আওয়ামী লীগেও মনোনয়ন বাণিজ্য

আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০১৬, ০৯:৩১
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগেও চলছে মনোনয়ন বাণিজ্য। স্থানীয় সংসদ সদস্য, জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাসহ কেন্দ্রীয় ১৩ নেতা এই মনোনয়ন বাণিজ্যে জড়িত রয়েছেন বলে দলের হাইকমান্ডের কাছে অভিযোগ এসেছে। এর মধ্যে সম্পাদকমন্ডলীর ১১ সদস্যসহ দুই জন সিনিয়র নেতা রয়েছেন। এ কারণে সারাদেশের তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের কাছ থেকে সহস্রাধিক অভিযোগ ধানমন্ডিস্থ আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে জমা পড়লেও কোনো প্রতিকার হচ্ছে না। আর মনোনয়ন বাণিজ্যের কারণে রাজাকার পুত্র, গাছ চুরির আসামি, আওয়ামী লীগের ওপর অতীতে যারা আক্রমণ করেছে তারাই নৌকা প্রতীক পাচ্ছেন।
 
জানা গেছে, আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী মনোনয়ন বাণিজ্যে জড়িতদের চিহ্নিত করে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে সম্প্রতি দলের স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ডা. বদিউজ্জামান ভুঁইয়া ডাব্লিউকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ডা. বদিউজ্জামান ভুঁইয়া ডাব্লিউ ইত্তেফাককে জানান, অভিযোগ যা এসেছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।  
 
জানা গেছে, চলমান ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সারা দেশে তৃণমূলে আওয়ামী লীগের নমিনেশন বিক্রির ঘটনা এখন অনেকটা ওপেন সিক্রেট। ধানমন্ডিস্থ আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে আসা অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, স্থানীয় সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালীরা দলের স্থানীয় ইউনিয়ন কমিটিকে চাপ দিয়ে স্বাক্ষর নিয়ে উপজেলা ও জেলা কমিটিকে ম্যানেজ করে প্রার্থী চূড়ান্ত করছেন। দলের কেন্দ্রীয় এক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও এক সাংগঠনিক সম্পাদক ৩০ লাখ টাকা নিয়েও একজনের মনোনয়ন দিতে পারেননি।        
 
জানা গেছে, চতুর্থ ধাপ নমিনেশন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর কক্সবাজারের একটি উপজেলার নেতারা কেন্দ্রে অভিযোগ নিয়ে আসেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির বিরুদ্ধে। ইউনিয়ন ও উপজেলা আওয়ামী লীগ যৌথ সভা ও ভোটের মাধ্যমে একক প্রার্থী বাছাই করলেও জেলা সভাপতি সে তালিকা জমা নেননি। তিনি তার ইচ্ছামতো প্রার্থী তালিকা করে কেন্দ্রে পাঠান। হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলার ৪ নম্বর পাইকপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সরকারি সম্পদ লুটসহ একাধিক গাছ চুরির মামলার আসামি, বর্তমান চেয়ারম্যান ওয়াহেদ আলী মাস্টারকে আওয়ামী লীগের তৃণমূলের মনোনয়ন বোর্ড একক প্রার্থী হিসেবে নাম প্রস্তাব করেছে। মনোনয়ন বাণিজ্যের কারণে ত্যাগী ও যোগ্যদের বাদ দিয়ে তাকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে বলে ধানমন্ডিস্থ আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে দলীয় সভানেত্রী ও সাধারণ সম্পাদক বরাবর অভিযোগ করেছেন চুনারুঘাট উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মনোনয়ন প্রত্যাশী আলহাজ্ব শামসুজ্জামান (শামীম)। প্রসঙ্গত, শামসুজ্জামানের পিতা আবুল কালাম এই ইউপিতে চারবার নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন।  
 
জানা গেছে, মনোনয়ন বাণিজ্যের কারণে দেশের অধিকাংশ জায়গায় তৃণমূলের প্রস্তাবে যোগ্য প্রার্থীরা বাদ পড়ছেন। আওয়ামী লীগের এক প্রেসিডিয়াম সদস্যের বিরুদ্ধে ফরিদপুর চরভদ্রাসন, ভাঙ্গা ও সদরপুর উপজেলার ইউনিয়ন নির্বাচনে মনোনয়ন বাণিজ্য করে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য মো. মুজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সন। ১৯ এপ্রিল বিকালে ভাঙ্গা উপজেলার পুলিয়া এলাকায় নিজের বাসভবনে এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি এই অভিযোগ করেন। মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগ এনে বঞ্চিত চেয়ারম্যান প্রার্থীর বিক্ষুব্ধ সমর্থকরা চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে ভাঙচুর করেছে। মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগে খুলনা আওয়ামী লীগের একাংশের নেতারা প্রকাশ্যে মানববন্ধন করে মনোনয়ন বাণিজ্যের জন্য দলীয় নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার এক ইউনিয়নে মাদক ব্যবসায়ী ও ইয়াবা সেবক হিসেবে পরিচিত একজনকে অর্থের বিনিময়ে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। তৃণমূলের ভোটে তিনি মাত্র ৪ ভোট পেয়েছিলেন। কেন্দ্রীয় এক নেতাকে অর্থের বিনিময়ে তিনি মনোনয়নপ্রাপ্ত হন বলে অভিযোগ উঠেছে।
 
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মনোনয়ন প্রক্রিয়া চুলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমে হচ্ছে। প্রথমে এটা স্থানীয় ইউনিয়নের বর্ধিত সভায় ভোটাভুটির মাধ্যমে পাস হয়, এরপর উপজেলা এবং সর্বশেষ জেলা কমিটির বর্ধিত সভায় মনোনয়ন চূড়ান্ত হয়। ইদানীং মনোনয়ন না পেলে বঞ্চিতদের পক্ষ থেকে বলা হয় রাজাকারপুত্র মনোনয়ন পেয়েছে কিংবা অর্থের বিনিময়ে মনোনয়ন পেয়েছে। এসব কথাবার্তা বাস্তবে যতটা না সত্য তার চেয়ে বেশি অপপ্রচার। অবশ্য বিষয়টি তদন্ত করতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ বলেন, মনোনয়ন নিয়ে যে অভিযোগগুলো উঠেছে মাঠ পর্যায়ে আমরা খবর নিয়ে দেখেছি অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন।