বিভিন্ন সময় ছাত্র সংগঠনের সংঘাত-সংঘর্ষে প্রাণহানির ঘটনা পুরনো। ছাত্র হত্যা, প্রতিপক্ষের ওপর হামলা, রগকাটা, হাত-পা কেটে নেয়ার মত অসংখ্য ঘটনার সাক্ষী মতিহারের সুবজ চত্বর। কিন্তু সন্ত্রাসীদের হাতে শিক্ষক খুনের ঘটনাও ক্রমেই তা দীর্ঘ হচ্ছে। গত ১২ বছরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন প্রগতিশীল শিক্ষক নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন।
পুলিশ, বিশ্ববিদ্যালয় ও আদালত সূত্রে জানা যায়, ২০০৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর ভোরে প্রাতঃভ্রমণের সময় বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বিনোদপুরের নিজ বাসভবনের অদূরে ধারালো অস্ত্র দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয় বিশ্ববিদ্যালয় শাখা বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি ও অর্থনীতির প্রফেসর মোহাম্মদ ইউনুসকে। সিআইডি পুলিশ ৮ জেএমবি সদস্যসের বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট দাখিল করে। ২০১০ সালের ২৮ জানুয়ারি ছয়জনকে বেকসুর খালাস দিয়ে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয় রাজশাহীর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল। ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা উচ্চ আদালতে আপিল করলে মামলাটি বিচারিক আদালতে পুনঃবিচারের জন্য ফেরত পাঠায়। পরে ওই মামলার একজন পুরাতন সাক্ষীর সাক্ষ্যের ভিত্তিতে একই আদালত দুই জঙ্গির মৃত্যুদণ্ডের সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আদেশ দেয়। অভিযোগ আছে, এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে আটক জঙ্গিদের প্রদত্ত ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি মোতাবেক সিআইডি পুলিশ তদন্ত করেনি। ফলে অধিকাংশ আসামি খালাস পেয়ে যায়।
২০০৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ভূ-তত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এস তাহের আহমদকে হত্যা করা হয়। ৩ ফেব্রুয়ারি বাসার পেছনের সেফটিক ট্যাংক থেকে তার মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। একই বিভাগের শিক্ষক মিয়া মহিউদ্দিনসহ চারজনকে মৃত্যুদণ্ড দেয় রাজশাহী দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল। দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে হাইকোর্ট। তারা হলেন ড. তাহেরের সহকর্মী মিয়া মহিউদ্দিন এবং ড. তাহেরের বাসার কেয়ারটেকার জাহাঙ্গীর আলম। এ ঘটনায় তত্কালীন সরকারের সহায়তায় ছাত্রশিবিরের সভাপতি মাহবুবুল আলম সালেহীকে আইনের মারপ্যাঁচে ফেলে রক্ষা করা হয় বলে ড. তাহেরের পরিবার ও শিক্ষার্থীরা মনে করেন।
২০১৪ সালের ১৫ নভেম্বর দুপুরে খুন হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক লালনভক্ত একেএম শফিউল ইসলাম লিলন। হত্যাকাণ্ডের পাঁচ ঘণ্টার মধ্যে জঙ্গি সংগঠন আনসার উল্লাহ বাংলা টিম-২ এই হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করে ফেসবুক পেইজে কমেন্টস দেয়। তবে পুলিশ তা নাকচ করে দেয়। এ ঘটনায় জামায়াত শিবির, বিএনপি ও যুবদলের নেতাকর্মীরা পুলিশ রিমান্ডে থাকাবস্থায় একই বছরের ২৩ নভেম্বর র্যাব সদস্যরা ঢাকা ও রাজশাহী থেকে স্থানীয় যুবদল নেতা আব্দুস সামাদ পিন্টুসহ ছয়জনকে আটক করে। পরে পিন্টুর স্ত্রী নাসরিন আক্তার রেশমাকে আটক করে গোয়েন্দা পুলিশ। দায় স্বীকার করে রেশমা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। এই মামলায় গত বছরের ১৭ ডিসেম্বর পুলিশ পিন্টু ও নাসরিনসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব শাখার সেকশন অফিসার নাসরিন আক্তার রেশমাকে নিয়ে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের জের ধরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে বলে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়।
সর্বশেষ গতকাল শনিবার নগরীতে নৃশংসভাবে খুন হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের প্রফেসর এএফএম রেজাউল করিম সিদ্দিক মুকুল।
শিক্ষক হত্যার প্রতিবাদে শনিবার ক্যাম্পাসে আয়োজিত সমাবেশে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক মো. শহীদুল্লাহ বলেন, এখানে একের পর এক শিক্ষক হত্যার ঘটনা ঘটছে। আমরা আর কোনো হত্যার ঘটনা দেখতে চাই না।’ ওই সমাবেশে শিক্ষক হত্যার সুষ্ঠু বিচার হয় না দাবি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন ।
