দেশের হাওরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় বোরো কাটা শুরু হলেও চলতি মৌসুমে এখনো বোরোর সংগ্রহ মূল্য ও পরিমাণ নির্ধারণ করেনি সরকার। অথচ কৃষকের কষ্টার্জিত ফসলের ন্যায্যমূল্য পাওয়াটা নির্ভর করে সরকারের বোরো সংগ্রহ অভিযানের উপর।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, সরকার আগেভাগে সংগ্রহ মূল্য ঘোষণা করলে বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিতে পারে না। তারা জানান, উত্পাদনের তুলনায় অনেক কম পরিমাণে চাল সংগ্রহ করে সরকার। এছাড়া চালের বদলে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনা হলে ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হতো। পাশের দেশ ভারতেও কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি ধান কেনা হয় বলে তারা জানান।
গত বোরো মৌসুমে সরকার অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে দেড় লাখ টন ধান ও ১০ লাখ টন চাল সংগ্রহ করে। এরমধ্যে প্রতি কেজি ধান ২০ টাকা এবং চাল ৩২ টাকা দরে সংগ্রহ করা হয়। ১ মে থেকে সংগ্রহ অভিযান শুরু হয়। কিন্তু এবার এখন পর্যন্ত বোরো সংগ্রহ মূল্য ও পরিমাণ ঘোষণা করা হয়নি। ঘোষণা করা হয়নি সংগ্রহের তারিখ। এরআগে গত ৪ এপ্রিল খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির সভায় শুধু গমের সংগ্রহ মূল্য ও পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়।
খাদ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, সরকারের গুদামে প্রচুর পরিমাণে খাদ্যশস্য মজুদ রয়েছে। আর এ মজুদ চাল নিয়ে অনেকটা বিপাকে পড়েছে খাদ্য বিভাগ। তাই কিছুটা ধীরে চলো নীতি অবলম্বন করেছে তারা। সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে সরকারের গুদামে ১১ লাখ টন খাদ্যশস্য মজুদ রয়েছে। সরকার প্রতি বছর ১০ থেকে ১২ লাখ টন বোরো সংগ্রহ করে থাকে। এ অবস্থায় আগামী দেড়/দুই মাসের মধ্যে পর্যাপ্ত পরিমাণ চাল গুদাম থেকে বের না হলে ধান-চাল সংগ্রহে জটিলতা দেখা দেবে।
খাদ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, সরকারের গুদামে মজুদ চাল ও গমের সর্বশেষ অবস্থা বিবেচনা করে ওএমএসের চাল-আটার দাম দুই দফা কমানো হয়েছে। যাতে ওএমএস-এর মাধ্যমে পর্যাপ্ত পরিমাণে চাল-আটা বিক্রি হয় এবং গুদামের একটি বড় অংশ খালি হয়। বর্তমানে ওএমএস-এর চাল ১৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হচ্ছে। তারপরও যথেষ্ট সাড়া নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খাদ্য বিভাগের এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, সাধারণ মানুষ এখন মোটা চাল খেতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। তারা চিকন চালের দিকে ঝুঁকেছে। ফলে ওএমএস-এর চালের চাহিদা কম। তবে এ বক্তব্য মানতে নারাজ সংশ্লিষ্টরা। কারণ, সরকার ওএমএস চালু করেছে দরিদ্র মানুষের জন্য। তারা মোটা চালেই অভ্যস্ত। কিন্তু ওএমএস-এর চালের মান ভালো নয়। সে কারণেই এর চাহিদা কম বলে তারা মনে করেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, মিল মালিকদের কাছ থেকে চাল সংগ্রহ করার সময় খুব ভালোভাবে মনিটরিং করা উচিত ছিল। তারা বিদেশ থেকে অল্প দামে নিম্নমানের চাল-গম আমদানি করে সরকারের কাছে বিক্রি করেছে কি না সেটি দেখা উচিত ছিল? তা না হলে কেন ১৫ টাকা কেজিতেও এএমএস-এর চাল ক্রেতারা কিনবে না ? অথচ মিল মালিকদের কাছ থেকে ৩২ টাকা কেজিতে চাল সংগ্রহ করেছে সরকার।
এদিকে বোরোর আশানুরূপ দাম না পাওয়ায় কৃষক কম জমিতে এবার বোরোর আবাদ করেছে। কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৪৮ লাখ হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও চাষ হয়েছে ৪৬ লাখ ৬০ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে। আর চাল উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ কোটি ৯০ লাখ টন। ধানের ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জের চান্দাইকোনা ইউনিয়নের কোদলাদিগর গ্রামের কৃষক নূরুল ইসলাম ও গদাইপুর গ্রামের আবু বক্কার জানান, প্রতি বছরই বিভিন্ন ধরনের কৃষি উপকরণের দাম বাড়ছে। কিন্তু বাড়ছে না ফসলের দাম। তারা বলেন, ফসলের ন্যায্যমূল্য না পেলে কৃষকের মন ভেঙ্গে যায়।
সরকারের হিসেবে, গত মৌসুমে প্রতি কেজি বোরো ধান উত্পাদনে ব্যয় হয়েছিল ২০ টাকা। আর প্রতি কেজি চাল উত্পাদনে খরচ হয় ২৭ টাকা। এবার চলতি মৌসুমে হিসেব করে বোরো সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
এ প্রসঙ্গে খাদ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক বদরুল হাসান গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, আগামী ২৪ এপ্রিল খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির সভা রয়েছে। সভায় বোরো সংগ্রহ মূল্য ও পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, উত্পাদন খরচসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করেই বোরো ধান, চালের সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করা হয়ে থাকে।
