নওগাঁর রাণীনগরে চলতি ইরি-বোরো মৌসুমের ধান কাটা ও মাড়াইয়ের কাজ শুরু হয়েছে পুরো দমে। কৃষকরা এবার ইরি-বোরোর বাম্পার ফলনের আশা করছেন। ব্যস্ত সময় পার করছেন বাড়ির কৃষক ও কৃষাণীরা। তাদের দম ফেলার সময় নেই। যত তাড়াতাড়ি পারা যায় কালবৈশাখী ঝড়ের আগেই কৃষকরা তাদের কষ্টের ফসলকে ঘরে নিতে চান। তাই বাড়ির কৃষকের পাশাপাশি বাড়ির খলিয়ান তৈরি করাসহ অন্যান্য কাজে ব্যস্ত কৃষাণীরাও।
কিন্তু বর্তমান বাজারে ধানের দাম নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন এলাকার কৃষকরা। যদি কৃষকরা তাদের ধানের ন্যায্য মূল্য না পান তাহলে উচ্চ হারে লোকসান হওয়ার আশঙ্কা করছে কৃষকেরা।
এখন উপজেলার বিভিন্ন মাঠ ধানের শীষের পাকা সোনালী রংয়ে ছেয়ে গেছে। যেদিকে দৃষ্টি যায় শুধু পাকা ধান আর ধান। মাঠের কোন কোন জায়গায় দেখা যাচ্ছে দিনমজুররা ধান কাটছে আবার কেউ কেউ সেই কাটা ধান কাঁধে করে নিয়ে আসছে কৃষকের বাড়িতে। গত আমন মৌসুমে ভয়াবহ বন্যায় অধিকাংশ আমন ধানের জমি তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকদের ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। সেই ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নিতে কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মাঝে ইরি-বোরো চাষের জন্য রাসায়নিক সার সহ কৃষি উপকরণ বিতরণের ফলে একটু আগাম সময়েই কৃষকরা ইরি-বোরো ধান চাষ করেছিলেন। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার ইরি-বোরো ধানের বাম্পার ফলনের আশা করা হচ্ছে। এবার প্রতি বিঘা জমিতে গড়ে ২৫ মণ ও হাইব্রিড জাতের ৩২ মণ হারে ধানের ফলন পাওয়া যাবে যা বিগত দিনের চেয়ে অনেক বেশি। তবে মাঠের কিছু নিচু জমিতে ইউরিয়া সারের পরিমাণ বেশি দেওয়ায় সেগুলোতে ফলন একটু কম হয়েছে। কয়েক সপ্তাহ আগে শিলা বৃষ্টি ও ঝড়ে সার বেশি দেয়া জমিগুলোর ধান পড়ে যাওয়ায় বিচ্ছিন্ন ভাবে রোগের আক্রমণ দেখা দিলে কৃষি বিভাগের মাঠ তদারকি ও পরামর্শ অনুসারে কৃষকগণ সঠিক বালাইনাশক ব্যবহার করে রোগের আক্রমণ থেকে তাদের ফসলকে রক্ষা করতে পেরেছেন।
IMG0
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা, চলতি ইরি-বোরো মৌসুমে উপজেলার ৮টি ইউনিয়নে প্রায় ১৯ হাজার ১শত হেক্টর চাষযোগ্য আবাদি জমিতে ইরি-বোরো চাষ করেছেন কৃষকরা। অনুকূল পরিবেশ থাকায় ও কোন প্রকার রোগবালাই ছাড়া এবার ইরি ধান-বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। তবে ধান রোপণের পরে হঠাৎ ঠাণ্ডা আবহাওয়া, ঘন কুয়াশা জনিত কারণে ও দেশজুড়ে সম্প্রতি হয়ে যাওয়া শিলা বৃষ্টি ও ঝড়ে এই এলাকায় তেমন কোন ক্ষতি হয়নি বলে স্থানীয় কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান।
এই ইরি-বোরো মৌসুমে কৃষকরা জিরাশাইল, বিরি ধান-২৮ ও ২৯, বিভিন্ন জাতের হাইব্রিড, খাটো-১০ ও পারিজা জাতের ধান চাষ করেছেন। তবে এগুলোর মধ্যে শতকরা ৯০ ভাগই জিরাশাইল জাতের ধান চাষ করা হয়েছে। এবার প্রতি বিঘা জমির ভাড়াসহ ধান উৎপাদনে কৃষকদের খরচ হয়েছে প্রায় ১৭ হাজার টাকা আর প্রতি বিঘায় শুধু ধান উৎপাদনে খরচ পড়েছে প্রায় ৭শত ৫০টাকা। কিন্তু বর্তমান বাজারে ধানের মূল্য অনেক কম। যদি ধানের মূল্য বৃদ্ধি করা না হয় তাহলে ধান বিক্রি করে কৃষকরা লাভের পরিবর্তে লোকসানে পড়বে। কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে মাঠ পর্যবেক্ষণ করে কৃষকদের যথাযথ ভাবে পরিচর্যা, রাসায়নিক সার ও কীটনাশক প্রয়োগের পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
উপজেলার মিরাট ইউপির হরিশপুর গ্রামের কৃষক আজিজার রহমান জানান, ইরি-বোরোর এই মৌসুমে তার ২৫ বিঘা জমিতে জিরাশাইল ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। ইতিমধ্যে তিনি ধান কাটা-মাড়াইয়ের কাজ শুরু করেছেন। এ পর্যন্ত তিনি বিঘা প্রতি গড়ে ২২মণ করে ধান পেয়েছেন। এখন শুধু ভালো ভাবে পুরো ধান ঘরে নিয়ে আসার অপেক্ষায়। তবে কিছু জমিতে খাটো-১০ ও একই জাতের চারা বার বার রোপণ করার কারণে বিচ্ছিন্ন ভাবে কিছু ধানে ব্লাস্ট রোগ আক্রমণ করলেও তা কৃষি অফিসারের পরামর্শ অনুযায়ী সঙ্গে সঙ্গে ওষুধ প্রয়োগ করায় তেমন কোন ক্ষতি হয়নি।
আতাইকুলা গ্রামের কৃষক আইয়ুব হোসেন জানান, প্রায় ১৫ বিঘা জমিতে তিনি এই মৌসুমে জিরাশাইলসহ বিভিন্ন জাতের হাইব্রিড ধান চাষ করেছেন। কোন রোগবালাই ছাড়াই ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে কিন্তু শঙ্কা হচ্ছে ধানের মূল্য নিয়ে। সরকার সরাসরি আমাদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করলে আমরা একটু হলেও লাভবান হবো। বর্তমানে ধানের বাজারে দামের যে দরপতন তাতে কৃষকরা লোকসানের মুখে পড়বে। তাই আমাদের মতো কৃষকদের কথা ভেবে সরকারের উচিৎ ধানের মূল্য বাড়ানো। তা না হলে কৃষকরা মাঠে মারা যাবেন।
উপজেলার সিম্বা গ্রামের কৃষক আনোয়ার হোসেন জানান, তিনি এবার প্রায় ১০ বিঘা জমিতে ইরি-বোরো ধানের আবাদ করেছেন। যদিও এবার ইরি-বোরো ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে কিন্তু বর্তমান ধানের বাজার অনুসারে কৃষকরা ধানের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার কারণে উচ্চ হারে লোকসান গুনতে হবে। ব্যাপক হারে ক্ষতিগ্রস্ত হবে যে সব কৃষক জমি বর্গা নিয়ে এবার ইরি-বোরো ধান চাষ করেছেন। সরকারে কাছে আমাদের আকুল আবেদন যেন সরাসরি কৃষকদের কাছ থেকে ধান কেনাসহ অচিরেই ধানের মূল্য বৃদ্ধি করা হয়।
রাণীনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এস.এম. গোলাম সারওয়ার জানান, চলতি ইরি-বোরো মৌসুমে ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে। তবে সম্প্রতি হয়ে যাওয়া শিলা বৃষ্টি আর ঝড়ের কারণে বেশি পরিমাণ দেয়া ইউরিয়া সারের কারণে বিচ্ছিন্ন ভাবে কিছু কিছু জমির ধান পড়ে গেছে। আর পড়ে যাওয়া এই সব জমির ধান প্রথম দিকে ব্লাষ্ট রোগে আক্রান্ত হলেও যথাসময়ে ওষুধ প্রয়োগে ফলনে তেমন কোন ক্ষতির প্রভাব পড়েনি। ধানের ফলন অধিক হওয়ায় কৃষকরা সামান্য এই ক্ষতি সহজেই পূরণ করতে পারবেন। সুষম সার, আধুনিক পদ্ধতিতে লাইন করে ধান লাগানো, নিবির পরিচর্যা ও যথা সময়ে রাসায়নিক সার, কীটনাশক প্রয়োগের জন্য কৃষকদের প্রতিদিনই সময় উপযোগী পরামর্শ দিয়েছি।
