১৪২৩ বঙ্গাব্দকে স্বাগত জানানোর জন্য এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রায় থাকবে ১০ থেকে ১২টি শিল্প-কাঠামো বা ভাস্কর্য। বিশাল আকৃতির একটি কাঠামোয় দেখা যাবে একজন ‘মা’ পরম যত্নে তার দুই হাত দিয়ে শূন্যে তুলে ধরে আছে ভালোবাসার অনন্যধন শিশুকে। ২০ থেকে ২৫ ফুট উচ্চতার এই ভাস্কর্যটি দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হবে মা ও শিশুর চিরায়ত সম্পর্ককে।
সপ্তাহখানেক পরই পহেলা বৈশাখ। আর এর প্রস্তুতির অংশ হিসাবে শাহবাগের চারুকলার পুরো চত্বর জুড়ে যেন শুরু হয়ে গেছে কর্মযজ্ঞ। এবার মঙ্গল শোভাযাত্রার থিম ‘মা ও শিশু’। বর্ষবরণের এই মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রস্তুতিকে ঘিরে এখন ব্যস্ত শিক্ষার্থী-শিক্ষকরা। কাজের চাপে অনেকে কাটাচ্ছেন নির্ঘুম রাত। গেল বছরের চেয়ে আরো বর্ণিল উপস্থাপন কীভাবে করা যায় তারই চেষ্টা যেন সবার মাঝে। অন্যদিকে ধানমন্ডির ছায়ানট ভবনেও চলছে বৈশাখের প্রভাতী অনুষ্ঠানের মহড়া।
চারুকলার গেট দিয়ে ঢুকতেই দেখা গেল করিডোরে বিশাল টেবিলে ছড়িয়ে রাখা সারি সারি সরাচিত্র। সেসবে আঁকা পল্লীবধূর মুখ, লক্ষ্মীপ্যাঁচা, হরেক রকমের পাখি, হাতি, বিড়াল, বাঘ, রাখাল — বৈচিত্র্যময় সব লোকজ বিষয়। সরাচিত্র সৃজনের পর সেগুলো ঠাঁই পাচ্ছে পাশের দুটি টেবিলে। আরেক অংশে দেয়ালজুড়ে সাজিয়ে রাখা চারুশিক্ষার্থীদের চিত্রিত জলরংয়ের নানা বিষয়ভিত্তিক চিত্রকর্ম। চারুকলার লিচুতলায় চলছে মঙ্গল শোভাযাত্রার কর্মযজ্ঞ। চারুকলার শিক্ষার্থী রনি বললেন, আমি এই প্রথম শোভাযাত্রার কাজে যুক্ত হয়েছি। সবার উত্সব তো পহেলা বৈশাখে। কিন্তু আমাদের উত্সব অনেক আগেই শুরু হয়ে গেছে।
বাংলা নববর্ষ বা পহেলা বৈশাখ উদযাপন বাঙালির প্রাচীনতম ঐতিহ্য। পহেলা বৈশাখে নতুনকে গ্রহণ করার, পুরানোকে মুছে ফেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা গ্রহণ করা হয় উত্সব পালনের মধ্য দিয়ে। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাংলাদেশে এই নববর্ষ উদযাপন পরিণত হয়েছে সর্বজনীন উত্সবে। সেই ১৯৬৪ সাল থেকে রমনা পার্কে ছায়ানটের প্রভাতী সঙ্গীত আসরের মধ্য দিয়ে নগর জীবনে পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়। পরে ১৯৮৯ সাল থেকে শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মঙ্গল শোভাযাত্রা।
গ্রামে বৈশাখ পালন হয় অবশ্য একটু ভিন্ন আমেজে। নগরজীবনে এই দিন যেমন পান্তা-ইলিশ খাওয়ার ধুম পড়ে যায়, তেমনি যুক্ত হয় নতুন কাপড় পরার আয়োজনও। তবে গ্রামবাংলায় সকালবেলা দই-চিড়া দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন করার রেওয়াজ আছে। ব্যবসায়ীরা দোকানে দোকানে হালখাতার আনুষ্ঠানিকতায় মিষ্টি দিয়ে তাদের ক্রেতাদের স্বাগত জানান। বৌদ্ধপ্রধান জেলা যেমন— কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে চৈত্র সংক্রান্তিতে অনুষ্ঠিত হয় বৈসাবি উত্সব।
বিগত চার দশকের ধারাবাহিকতায় এবারও নববর্ষ উদযাপনের প্রধান আকর্ষণ রমনা বটমূলে ছায়ানটের প্রভাতী অনুষ্ঠান। ছায়ানটের প্রধান নির্বাহী সিদ্দিক বেলাল জানালেন, ছায়ানটের এবারের আয়োজনের থিমটা দর্শকদের জন্য চমক হিসাবে রাখা হয়েছে। তবে অনুষ্ঠানের মহড়া শুরু হয়ে গেছে তিন মাস আগেই। প্রায় দেড়শ’ শিল্পী অংশ নেবেন এবারের অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠান শুরু হবে ভোর ৬টায়।
পহেলা বৈশাখে প্রাণের জোয়ারে জেগে ওঠা নগরীর আরেকটি প্রধান আকর্ষণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রা। এ শোভাযাত্রা নববর্ষ উদযাপন সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। চারুকলার শিক্ষার্থী ও বৈশাখ উদ্যাপন কমিটির ভাস্কর বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক মহিবুল ইসলাম আরিফ বললেন, আমাদের দেশে ‘মা ও শিশু’র সম্পর্কটি সব সময়ই মধুময়-অনেক আবেগ আর ভালোবাসার। এই সম্পর্কটা সবসময় আমাদের সমাজে ইতিবাচক বিষয় হিসেবে বিবেচিত ছিল-এখনও আছে। কিন্তু ইদানিং ক্রমাগত ঘটছে শিশু নির্যাতনের ঘটনা। মা হত্যা করছেন সন্তানকে। পত্রিকার পাতায় এসব সংবাদ দেখে আঁতকে উঠি। এসব বিষয়কে সামনে রেখেই এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার জন্য তৈরি হচ্ছে নানা রকম ভাস্কর্য। পাশাপাশি আমাদের চিরায়ত সংস্কৃতির ঐতিহ্য অনুসারে বরাবরের মতো এবারও থাকছে—হাতি, ঘোড়া, হরিণ, ময়ূর পাখির কাঠামো। এই সব ভাস্কর্যের কাঠামো তৈরি শেষ হলেই তাতে লাগানো হবে কাগজ। এজন্যে চারুকলার বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। কাঠামোগুলোর নির্মাণ শেষে রং-তুলির আঁচড়ে ফুটিয়ে তোলা হবে পরিপূর্ণ অবয়ব।
সংশ্লিষ্টরা জানান, গত ১৬ মার্চ আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র প্রস্তুতি পর্বের উদ্বোধন করেন প্রখ্যাত দুই শিল্পী রফিকুন নবী ও মনিরুল ইসলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেনসহ অন্য শিক্ষকদের নির্দেশনায় চলতি বছর এ কাজ করছে অনুষদের মাস্টার্স দ্বিতীয় বর্ষের ১৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। এই ব্যাচের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন খালিদ হাসান রবিন।
