রাজস্ব খাত ও সফটওয়ারের ব্যবহার

আপডেট : ১৭ মার্চ ২০১৯, ২১:১১

ইকবাল আহমদ ফখরুল হাসান

 

১৯৭১ এ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ জন্মের পর থেকে ২০১০/১১ সাল পর্যন্ত দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের ধীরগতি পরিলক্ষিত হয়, যার প্রধান কারণ ছিল সরকারের কম রাজস্ব আয়। সরকার ইনকাম ট্যাক্স, ভ্যাট এবং কাস্টমস ডিউটি এই তিনটি প্রধান খাত থেকে রাজস্ব আয় করে, যেখানে দুর্বল রাজস্ব ব্যবস্থাপনা দেশের উন্নয়নের বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বর্তমান সরকারের কর্ণধার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুদক্ষ নেতৃত্বে দেশের রাজস্বআয়ের পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন অব্যাহত রেখে চলেছেন। দেশীয় সফটওয়্যার দিয়ে রাজস্ব ব্যবস্থাপনার আদেশ দিয়ে ডিজিটাল বাংলাদেশের উন্নয়নের উদ্যোগে নতুন ধারা যুক্ত করে দিয়েছেন। নিচের লেখাগুলো বিষয়টির খুঁটিনাটি বিষয় তুলে ধরার  চেষ্টা করছি।

ভ্যাট কি এবং কেন ? :দেশ পরিচালনা বা উন্নয়নের জন্য বাজেট প্রয়োজন হয় এবং বাজেট করার জন্য প্রয়োজন রাজস্ব।। সরকারের রাজস্ব খাত খুবই কম, তার মধ্যে ইনকামট্যাক্স এর পাশাপাশি ঠঅঞ অথবা মূল্য সংযোজন কর মোট বাজেটের বড় অংশ। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ভ্যাট অন্যান্য নামে পরিচিত।  যেমন গুডস অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্যাক্স ইন্ডিয়াতে প্রচলিত। খুব সহজভাবে বলা যায়, আপনার টাকা খরচ করার ট্যাক্সকে ভ্যাট বলা যায়। মূলত পণ্য বা সেবার উত্পাদনথেকে বিক্রয় পর্যন্ত সকল স্তরকে করের আওতার মধ্যে রাখা। ভ্যাটের আওতাভুক্তির ফলে সরকার বাজারের স্থিতি বজায় রাখতে সক্ষম হয়। আমাদেরদেশে বাজারের অসামঞ্জস্যতা ও মূল্য স্থিতি নিয়ে সবসময়ই একটা অভিযোগের মধ্যে থাকি যেটার প্রধান কারণ ভ্যাট নিবন্ধন না করা।

ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, জনগণ ও সরকারের ভূমিকা:ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কেনার সময় ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান থেকে পণ্য, কাঁচামাল বা সেবা ক্রয় করার সময় ভ্যাট দিতে হবে এবং ক্রেতা থেকে নির্ধারিতহারে গ্রহণ করবে। জনগণ ও ক্রেতা ভ্যাটের গুরুত্ব বুঝতে হবে এবং দেশের উন্নয়নে রাজস্ব ভূমিকা অব্যাহত রাখবে। সরকার ভ্যাট প্রদানে জনগণকে উত্সাহ প্রদান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড ও বাজারদরের সামঞ্জস্যতা বজায় এবং সর্বোপরি দেশের উন্নয়ন অব্যাহত রাখবে।

বর্তমান অবস্থা :জনগণের ভ্যাট প্রদানে অনীহা আমাদের দেশে সবসময়ই পরিলক্ষিত যেটার প্রধান কারণ ছিল দেশের ধারাবাহিক উন্নয়ন, যার ফলে গত কয়েক বছর আগেও আমাদের রাজস্ব আয়ের পরিমান খুবই কম ছিল এবং যা বাজেটের খুব অংশ হিসেবে বিবেচ্য ছিল। যেটা এখন পুরোপুরি না হলেও অনেক খানি বিবেচ্য হচ্ছে। ধারণার জন্য অঙ্কটা ধরা যায়, চলতি বাজেট ৪৬৫০০০ কোটি, রাজস্ব ৩৫০০০০ কোটি যার মধ্যে ৪০ ভাগ ভ্যাট থেকে আসছে। জনগণও ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান দেশের উন্নয়ন নিয়ে একটু চিন্তা বাড়লেই আমাদেরমতো মধ্যম আয়ের উন্নয়নশীল দেশের পুরো বাজেট দেশীয় রাজস্ব দিয়ে করা সম্ভব বলে আমার মনে হয়।

ভ্যাট সফটওয়্যার অনুমোদন, নিয়মনীতি, ব্যবহারকারীর সংশয়, আগ্রহ : রাজস্ব লক্ষ্য পূরণে সরকার ও বাংলাদেশ রাজস্ব বোর্ড গত কয়েক বছর ধরে সেন্ট্রাল ও ইন্টেগ্রেটেড ভ্যাট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সিস্টেম বসানোর উদ্যোগনেয় এবং সেই উদ্যোগের ফল হিসেবে সরকার ভ্যাট কালেকশন এবং ভ্যাট সংক্রান্ত হিসাব ব্যবস্থাপনার জন্য বাংলাদেশে  তৈরি সফটওয়্যারকে এনবিআর তালিকাভুক্তি ও বাধ্যতামূলক করে। এই ঘোষণার পর প্রতিষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন রকম সংশয় ও ভীতি কাজ করতে থাকে।

প্রশ্ন জাগছে, বর্তমানে কোনো প্রতিষ্ঠান একটি সফওয়্যার ব্যবহার করলে কেনো আবার টাকা খরচ করতে হবে। মূল কারণ, আপনি যেই সফটওয়্যার ব্যবহার করছেন বা বাংলাদেশ আইন অনুযায়ী তৈরি হয়নি, হয়তো অন্য দেশের ভ্যাট/ট্যাক্স আইন মেনে বানানো হয়েছে। যদি তাই হয়, তাহলে অবশ্যই আপনাকে আপনার প্রতিষ্ঠানের সফটওয়্যারটি পরিবর্তন করতে হবে এনবিআর তালিকার যেকোনো একটি সফটওয়্যার দিয়ে। তারপরও কিছু প্রতিষ্ঠান তাদের পূর্ণাঙ্গ ইআরপি সিস্টেম ব্যবহার বন্ধ নাও করতে পারেন সময় ও ব্যয় বাঁচানোর জন্য সেই ক্ষেত্রে আপনার বর্তমান  ইআরপি সিস্টেম থেকে এপিআই তৈরি করতে ভ্যাট ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যারের সঙ্গে ইন্টেগ্রেট করে নিতে হবে। এই ইন্টিগ্রেশনে অবশ্যই ট্রান্সেকশনের সঠিক দিন তারিখ ও সময় আসতে হবে।

যারা এখনো সফটওয়্যার ব্যবহার করছেন না, তারা অবশ্যই তালিকাভুক্ত সফটওয়্যারগুলো থেকে আপনার প্রতিষ্ঠানের উপযুক্ত ভ্যাট সিস্টেমসহ পুরো ইআরপি চালানোর ব্যবস্থা করুন। সরকারের রাজস্ব গণনা বা কমপ্লায়েন্ট হওয়া ছাড়াও এটা আপনাকে আপনার প্রতিষ্ঠানের সার্বিক উন্নয়নে ব্যাপক ভূমিকায় থাকবে।

এনবিআর তালিকাভুক্ত সফটওয়্যার গুলোতে এনবিআর নির্ধারিত যেই সব নিয়ম-কানুন মেনে চলা হয়েছে।

ভ্যাট ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার ও ইআরপি সংশয়:

এনবিআর নিবন্ধিত সফটওয়্যার নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের নির্মিত সফটওয়্যার এ ভ্যাট এক্ট ১৯৯১ নিয়ম অনুযায়ি বাস্তবায়ন করার  নির্দেশদেয় এবং প্রতিষ্ঠানগুলো সেই অনুযায়ী করে। এই সফটওয়্যারটিতে মূলত প্রোডাক্ট ম্যানেজমেন্ট, প্রাইস ডিক্লারেশন, সেল, পারচেজ, ইনভেন্টরি ও একাউন্টস  সব ধরণের কোম্পানির জন্য। এর বাইরে প্রোডাকশন ম্যানেজমেন্ট : ম্যানুফ্যাকচারিং/ প্রোডাকশন কোম্পানির জন্য, সার্ভিস ম্যানেজমেন্ট ওবিলিং : সার্ভিস ওরিয়েন্টেড কোম্পানির জন্য থাকবে।

একটা ইআরপি সিস্টেমে মডিউল হিসেবে ভ্যাট ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যারের এর সমান, কম ও বেশি থাকতে পারে প্রতিষ্ঠানের চাহিদা মোতাবেক। আপনিআপনার ভ্যাট ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার কেনার সময় আপনি ইআরপি চাহিদা পূরণ করে কিনা সেটা দেখে নিন। এতে করে আপনার অনেকগুলোসফটওয়্যার ব্যবহার ও তার খরচ বহন করার প্রয়োজন হবেনা।

আপনাদের মনে আরো একটা প্রশ্ন জাগতে পারে যে, ভ্যাট ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার থাকার পর কি আমাকে একাউন্টিং ও ইআরপি এর জন্য আরেকটাসফটওয়্যার নিতে হবে। উত্তর : না, আপনার ভবিষ্যত একাউন্টিং ম্যানেজমেন্ট বা ইআরপি সফটওয়্যারই একটাই হওয়া উচিত।

 

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ডিভাইন আইটি লিমিটেড।