খাদ্যে ভেজাল লইয়া বিগত কয়েক বত্সর ধরিয়া ব্যাপক আলোচনা হইয়াছে। প্রকাশিত হইয়াছে অসংখ্য প্রতিবেদন। ভেজালবিরোধী অভিযানও পরিচালিত হইতেছে কিছুদিন পর পর। খাবারের মান নির্ণয় করিতে রেস্তোরাঁগুলির জন্য গ্রেডিংয়ের ব্যবস্থা করা হইয়াছে। কিন্তু সকলকিছুর পরও ভেজাল দেওয়ার বিষয়টি যেন নির্ভেজালই রহিয়াছে গিয়াছে। দ্বিজেন্দ্রলাল রায় সেই কোনকালে বলিয়া গিয়াছেন, ‘কত কিছু খাই ভস্ম আর ছাই’—তাহা যেন আক্ষরিক অর্থে আমাদের প্রস্তুতকৃত খাদ্যব্যবস্থার উপর চাপিয়া বসিয়াছে। অবস্থা এমন দাঁড়াইয়াছে যে, সকলের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করাটাই এখন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হইয়া গিয়াছে। প্রতিদিন রাজধানীর ৬০ লক্ষ মানুষকে মধ্যাহ্নভোজসহ দিনে রাতে হোটেল-রেস্তোরাঁর খাবারের ওপর নির্ভর করিতে হয়। কিন্তু মানুষ জানিয়া কিংবা না-জানিয়া একরকম বাধ্য হইয়াই নিম্নমানের খাবার খাইতেছে।
শুধু হোটেল-রেস্তোরাঁর নিম্নমানের খাবার নহে, নিত্যপ্রয়োজনীয় সিংহভাগ পণ্যই ভেজাল বা বিষক্রিয়ার বাহিরে নহে। বিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন, খাদ্যে ভেজাল, নিম্নমানের খাবার, অনিরাপদ পানিসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যে ভেজালের কারণে মানবস্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়িয়াছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের একজন শিশু ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ বলিয়াছেন যে, সম্প্রতি শিশুদের মধ্যে ক্যান্সারের মাত্রা অনেক বৃদ্ধি পাইয়াছে মূলত খাদ্যে ভেজালের কারণে। সম্প্রতি বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ রাজধানীর খাবারের মান পরীক্ষার জন্য একটি সমীক্ষা চালাইয়াছে। প্রাথমিকভাবে রাজধানীর দুইশত হোটেল-রেস্তোরাঁ বাছিয়া লওয়া হয় পরীক্ষার জন্য। দুঃখজনকভাবে মাত্র ৫৭টির খাবার স্বাস্থ্যসম্মত বলিয়া বিবেচিত হইয়াছে। ইহার বাহিরে অন্য সকল রেস্তোরাঁর খাবার ফুড গ্রেডের অনেক নিচে। সম্প্রতি হাইকোর্ট এক আদেশে বলিয়াছেন যে, খাদ্যে ভেজাল মেশানো একটি বড় দুর্নীতি। আমরা বিগত কয়েক বত্সর ধরিয়া ভেজালবিরোধী কিছু অভিযান পরিচালিত হইতে দেখিয়াছি। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ কিছু কিছু পদক্ষেপ লইতেছেন ভেজালের বিরুদ্ধে। কিন্তু ভেজাল রোধ করিতে এইসকল অভিযান বা পদক্ষেপ অনেকটা এঁদো ডোবা হইতে এক ঘড়া পানি তুলিয়া ডোবার নোংরা অপসারণের মতো।
প্রকৃতপক্ষে, কেবল খাদ্যে নহে, ভেজাল রহিয়াছে সব জায়গাতেই। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় যে, ইহা যেন দূর করা দুঃসাধ্য, অসম্ভব প্রায়। আমাদের দেশটি ছোট, কিন্তু জনসংখ্যায় ভরপুর। ফলে এইখানে সমস্যার অন্ত নাই। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিশৃঙ্খলা। কয়লা ধুইলেও যেমন ময়লা যায় না, তেমনি সমাজের খাঁজে খাঁজে ঢুকিয়া পড়া ভেজাল, বিশৃঙ্খলা, দুর্নীতি দূর করাও যেন এক বড় চ্যালেঞ্জ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। আরেকটি সমস্যা হইল, আমাদের সমাজে ভূত তাড়াইবার সর্ষের মধ্যেই ভূত বসিয়া থাকে। যাহারা সমাজের বিশৃৃঙ্খলা, দুর্নীতি, ভেজাল দূর করিবে, তাহারাই যদি ভেজালমুক্ত না হন, তাহাদের ভাবমূর্তি যদি উজ্জ্বল না থাকে, তবে তাহারা অসত্ ব্যক্তিদের কোনমুখে বলিবে—অসত্ কাজ করিও না? ‘আপনি আচারি ধর্ম অপরে শেখাও’—সুতরাং প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে জাঁকাইয়া বসা ভেজাল দূর করিতে হইবে সর্বাগ্রে। মনে রাখিতে হইবে, নিজে মিষ্টি খাওয়া না ছাড়িয়া অন্যকে মিষ্টি না খাইবার উপদেশ দেওয়া যায় না।
এইসকল নৈরাশ্যের পরও আমরা আশাবাদী যে, বাংলাদেশ একদিন নিশ্চয়ই ভেজালমুক্ত হইবে।
