অপরাধীদের অভয়ারণ্য ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়কের ৫ কি.মি.

আপডেট : ১৬ এপ্রিল ২০১৬, ১৬:৪৪
অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়কের ৫ কিলোমিটার এলাকা। গত দুই বছরে ৭ খুনের ঘটনা, বেলার নির্বাহী পরিচালকের স্বামী এবি সিদ্দিক অপহরণ, বোমা ফাটিয়ে চলন্ত বাস থামিয়ে মোবাইল ব্যবসায়ীকে গুলি করে টাকার ব্যাগ ছিনতাই ছাড়াও এই সড়কের ৫ কিলোমিটার এলাকায় ঘটেছে বেশ কিছু মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনা। বেশ কিছু আলোচিত ঘটনার কারণে লিংক রোড এখন আতঙ্কের সড়কে পরিণত হয়েছে।
 
সর্বশেষ এই সন্ত্রাসের অভয়ারণ্যে মিলেছে রাজধানী ঢাকার দৃক গ্যালারির কর্মকর্তা ইরফানুল ইসলাম ইরফানের লাশ। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ধারণা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডটিকে ইরফানুলের লাশ ডাম্পিংয়ের উপযুক্ত স্থান হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছিল। যেখানে এর আগেও এ ধরনের একাধিক ঘটনা ঘটেছিল। লাশটি পাওয়া যায় লিংক রোডের পূর্ব পাশের নির্জন স্থানে। যে লেনে নারায়ণগঞ্জমুখী যানবাহন চলাচল করে। সড়ক থেকে অল্প কয়েক গজ দূরে পাওয়া যায় লাশটি। যেখানে একটি কাঁচা রাস্তা ও পাশে বিল রয়েছে। গাড়িতে করে ইরফানের লাশ আনার সময় রাস্তার পাশে পার্কিং করে দ্রুত ফেলে পালিয়ে যায় ঘাতকেরা। দিনের বেলা লিংক রোডে চেকপোস্ট না থাকায় সুযোগটি নেয় ঘাতকরা।
 
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ যাতায়াতের অন্যতম রুট হলো ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-পাগলা রুট থাকলেও উড়াল সেতুর (যাত্রাবাড়ি ফ্লাইওভার) কারণে লিংক রোড দিয়েই মূলত লোকজন বেশী চলাচল করে। প্রাইভেট কার ছাড়াও গণপরিবহনে এ রুটে যাত্রী সংখ্যাও বেশী। নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়া থেকে সাইনবোর্ড পর্যন্ত ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের দৈর্ঘ্য ৮ দশমিক ৪ কিলোমিটার। এর মধ্যে ফতুল্লার শিবু মার্কেট থেকে সাইনবোর্ডের দূরত্ব প্রায় ৫ কিলোমিটার। এই সড়কেই সবচেয়ে বেশি অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে।
 
লিংক রোডের এই অংশের বেশ কিছু স্থান প্রায় সময়েই থাকে অন্ধকারচ্ছন্ন। আর ওই নীরব ওই স্থানগুলোকেই মূলত টার্গেট করে ছিনতাই, অপহরণের কাজটি করে থাকে দুর্বৃত্তরা। এর মধ্যে ফতুল্লার শিবু মার্কেট থেকে জালকুড়ি ও জালকুড়ি থেকে ভূইগড় ও ভূইগড় থেকে সাইনবোর্ড পর্যন্ত লিংক রোডের স্থানগুলো অনেকটাই অরক্ষিত। এর মধ্যে শিবু মার্কেট, স্টেডিয়াম, জালকুড়ি ও ভূইগড়ে বাসস্ট্যান্ড ছাড়া বাকি সড়কগুলো দিনের বেলাতেও অনেকাটাই নিরব নিস্তব্ধ থাকে। আর লিংক রোডের এসব স্থানগুলোতে কোন যানজট না থাকা ও যান চলাচলের জন্য পৃথক লেন থাকায় যানগুলোও বেশ দ্রুত গতিতে চলাচল করে। ফলে কোন যান রাস্তার পাশে থেমে থাকলেও সেটা নিয়ে অন্য যানবাহনগুলোর তেমন কোন খেয়াল থাকে না।
 
এদিকে লিংক রোডের এক প্রান্ত চাষাঢ়া ও অন্যপ্রাপ্ত সাইনবোর্ড হলেও এর মধ্যে রয়েছে অসংখ্য শাখা সড়ক। এসব সড়ক দিয়ে ফতুল্লা, পাগলা হয়ে যাত্রাবাড়ি এবং সিদ্ধিরগঞ্জের গোদনাইল, ঢাকেশ্বরী, আদমজী এলাকা দিয়েও বের হওয়া যায়। ফলে চাষাঢ়া ও লিংক রোডে স্থাপিত সিসি ক্যামেরা দিয়ে অপরাধী শনাক্ত করাও সম্ভব হয় না আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে।
 
জানা গেছে, ২০১৪ সালের ১৬ এপ্রিল পরিবেশ আইনবিদ ও বেলার নির্বাহী পরিচালক রিজওয়ানা হাসানের স্বামী গার্মেন্ট কর্মকর্তা এবি সিদ্দিক ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড থেকে অপহরণের পর দেশজুড়ে ঘটনাটি আলোচিত হয়। ৩৬ ঘণ্টা পর তাকে ঢাকায় দুর্বৃত্তরা ছেড়ে দেয়। ওই বছরের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার খান সাহেব ওসমান আলী জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের সামনে থেকে নাসিকের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও আইনজীবী চন্দন কুমার সরকারসহ ৭ জন অপহৃত হন। ৩০ এপ্রিল বিকেলে শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ৬ জন এবং ১ মে সকালে একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। ৭ খুনের ঘটনাটি শুধু দেশজুড়েই নয় বিশ্বব্যাপী আলোচিত হয়। এই দু’টি ঘটনার পর নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। সড়কটির বিভিন্ন পয়েন্টে স্থাপন করা হয় পুলিশের সিসি ক্যামেরা ও দুটি চেকপোস্ট। এ ছাড়া পুলিশের টহলও নিয়মিত করা হয়। তবে এত কিছুর পরেও বন্ধ হয়নি অপরাধীদের অপতৎপরতা। ২০১৫ সালের ২১ জানুয়ারী ফতুল্লার ভূইগড় এলাকায় দেলোয়ার হোসেন (২৮) নামে একজন ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা চালককে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।
 
১৭ এপ্রিল জালকুড়ি এলাকায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়কের পার্শ্ববর্তী একটি বিল থেকে অজ্ঞাত পরিচয় যুবকের (২৫) লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ৫ মে সাইনবোর্ড এলাকায় ডিবি পরিচয়ে ফজর আলী নামে এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ২২ লাখ টাকা লুটে নেয়া হয়। ১৩ মে ডিবি পরিচয়ে উৎসব পরিবহনের একটি বাস থামিয়ে ১৮ লাখ টাকা লুটে নেয়া হয়। ১১ জুন ভূইগড় থেকে দুই ভুয়া ডিবি পুলিশকে মাইক্রোবাসসহ আটক করে ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশ। ৩ আগস্ট রাতে ফতুল্লার মাহমুদপুরে যাত্রীবাহী একটি বাস থামিয়ে মোবাইল ব্যবসায়ী নুরুল ইসলামকে গুলি করে হত্যা করে টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। ২২ আগস্ট ভূইগড়ে আবদুল্লাহ আল মামুন নামে একজন বীমা কর্মীকে মারধর করে হত্যা করা হয়। ৮ নভেম্বর রূপায়ন হাউসিং এর সামনে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারায় রাজু মিয়া (৪৫) নামের এক ভ্যানগাড়ি চালক। সর্বশেষ চলতি বছরের ২ এপ্রিল সিদ্ধিরগঞ্জের জালকুড়ি এলাকায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের পাশে ফিরোজ ফিলিং স্টেশন সংলগ্ন একটি বিলের পাশের কাঁচা রাস্তা থেকে দৃক গ্যালারির প্রশাসনিক কর্মকর্তা ইরফানুল ইসলামের লাশটি উদ্ধার করা হয়।
 
ধানমন্ডির দৃক গ্যালারীর জেনারেল ম্যানেজার এস এম রেজাউর রহমান জানান, শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টায় অফিসের একটি প্রাইভেটকারে ধানমন্ডিতে ৮ নাম্বার সড়কে ডাচ বাংলা ব্যাংকে যায়। সেখান থেকে ৩ লাখ ৮ হাজার টাকা উত্তোলন করে। ব্যাংকে যে প্রাইভেটকারে করে গিয়েছে সেটা ব্যাংক থেকে একটু দূরে ছিল। অনেক সময় ধরে তিনি না আসায় গাড়ি চালক নাসির মিয়া ব্যাংকের ভেতরে গিয়ে না পেয়ে অনেক খোঁজাখুজি করে। পরে বিষয়টি আমাদের অবহিত করে। এরপর এ ব্যাপারে কলাবাগান থানায় আমি বাদি হয়ে একটি জিডি দায়ের করি। 
 
সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওসি সরাফতউল্লাহ জানান, ইরফানের লাশ নারায়ণগঞ্জ থেকে উদ্ধার করা হলেও মামলা হচ্ছে কলাবাগান থানায়। কারণ নিখোঁজের পর ওই থানাতে একটি জিডি হয়েছিল। সেখানেই মামলা হবে। কলাবাগান থানা পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করবে। সকল প্রয়োজনে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশ সহযোগিতা করবে।
 
এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) মোখলেছুর রহমান বলেন, লিংক রোডে অপরাধ প্রবণতা কমাতে শিবুমার্কেট, স্টেডিয়ামের সামনে, জালকুড়ি, ভূইগড় ও সাইনবোর্ডে সিসি টিভি স্থাপন করা হয়েছে। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের দুইপাশে অসংখ্য সংযোগ সড়ক রয়েছে যেখান দিয়ে দুর্বৃত্তরা অপকর্ম করে সহজেই পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। পুলিশের ৩টি ভ্রাম্যমান টিম ও দু’টি চেকপোস্ট ওই সড়কে কাজ করলেও লিংক রোড থেকে আশপাশের গ্রামের সঙ্গে সংযুক্ত সড়কগুলো থেকে যায় অরক্ষিত।