নিউজিল্যান্ডে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীর পৈশাচিক হামলা
শিফারুল শেখ
‘হ্যালো ব্রাদার।’ এটি ছিল শুক্রবার নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে আল নূর মসজিদে এক মুসল্লির শেষ বাক্য। মন থেকে বেরিয়েছিল ভালোবাসার এই শব্দ দুটো। এর সুন্দর একটা জবাব পাওয়ার আশা করেছিলেন তিনি। কিন্তু সম্মুখে থাকা সুঠাম দেহের অধিকারী, আগাগোড়া ঘৃণায় ভরপুর বিকৃত মস্তিষ্কের ওই উগ্র শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী কোনো জবাব দেননি। পরিবর্তে রাইফেলের তিনটি বুলেট ব্যবহার করে তার শরীর এফোঁড় ওফোঁড় করে দেন। মাটিতে লুটিয়ে পড়েন নাম-পরিচয়হীন সেই মানুষটি। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে ভিডিওটি। ঘৃণাভরা এই খুনির নাম ব্রেন্টন টারান্ট। তার কাছে পাল্টা ভালোবাসা না পেলেও ভিডিও দেখে ওই মৃত মানুষটির প্রতি বিভিন্ন ধর্মের মানুষ প্রশংসায় ভাসিয়ে দিচ্ছেন। ধিক্কার দিচ্ছে খুনিকে যিনি শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদের অতি শ্রেষ্ঠত্বের তত্ত্ব আদালতেও প্রচার করছেন! বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ধর্মের টারান্টদের মতো উগ্র জাতীয়তাবাদীদের কারণে বিশ্ব শান্তি হুমকির মুখে। শান্তির দেশ হিসেবে পরিচিত নিউজিল্যান্ডকেও আক্রমণ করেছে। উগ্র শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদ যতো বাড়ছে, ততোই বাড়ছে সহিংসতা। তারই বলি হলেন ক্রাইস্টচার্চে দু’টি মসজিদের ৪৯ নিরীহ ব্যক্তি। ভাগ্যের জোরে বেঁচে গেছেন বাংলাদেশের মূল্যবান সম্পদ ক্রিকেট দলের খেলোয়াড়রা।
হামলার জন্য দায়ী ইসলামবিদ্বেষী মনোভাব: বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, টারান্ট হামলার আগে তথাকথিত ‘দ্য গ্রেট রিপ্লেসমেন্ট’ নামে যে ইশতেহার প্রকাশ করেছে তা মূলত ইসলামবিদ্বেষী। সে কেবল টুইটারেই প্রকাশ করেনি, নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী, রাজনীতিকসহ ৭০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে পাঠিয়েছিল। ইসলামবিদ্বেষী মনোভাবটা টারান্টের ভেতরে এত গভীর ছিল যে নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের ভিডিও ফেসবুকে সরাসরি সম্প্রচার করতেও পিছপা হয়নি। এতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে ‘শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদীদের উত্কৃষ্ট ব্যক্তি’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান হামলাকে বর্ণবাদ এবং ইসলামবিদ্বেষী মনোভাব বৃদ্ধির সাম্প্রতিক উদাহরণ বলে উল্লেখ করেছেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে নাইন ইলেভেন হামলার পর প্রত্যেকটি সন্ত্রাসী হামলার জন্য সমষ্টিগতভাবে ইসলাম এবং ১৩০ কোটি মুসলিমকে দায়ী করা হয়। এজন্যই ইসলামবিদ্বেষী মনোভাব বেড়েছে যা এই হামলা করতে উত্সাহ দিয়েছে। কেবল তারাই নন, জার্মানির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রঁ থেকে শুরু করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নৃশংস হামলার কড়া নিন্দা জানিয়েছেন। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নিন্দা এবং শোকের ভাষা নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে। কারণ তিনি মুসলিমদের কথা তার নিন্দায় উল্লেখ করেননি। এমনকি হামলাকারীরও কোনো নিন্দা ছিল না।
যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের মিডিয়া সারাক্ষণই ইসলামী সন্ত্রাসবাদের কথা বলে বেড়ায়। অথচ সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে দুই-তৃতীয়াংশ হামলা ঘটে উগ্র শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদীদের দ্বারা। সাউদার্ন প্রভার্টি ল’ সেন্টারের গবেষণায় হামলায় জড়িত কট্টর ডানপন্থিদের সবাই শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদীদের বিভিন্ন গ্রুপের। অথচ পশ্চিমারা এই গ্রুপকে কখনোই হুমকি হিসেবে মনে করেন না। এমনকি মুসলমান হামলাকারীকে ‘জঙ্গি’ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও অন্যরা কেবল ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে পরিচিতি পায়। সম্প্রতি মার্কিন প্রভাবশালী পত্রিকা নিউইয়র্ক টাইমসও জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা কৌশলে কট্টর ডানপন্থি তথা চরমপন্থিদের বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। এর ফলে শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদ বাড়ছে। সাউদার্ন প্রভার্টি ল’ সেন্টার জানায়, শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদীরা যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন সময় ৩০ হাজার মানুষকে হত্যার পরিকল্পনা করছিল যা ব্যর্থ করে দিয়েছে নিরাপত্তা বাহিনী। গতমাসে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই কোস্ট গার্ডের লেফটেন্যান্ট পল হ্যাসনকে আটক করে। উগ্র শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী এ ব্যক্তিটি কৃষ্ণাঙ্গ, উদারপন্থি রাজনীতিক এবং মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের ওপর হামলার পরিকল্পনা করেছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আফ্রিকার দাস প্রথা এবং পশ্চিমা উপনিবেশবাদ অতি শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদ বৃদ্ধির সুবর্ণ সুযোগ করে দিয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপে শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদীদের ক্ষমতা বেড়েছে। ইউরোপের অনেক দেশের নির্বাচনে এখন তারা প্রভাব রাখে। যুক্তরাজ্যে ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট ভোট এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনই এর বড় প্রমাণ। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক রিপাবলিকান রাজনীতিকও শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদের ঘোর সমর্থক বলে পরিচিত। কৃষ্ণাঙ্গদের নিজেদের থেকে নিচু জাতের মনে করাটাই শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদীদের বড় সমস্যা। ২০১৭ সালে ভার্জিনিয়ার চার্লোটেসভিলেতে শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদীর হামলায় একজনের মৃত্যু হলেও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাদের প্রশংসা করেছিলেন যা ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়।
গত ৫ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অ্যান্টি ডিফেমেশন লিগ (এডিএল) নামের একটি সংস্থা জানায়, ২০১৮ সালে উগ্র শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদীদের প্রপাগাণ্ডায় ১ হাজার ১৮৭টি হিংসার ঘটনা ঘটে। আগের বছর এ সংখ্যা ছিল ৪২১টি। অর্থাত্ এক বছরে বেড়েছে ১৮২ ভাগ। গত বছর ৯১টি শোভাযাত্রার আয়োজন করে উগ্র জাতীয়তাবাদীরা। এর আগের বছর ছিল ৭৬টি। এডিএল রিপোর্টে জানিয়েছে, কলেজ শিক্ষার্থীরাই উগ্র জাতীয়তাবাদকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বিভিন্ন সংগঠনের মূল টার্গেট। ইসলাম এবং ইহুদি বিদ্বেষী বিভিন্ন তথ্য জানিয়ে তাদের দলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এমনকি শিশুদেরও দলে ভেড়ানোর চেষ্টা চলছে।
মুসলিমদের ওপর হামলা: গবেষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ব্রিটেন, কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের ওপর শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদীদের হামলা বেড়েছে। আগস্ট ২০১৬: নিউইয়র্কের রাস্তায় ইমাম ও তার সহযোগীকে হত্যা করা হয়। একজন শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদীকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে হত্যায় অভিযুক্ত করে। ডিসেম্বর ২০১৬: সুইজারল্যান্ডে মসজিদে প্রার্থনা শেষে চা পান করার সময় একজনকে গুলি করে হত্যা। ওই দিনই সে আরেকজনকে হত্যা করে। জানুয়ারি ২০১৭: আলেক্সান্ডার বিসোনেট কুইবেক মসজিদে ৬ জনকে গুলি করে হত্যা করে। মে ২০১৭: যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগন রাজ্যে জেরেমি জোসেফ ক্রিশ্চিয়ানের দুই মুসলিমকে ছুরিকাঘাত করে খুন। জুন ২০১৭: ব্রিটেনে ফিনসবিউরি পার্কের মসজিদে নামাজ পড়ে বের হওয়ার পরই গাড়ি চাপায় একজন মারা যান। হামলাকারীর নাম ডারেন অসবোর্ন (৪৮)। সে চিত্কার করে বলেছিল, আমি সব মুসলিমকে হত্যা করতে চাই। আগস্ট ২০১৭: স্পেনে মুসলিমদের ওপর কয়েক দফা হামলা হয়; যাতে হতাহতের ঘটনা ঘটে।
উগ্র শ্বেতাঙ্গদের যতো হামলা: ব্রিটেনের পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, এক দশকেরও কম সময়ের ব্যবধানে এ সব হামলার ঘটনা ঘটে। ২০১১ সালের জুলাইয়ে নরওয়েতে ৭৭ জনকে হত্যা করে মুৃসলিম ও অভিবাসনবিরোধী অ্যান্ডার্স ব্রেভিক। ২০১২ সালের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিনে শিখ মন্দিরে ৬ প্রার্থনাকারীকে গুলি করে হত্যা। গ্রিসে ফ্যাসিস্ট বিরোধী সংগীত শিল্পী প্যাভলোস ফাইয়াসকে ছুরিকাঘাতে খুন। ২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কানসাসে জিউশ সেন্টারে তিনজন নিহত। জুন ২০১৫ সালে সাউথ ক্যারোলিনার চার্লেসটনে কৃষ্ণাঙ্গদের গির্জায় ৯ জন খুন। ২০১৫ সালের অক্টোবরে সুইডেনে তিনজনকে হত্যা। ২০১৬ সালের জুনে ব্রিটেনে ব্রেক্সিট বিরোধী লেবার এমপি হত্যার শিকার। ২০১৭ সালের মার্চে নিউইয়র্কে ছুরি দিয়ে টিমোথি কফম্যানকে খুন করে অতি শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী। ২০১৮ সালের অক্টোবরে কেনটাকিতে কৃষ্ণাঙ্গদের গির্জায় দুজনকে হত্যা। ওই বছরের নভেম্বরে পেনসিলভানিয়ার পিটসবার্গের সিনাগগে ১১ জনকে হত্যা করে এক শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী।
