বরাদ্দের শর্তভঙ্গ করে রাজধানী ঢাকায় সরকারি প্লটে অবস্থিত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স বাতিলসহ বিভিন্ন সেবা যেমন- বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস ও টেলিফোন লাইন বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে অভিযুক্ত ওইসব প্রতিষ্ঠান থেকে ট্যাক্স ও ভ্যাট আদায় বন্ধ রাখবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।
সরকারি প্লটের পর ব্যক্তি-মালিকানাধীন ভবন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের ক্ষেত্রেও একই সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। রাজধানীর বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় ৩ হাজারের মতো ভবনে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চলছে। গত ৪ এপ্রিল মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে এ সিদ্বান্ত নেয়া হয়। সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়নে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ এবং সিটি করপোরেশনকে নির্দেশও দেয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, আবাসিক প্লটে নির্মিত ভবন বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা যাবে না। আবাসিক এলাকায় নির্মিত ভবনে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান উচ্ছেদ অভিযানে নিয়ম ভঙ্গের মহোৎসব গোচরে আসে কর্তৃপক্ষের। রাজধানীর অভিজাত আবাসিক এলাকায় নির্মিত ভবনে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে মহানগরীতে যানজট বৃদ্ধির পাশাপাশি নিরাপত্তা বিঘিœত হচ্ছে। একই সঙ্গে স্বকীয়তা হারাতে বসেছে আবাসিক এলাকাও। এই পরিস্থিতিতে সরকার কঠোর হতে বাধ্য হয়েছে।
২০১৫ সালের ৮ জুন মন্ত্রী পরিষদের বৈঠকে মহানগরীর রাস্তার পাশে ও আবাসিক ভবনে বাণিজ্যিক ভবন, রেস্টুরেন্ট ও বারসহ অনুমোদিত কার্যক্রম বন্ধে স্থানীয় সরকার বিভাগের নেতৃত্বে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগকে যৌথভাবে দায়িত্ব দেয়া হয়। পরবর্তীতে এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কে।
এ নির্দেশনার পর গত বছরের ৩০ জুন রাজউক চেয়ারম্যানকে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহ একটি চিঠি দেন। চিঠিতে রাজধানীর যেসব বহুতল ভবনের বেইসমেন্ট ও কারপার্কিংয়ের স্থান বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেসব ভবন থেকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান উচ্ছেদ এবং সংশ্লিষ্ট ভবন মালিকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়। এতেও তেমন কোনো কাজ হয়নি।
রাজউকের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির ২ নম্বর জোন উত্তরা ও টঙ্গী এলাকায় ১ হাজার ৩৭৫টি, ৩ নম্বর জোনের মিরপুর ও সাভার এলাকায় ৪৪৪টি, ৪ নম্বর জোনে গুলশান ও মহাখালী এলাকায় ৯০টি (আংশিক), ৫ নম্বর জোনে ধানমণ্ডি ও লালবাগ এলাকার ৩৩টি (আংশিক), ৬ নম্বর জোনে মতিঝিল ও ভুলতা এলাকায় ৩২টি (আংশিক), ৭ নম্বর জোনে সূত্রাপুর ও কেরানীগঞ্জ এলাকায় ২৪টি (আংশিক), ৮ নম্বর জোনে ডেমরা-নারায়ণগঞ্জ এলাকায় ২৬টি (আংশিক) এবং বনানী ও বারিধারা এলাকায় ৪০৮টি ভবনসহ ৩ হাজারের বেশি ভবন বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
এছাড়া বেইসমেন্ট ও কারপার্কিংয়ের জায়গায় ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা হচ্ছে। এসব ভবনের বেইসমেন্ট ও কার পার্কিংয়ের স্থানে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার কারণে একদিকে যেমন মহানগরীর যানজট বৃদ্ধি পাচ্ছে, অন্যদিকে বিপুল অংকের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। অবৈধ ভবনের তালিকা প্রণয়নের পাশাপাশি করণীয় নির্ধারণে বেশকিছু সুপারিশও দিয়েছে গঠিত কমিটি।
এর মধ্যে মন্ত্রিপরিষদ বৈঠকে বেশকিছু সুপারিশ সিদ্বান্ত হিসেবে নেয়া হয়। সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে রয়েছে- আবাসিক এলাকার কোন প্লটে বেইসমেন্টের জায়গা গাড়িপার্কিং তা নিশ্চিত করতে হবে। উচ্ছেদ করতে হবে আবাসিক হোটেলসহ বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত স্থাপনা। রাজউক ও সিটি কর্পোরেশন এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করবে।
এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ভবন মালিককে নিজ উদ্যোগে অপসারণের জন্য ছয়মাস সময় দেওয়া যাবে। এর মধ্যে না করলে পরবর্তী এক মাসের মধ্যে সব অপসারণ করতে হবে। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত মোট ৬ মাস সময় পাবেন ভবন মালিকেরা। এর মধ্যে ভবনগুলো অপসারণ না করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স বাতিল ও সব সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সেবা কার্যক্রম বন্ধ থাকবে। এছাড়া অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ট্যাক্স ও ভ্যাট আদায় বন্ধ রাখবে। একই সঙ্গে আবাসিক এলাকায় বার বা মদের লাইসেন্স বাতিল, অপসারণ এবং নতুন লাইসেন্স না দেয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়া হয়।
এ ব্যাপারে রাজউকের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী জয়নাল আবেদীন ইত্তেফাককে বলেন, মšী¿পরিষদ বৈঠকের এ সিদ্ধান্ত এখনো আমাদের হাতে এসে পৌঁছায়নি। সরকারের সিদ্ধান্ত অবশ্যই বাস্তবায়ন করা হবে।
