রেজাউল করিম হত্যার বিচার হবে কি? প্রশ্ন স্ত্রীর

আপডেট : ২৫ এপ্রিল ২০১৬, ১৮:৫৮
 
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) নিহত শিক্ষক রেজাউল করিম সিদ্দিকীর স্ত্রী হোসনে আরা প্রশ্ন তুলেছেন, সহজ-সরল সিদ্দিকীর মতো সাধারণ লোককে হত্যার বিচার হবে কি?
 
সোমবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাবির শহীদুল্লাহ কলা ভবনে এক শোক সভায় তিনি এ প্রশ্ন তোলেন। পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী ইংরেজী বিভাগের উদ্যোগে এ সভার আয়োজন করা হয়।
 
হোসনে আরা বলেন, ‘বিভিন্ন গণমাধ্যমে শুধু গানের স্কুলের কথা বলা হয়েছে। তিনি তো সেখানে শুধু গান-বাজনা করতেন না, তিনি সে স্কুলে শিক্ষার্থীদের ক্রিকেট খেলার সরঞ্জামও কিনে দিতেন। এখন এটা যদি অপরাধ হয় তাহলে সব ক্রিকেট প্রেমীদের হত্যার করা উচিত। আর তিনি স্কুল, মাদ্রাসা ও সমজিদে দান করতেন। গরীব, দুঃখীদের পাশে দাঁড়াতেন।’ দেশের প্রধানমন্ত্রী উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘সত্যিই যদি আপনি শক্তিশালী হয়ে থাকেন, তাহলে আমার স্বামীর বিচার করে দেখান। বাংলাদেশ কতটুকু এগিয়েছে তার প্রমাণ দেন।’
 
অধ্যাপক রেজাউল সাংস্কৃতিমনা ছিলেন উল্লেখ করে শোকসভায় মেয়ে রিজওয়ানা হাসিন শতভি বলেন, দাড়িওয়ালা মানেই বিএনপি আর মুক্তমনা মানেই আওয়ামীলীগ কেনো? কেনো একজন দাড়িওয়ালা কি বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে বিশ্বাস করতে পারেন না। কেউ কবিতা লিখলেই, গান-বাজনা করলেই আর সেতারা বাজালেই একজন নাস্তিক— এই মিথ মানুষের সৃষ্টি। এটা ভূল, এ ভূল আমাদের ভাঙতে হবে।
 
আব্বু ব্লগার ছিলেন না উল্লেখ করে রিজওয়ানা বলেন, আমার আব্বু ফেসবুক ভালোমতো বোঝেন না। তিনি ব্লগার ছিলেন— এটা সম্পূর্ন মিথ্যা। তিনি সৃষ্টিকর্তাকে পূর্ণ বিশ্বাস করতেন, কিন্তু গোড়ামী পছন্দ করতেন না। সবসময় ন্যায়ের কথা বলতেন। তিনি গ্রামীন জীবন খুব পছন্দ করতেন এবং মানুষের সাথে মিশতেন। তিনি গ্রামে একটি স্কুল খুলেছিলেন। বিভিন্ন সহযোগীতার পাশাপাশি সময় পেলে বাচ্চাদের সাথে গানও করতেন। নিজের পছন্দে কেনা টাইলস মসজিদে বসিয়েছিলেন বাছাই করা মিস্ত্রি দিয়ে। বাসায় কিছু নতুন ঘর তৈরি হচ্ছে। তিনি শ্রমিকদের সাথে এমনভাবে কাজ করতেন যে, কে শ্রমিক আর কে বাড়ির মালিক তা বোঝা যেত না। নিষেধ করলে তিনি বলতেন, ‘আরে বাপু, একটু বসে থাকার চেয়ে কাজ করা ভালো।’ শরীরের দিক থেকে তার বয়স হয়েছিল ৬০ কিন্তু মনটা ৬/৭ বছরই ছিল। খুবই বাচ্চা স্বভাবের ছিল। আমার সেই ছোট্ট বাচ্চাটা চলে গেলো বলে শোক সভায় আহাজারি করছিলেন রিজওয়ানা শতভি।
শোকসভায় নিহত রেজাউল করিমের স্ত্রী ও মেয়ে ছাড়াও বক্তব্য দেন, রাবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মিজানউদ্দিন, উপউপাচার্য অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান, নিহত শিক্ষকের ছেলে রিয়াসাদ ইমতিয়াজ সৌরভ প্রমুখ। এছাড়াও ইংরেজী বিভাগের সকল শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
 
বিচারের দাবিতে আন্দোলন অব্যাহত
রাবি ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক এএফএম রেজাউল করিম সিদ্দিকীকে হত্যার প্রতিবাদে ও বিচার দাবিতে তৃতীয় দিন গতকাল সোমবারও আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ, শিক্ষক সমিতি ও অন্যান্য সংগঠনসমূহ। এদিন সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি ও ইংরেজি বিভাগ সিনেট ভবনের সামনে ঘন্টাব্যাপী মানবন্ধন করে। মানববন্ধন শেষে রাবি উপাচার্যের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী বরাবর একটি স্মারক লিপি প্রদান করে শিক্ষক সমিতি। এর আগে ইংরেজি বিভাগ ক্যাম্পাসে শোক র্যালি করে।
শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শাহ্ আজম শান্তনুর সঞ্চালনায় মানববন্ধনে বক্তব্য দেন, ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক চিত্তরঞ্জন মিশ্র, সহকারী অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী, আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. হাসিবুল আলম প্রধান, ভূগোল ও পরিবেশ বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক রকীব আহমেদ, কম্পিউটার সায়েন্স এ্ল ইঞ্জিনিয়ার বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কাজী জাহিদুর রহমান, রাবি অফিসার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাসিউল আলম বাবু, রাবি প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি কাজল সিদ্দীক প্রমুখ।
বক্তারা বলেন, আমাদের অবস্থা কন্যা দায়গ্রস্থ অসহায় পিতার মতো। কলম ছাড়া আমাদের প্রতিবাদের আর কোনো ভাষা নেই। সংসদে কী আইন তৈরি করছেন যা শিক্ষকদের নিরাপত্তা দিতে পারে না। গত ১২ বছরে একের পর এক সংস্কৃতিমনা, মুক্তবুদ্ধির ও প্রগতিশীল শিক্ষকদের হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু কোন হত্যাকা্লেরই সুষ্ঠু বিচার সম্পন্ন হয়নি। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্তবুদ্ধি চর্চা কি অপরাধ? আইন পরিবর্তন করার দাবি জানিয়ে বক্তারা এ জঘন্য হত্যাকা্লের বিচার চান।
মানবন্ধন থেকে আগামী এক সপ্তাহ মধ্যে শিক্ষক হত্যায় জড়িতদের ব্যাপারে সন্তোষজনক জবাব না পেলে পুনরায় কর্মসূচি দেয়া হবে বলে জানান সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক শাহ্ আজম শান্তনু।
এছাড়াও রাবি শিক্ষক রেজাউল করিম হত্যার প্রতিবাদে ও বিচার দাবিতে সোমবার দুপুর ১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে মানববন্ধন ও প্রতিবাদী সমাবেশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাগমারা উপজেলা শিক্ষা উন্নয়ন সমিতি।
এদিকে শিক্ষক হত্যার বিচার দাবিতে বিকেল সাড়ে চারটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ কলা ভবনের সামনে ইংরেজী বিভাগের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ সমাবেশ করে। সমাবেশে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বক্তব্য দেন। সমাবেশে রাবি শাখার সামাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রুন্ট, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রমৈত্রী, ছাত্র ফেডারেশন ও সমগীত সংস্কৃতি অংগন সংহতি প্রকাশ করে।
 
বন্ধ ছিলো ক্লাস-পরীক্ষা: রাবি শিক্ষক সমিতির পূর্ব নির্ধারিত ঘোষণা অনুযায়ী গতকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন বিভাগে ক্লাস-পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়নি। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ বিভাগের ক্লাসরুমগুলো তালাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। কিছু কিছু বিভাগের অফিস কক্ষগুলো খোলা থাকলেও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নেই। বিভিন্ন বিভাগে নির্ধারিত পরীক্ষাও স্থগিত করেছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ।
 
প্রগতিশীল জোটের সড়ক অবরোধ
তনুসহ অব্যাহত গুম-খুন-ধর্ষণ ও বিচারহীনতার প্রতিবাদে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) শাখা প্রগতিশীল ছাত্রজোটের নেতাকর্মীরা হরতাল কর্মসুচি পালন করেছে। গতকাল সকাল সাড়ে ৮টা থেকে সাড়ে ৯টা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় প্রগতিশীল ছাত্রজোট সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ছাত্র ঐক্যের অর্ধদিবস হরতালের আহ্বানে তারা রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়ক অবরোধ করে। এদিকে রাবির ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. এএফএম রেজাউল করিম সিদ্দিকী হত্যার ঘটনায় দুই দিনব্যাপী কর্মসূচির শেষদিন সোমবার ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করে ছাত্রজোটের নেতাকর্মীরা। একই দাবিতে তার দুপুর সাড়ে ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ করে।