করা, সেচের মাধ্যমে মত্স্য নিধন বন্ধ করা ও মত্স্য আইন সম্পর্কে মত্স্যজীবীদের সচেতন করে তোলার চেষ্টা করছে সংস্থাটি।IMG1
 
এ ব্যাপারে মত্স্য বিভাগের সিলেট বিভাগীয় উপ-পরিচালক ড. নিত্যানন্দ দাস বলেন, দেশীয় ও বিলুপ্ত প্রজাতির মাছের চাষ বাড়াতে মত্স্য বিভাগ থেকে চিহ্নিত অবক্ষয়িত জলাশয় উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা এবং দেশীয় প্রজাতির ছোট মত্স্য সংরক্ষণ প্রকল্প নামে একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। প্রায় ৮১ লাখ টাকার এই প্রকল্পের মাধ্যমে দেশীয় প্রজাতির মাছের পোনা অবমুক্ত ও নার্সারি স্থাপন করে মাছের প্রজাতি সংরক্ষণের চেষ্টা করা হচ্ছে।
 
এ বিষয়ে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মত্স্যবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক মো. শাহাব উদ্দিন বলেন, মাছের উত্পাদন বাড়াতে হাওরের জলজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং মা মাছের নির্বিঘ্নে বড় হওয়া ও প্রজননের সুযোগ সৃষ্টি করে দিতে হবে।