বাংলাদেশের মানুষ আর তার শৈশবের স্মৃতিতে গ্রামের মেলা জড়িয়ে নেই, এটা হতেই পারে না। গ্রামের শান্ত নিথর জীবনে গ্রামীণ মেলা যেন আনন্দের বন্যা নিয়ে হাজির হতো। দৈনন্দিন জীবনের গণ্ডির বাইরে মেলা যেন একটা দমকা হাওয়া। যেখানে হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা। মানুষে মানুষে মিলবার জাত-পাত, ধর্মীয় পরিচয় পেছনে ফেলে এমন মিলবার জায়গা আর কোথায়? বাংলার এই মেলা ছাড়া!
তবে আধুনিকতার অভিঘাতে ঐতিহ্যবাহী মেলাগুলোর চরিত্র বদলাচ্ছে। আগে সব মেলাই ছিল গ্রামকেন্দ্রিক। গ্রামের মেলা যখন চরিত্র হারাচ্ছে কিংবা বন্ধ হতে বসেছে তখন সেই গ্রামীণ সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে শহরেই শুরু হয়েছে মেলার আয়োজন। গ্রামের কোনো কোনো মেলা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ঐতিহ্যবাহী পণ্যের বদলে স্থান করে নিচ্ছে এখনকার প্লাস্টিকের পণ্য। যারা গ্রাম ছেড়ে শহরে এসেছেন জীবিকার তাগিদে অনেকটা তাদের নস্টালজিক স্মৃতিই গ্রামের সেই মেলাকে শহর জীবনে নিয়ে আসছে। ঐতিহ্যবাহী পণ্যগুলোকে ফিরিয়ে আনার তোড়জোড় দেখা যায় শহুরে এসব মেলায়। আবার শহরের বাসিন্দাদের প্রয়োজনকে প্রাধান্য দিয়েও মেলার আয়োজন বসছে। এরমধ্যে বাংলা একাডেমির অমর একুশে গ্রন্থমেলা খুব বড় উদাহরণ।
বাংলার চিরায়ত ঐতিহ্যের ধারায় মেলা অন্যতম অনুষঙ্গ। কত রকমের যে মেলা হয় তা শুনলে চোখ ছানাবড়া। বৈশাখী মেলা, পৌষ মেলা তো সবার জানা। লালন মেলাও সবার জানা। এর বাইরেও কত মজার মজার মেলার আয়োজন হয়। মাছের মেলা বসে। বসে বউ মেলা। জামাইরা তাহলে বাদ থাকে কেন তাই বসে ‘জামাই মেলা’। তাহলে শাশুড়ি আর বাদ রইলো কেন? সে মেলাও বসে ‘বউ-শাশুড়ি’ মেলার নামে। ধর্মীয় কারণেও মেলার আয়োজন বসে। কিন্তু মেলা তখন আর ধর্মের গণ্ডিতে আটকে থাকে না। পূজায়, ঈদে, বড়দিনে যে মেলার আয়োজন বসে সে তো আর শুধু সেই ধর্মের মানুষের থাকে না। সবার হয়ে ওঠে। শত শত বছর ধরে এই মেলাগুলো বাংলার অসাম্প্রদায়িক চরিত্রের প্রতীক হয়ে বিরাজ করছে।
বর্ষীয়ান ফোকলোরবিদ শামসুজ্জামান খান বলেন, ‘মেলা বাংলার গ্রামীণ জীবনের সবচাইতে পুরানো প্রতিষ্ঠান। মেলা গ্রামীণ মানুষকে মানবিক করেছে। মেলা মানবিক মূল্যবোধ সৃষ্টি, মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রেখেছে। গ্রামীণ জীবনের সামাজিক প্রয়োজন, আধ্যাত্মিকতার আকাঙ্ক্ষা, সাধক-মনীষীদের স্মরণ, পার্বণ-উত্সবকে কেন্দ্র করে সাংস্কৃতিক একটি ক্ষেত্র এই মেলা।’
ফোকলোর গবেষকরা বলছেন, মূলত প্রয়োজন মেটানোর জন্য মেলার আয়োজন শুরু হয়। বাংলার গ্রামগুলো ছিল বিচ্ছিন্ন। শহরের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল না। প্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহের কারণে মেলার আয়োজন শুরু হয়। গ্রামের হাটে দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর পণ্য মিলতো। সাংসারিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য এমন কিছু পণ্য মেলায় স্থান পেত যেমন খাট-পালঙ্ক, হাড়ি-পাতিল ইত্যাদি। এর বাইরেও ঋতুভিত্তিক প্রয়োজনীয় পণ্য সংগ্রহের জন্য মেলা বসতে শুরু করে।
মেলায় ঘোরাফেরায় ক্লান্তি নেই। যেন প্রতিবার ঘোরায় নতুন আনন্দ যোগ হয়। দল বেঁধে পরিবার আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে মেলায় ঘুরে বেড়ানোর কোনো তুলনা চলে না। আর সন্ধ্যার পর সার্কাসের উত্তেজনা, পুতুল নাচের গল্প দেখার মজা মেলা ছাড়া আর কোথায় পাব! নাগরদোলায় না চড়লে তো মেলার মজা অর্ধেক বাকি থাকে। আরো রয়েছে ম্যাজিক, যাত্রা, বাউল-ফকির বা কবিগান, বায়োস্কোপ, লাঠিখেলা, কুস্তি, জারিগান ইত্যাদি।
সারাদেশের আনাচে কানাচে মেলা বসে। প্রাচীনকাল থেকেই মেলা আয়োজনের প্রচলন রয়েছে। ধারণা করা হয় দেশে প্রায় ১০ হাজার মেলা বসে। তবে বাংলা একাডেমির ফোকলোর সংগ্রাহক মোহাম্মদ সাইদুর ব্যক্তিগত উদ্যোগে মেলার তালিকা করেছিলেন সেই ১৯৮৭ সালে। সেই তালিকায় তিনি সাড়ে ১২শ মেলার কথা জানিয়েছিলেন। মোহাম্মদ সাইদুরের সেই তালিকার বাইরে দেশের মেলার সংখ্যা নির্ণয়ে কোনো উদ্যোগ নেই।
মেলার রকমফের:এদেশের প্রাচীন পর্যায়ের উত্সব ও আচার অনুষ্ঠানকেন্দ্রিক মেলাগুলির উত্পত্তির সঙ্গে বৃষ্টি রোদ ও কৃষি শস্যের সম্পৃক্ততা রয়েছে। আদিকাল থেকেই বাংলার মানুষ চাঁদ ও সূর্যকে ‘বুড়াবুড়ি’ নামে অভিহিত করেছে এবং এর ওপর ভিত্তি করে প্রবর্তিত হয়েছে ‘বুড়াবুড়ির মেলা’। এই মেলাই পরবর্তীকালে সূর্যমেলা, সূর্য ঠাকুরের ব্রত, চৈত্র-সংক্রান্তির ব্রতের মেলা, চড়কমেলা ও শিবের গাজনের মেলায় রূপ নিয়েছে। অন্যদিকে মেঘের দেবতা বরুণ-বারুণী স্নানের মেলা হিসেবে রূপ নিয়েছে। একসময় গ্রাম-গঞ্জের সবখানেই বরুণ বা বারুণী স্নানের মেলা বসতো। আবার বারুণী থেকে এ মেলার নাম হয়েছে ‘বান্নি’ মেলা।
এ প্রসঙ্গে ফোকলোর গবেষক সাইমন জাকারিয়া বলেন, বাংলায় প্রধানত ঋতুভিত্তিক মেলার আয়োজনই বেশি। ফসল, ফল, বিভিন্ন প্রয়োজনীয় উপাদান মানুষের কাছে পৌঁছায় এই মেলা আয়োজনের মাধ্যমে। এর সঙ্গে অর্থনীতি ও উত্পাদনের সম্পর্ক। একটা সময় চিত্ত বিনোদনের প্রধান ক্ষেত্র ছিল মেলা। শুধু তাই নয় মানুষের জীবন-জীবিকা নির্ভর করে মেলা আয়োজনের ওপরে। যাত্রাপালার অভিনেতা, কলাকুশলী, সার্কাস, পুতুল নাচসহ পারফর্মিং আর্টের সঙ্গে যারা যুক্ত তাদের জীবন এই মেলার ওপরে নির্ভরশীল। মেলা ধর্মীয়, ঋতুভিত্তিক ও সামাজিক কারণে আয়োজন করা হয় তবে প্রধান দিক হচ্ছে অর্থনৈতিক।
সাধারণত সাতটি শ্রেণিতে ভাগ করে মেলার আয়োজন হয়ে থাকে। ১. ঋতুভিত্তিক মেলা, ২. কৃষি উত্সব ৩. ধর্মীয় উপলক্ষ ৪. সাধু-সন্তের ওরস উপলক্ষে ফকিরী মেলা ৫. জাতীয় জীবনের বিভিন্ন বরেণ্য ব্যক্তি যেমন, কবি-সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ, দার্শনিক প্রমুখ বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের স্মরণোত্সব উপলক্ষে ৬. জাতীয় দিবস উদযাপন উপলক্ষে সাংস্কৃতিক মেলা এবং ৭. বাণিজ্যিক সামগ্রী নিয়ে মেলা।
মুসলমান সম্প্রদায়ের উত্সবকেন্দ্রিক মেলার মধ্যে মহররমের মেলা বেশ জনপ্রিয়। হিন্দু সম্প্রদায়ের পূজাতেও মেলা বসার চল রয়েছে। রথের মেলা তো হিন্দু সম্প্রদায়ের বিখ্যাত মেলা। খ্রিস্টানদের বড় দিনেও মেলা বসে। তবে এ মেলার মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন হচ্ছে গোপালগঞ্জের মকসুদপুর থানার অন্তর্গত কালীগ্রামের মেলা। আদিবাসীরা প্রতিবছর বিজু উত্সবে মেলার আয়োজন করে থাকে। বৈশাখী মেলা তো এখন দেশের সংস্কৃতির প্রধানতম অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। এছাড়া রয়েছে বসন্ত মেলা, পৌষ মেলা।
সাধু-ফকির প্রবর্তিত বিভিন্ন মেলার মধ্যে রয়েছে লালন সাঁইয়ের আখড়া বাড়িতে অনুষ্ঠিত দোলপূর্ণিমার মেলা, গোপালগঞ্জের ওড়াকান্দির হরিঠাকুরের মেলা, বগুড়ার মহাস্থানগড়ের শাহ সুলতানের মেলা, চট্টগ্রামের মাইজভাণ্ডারের মেলা, সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরীর মেলা, সিলেটে বাউল শাহ আবদুল করিমের মেলা প্রভৃতি। জাতীয় জীবনে উল্লেখযোগ্য বিভিন্ন বরেণ্য ব্যক্তি স্মরণে নিয়মিতভাবে স্মরণোত্সব অনুষ্ঠিত হয়, বসে মেলা। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছেঁউড়িয়ার লালন মেলা, সুনামগঞ্জের হাসন মেলা, শিলাইদহের রবীন্দ্র মেলা, দরিরামপুরের নজরুল মেলা ও সাগরদাঁড়ির মধু মেলা।
জাতীয় দিবসে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। যেমন- একুশে ফেব্রুয়ারি, স্ব্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবস। এই সাংস্কৃতিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নিয়মিতভাবে বইমেলারও আয়োজন হয়। বাংলা একাডেমির বইমেলা আয়োজন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে এখন রাজধানী থেকে দূর মফস্বল শহরেও প্রসারিত হয়েছে বইমেলা। এছাড়া রয়েছে বাণিজ্য মেলা, কুটিরশিল্প মেলা, তাঁতবস্ত্র মেলা, শিল্প মেলা, বস্ত্র মেলা ইত্যাদি।
