বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) চিকিত্সক রাজন কর্মকারের (৪০) লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। গত শনিবার গভীর রাতে অসুস্থ হলে পরিবারের সদস্যরা তাকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত চিকিত্সক মৃত ঘোষণা করেন। স্ত্রীর সঙ্গে ইন্দিরা রোডের একটি বাসায় থাকতেন তিনি। রাজন কর্মকারকে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন পরিবারের সদস্যরা। তিনি বঙ্গবন্ধু মেডিক্যালের ম্যাক্সিলোফেসিয়াল বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ছিলেন। নিহত চিকিত্সকের স্ত্রী খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদারের মেয়ে।
নিহতের স্বজনরা জানান, শনিবার গ্রীন লাইফ হাসপাতালে প্রাইভেট প্র্যাকটিস শেষে রাত ১২ টায় বাসায় ফেরেন ডা. রাজন। রাত সাড়ে ৩টায় নিহতের মাকে ফোন করে তার স্ত্রী কৃষ্ণা মজুমদার জানান, রাজনের অবস্থা ভালো না। পরে তারা জানতে পারেন রাজনকে রাতে স্কয়ার হাসপাতালে নিলে চিকিত্সকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। রাজনের কাকাতো ভাই অভি বলেন, ‘রাজন ভাইয়ের সঙ্গে তার স্ত্রীর সম্পর্ক খারাপ যাচ্ছিল। এর আগে একাধিকবার তাকে মারধর করা হয়েছিল। এ জন্য আমাদের সন্দেহ তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। আমরা তার লাশের ময়নাতদন্ত করাতে চাই এবং সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করছি।’
চিকিত্সক রাজন কর্মকারের মামা সুজন কর্মকার বলেন, ‘আমরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চাই। লাশের ময়নাতদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর কারণ জানতে চাই। এর জন্য যা যা করা প্রয়োজন, আমরা তা করবো।’ মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছি, এখনও মামলা করিনি।’ রাতে কৃষ্ণা রাজনের মাকে ফোন করে কী বলেছিল জানতে চাইলে মামা সুজন কর্মকার বলেন, ‘রাতে রাজনের স্ত্রী কৃষ্ণা আমার বোনকে ফোনে বলেছে, আপনার ছেলে মারা গেছে, আমি আপনাদের দেখে নেবো, নিজেও সুইসাইড করবো। আপনাদের শান্তিতে থাকতে দেবো না। আমাকে আমার বোন (রাজনের মা) ভোর সাড়ে ৪টার দিকে ফোন করে কাঁদতে কাঁদতে বলেন, রাজন মারা গেছে। মৃত্যুর সংবাদ পেয়ে আমি হাসপাতালে ছুটে আসি।’
রাজনের সহকর্মী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোলোজি বিভাগের চিকিত্সক শাহ নেওয়াজ বারী জানান, এখন আমরা এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চাই। কারণ এর আগেও রাজনকে মারধরের ঘটনা ঘটেছে। তাই আমরা উদ্বিগ্ন হয়ে সহকর্মীরা সবাই ছুটে এসেছি। আমরা এই মৃত্যুর ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করছি।
বঙ্গবন্ধু মেডিক্যালের ওরাল অ্যান্ড ম্যাক্সিলোফেসিয়াল সার্জারি (ওএমএস) বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. কাজী বিল্লুর রহমান বলেন, ‘রাজনের পরিবার লাশের ময়নাতদন্ত চায়। সেক্ষেত্রে কারও কোন আপত্তি নেই। আমি মন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে কথা বলেছি, ময়নাতদন্তে তাদেরও কোন আপত্তি নেই। ময়নাতদন্তের জন্য লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতাল মর্গে নিয়ে যাওয়া হবে।’ তিনি বলেন, ‘বিএসএমএমইউর সব চিকিত্সক ও শিক্ষার্থীরা এখানে এসেছেন। সবার দাবি, এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হোক।’
লাশ দেখে প্রাথমিকভাবে কী মনে হয়েছে জানতে চাইলে এই চিকিত্সক বলেন, ‘আমি রাতে খবর পেয়ে এখানে ছুটে এসেছি। আমি এসে শুধু রাজনের মুখ দেখেছি, শরীরের আর কিছু দেখিনি। দেখে স্বাভাবিকই মনে হয়েছে।’
বঙ্গবন্ধু মেডিক্যালের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া বলেন, ‘আমি রাজন কর্মকারের মৃত্যুর খবরটি শুনেছি। তাকে হাসপাতালে দেখতে গিয়েছিলাম। আমার এখানে তার বাবা ও মামা এসেছিলেন। তার বাবা অভিযোগ করেছেন, এটি একটি হত্যাকাণ্ড। তারা মৃতদেহের ময়নাতদন্তের দাবি জানিয়েছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানের একজন চিকিত্সক মারা গেছেন। আমি একজন চিকিত্সক হিসেবে মনে করি, তার মরদেহের ময়নাতদন্ত হওয়া উচিত। শুধু আমি নই, এখানকার সবাই চান লাশের ময়নাতদন্ত হোক।’
এ বিষয়ে স্কয়ার হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিত্সক ডা. আসাদুজ্জামান বলেন, ‘রাত ৩টা ৪৫ মিনিটের দিকে ডা. রাজনকে আমাদের এখানে নিয়ে আসেন পরিবারের সদস্যরা। এরপর আমরা তাকে মৃত ঘোষণা করি। এখানে নিয়ে আসার পর আমরা তার লাইফের কোনও সাইন পাইনি। ইসিজি করা হয়, সেটি স্ট্রেট লাইন ছিল। তার বডিতে কোনও ইনজুরি ছিল না। তার হার্ট ব্লক হয়ে মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরিবারকে ডেডবডি দিয়ে দিতে আমরা প্রসেস করেছি, ময়নাতদন্তের জন্য বলিনি। তবে পরিবার যদি চায়, তাহলে ময়নাতদন্ত করবে। আমরা তাদের বক্তব্য অনুযায়ী সে ব্যাপারে পরবর্তী ব্যবস্থা নেব।’
শেরেবাংলা নগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জানে আলম মুন্সি বলেন, আমরা একজন চিকিত্সকের মৃত্যুর খবর পেয়ে পুলিশ পাঠিয়েছি। নিহতের স্বজনেরা অভিযোগ করলে আমরা অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা নেবো। ডা. রাজনের মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
ডা. রাজন হত্যার প্রতিবাদে নোয়াখালীতে সড়ক অবরোধ
নোয়াখালী প্রতিনিধি জানান, ডা. রাজন কর্মকারকে হত্যা করা হয়েছে এমন অভিযোগ এনে অপরাধীদের বিচার দাবিতে তার স্বজন ও এলাকাবাসী প্রায় এক ঘন্টা মাইজদী-বেগমগঞ্জ সড়রের একলাশপুরে অবরোধ করেন। গতকাল বিকাল সাড়ে ৫টা থেকে সাড়ে ৬টা পর্যন্ত সড়ক অবরোধ করে রাখেন তারা। পরে পুলিশ এসে তদন্ত করে সুষ্ঠু বিচারের আশ্বাস দিলে অবরোধ তুলে নেয়া হয়। এ সময় ডা. রাজন কর্মকারের মা খুকু রাণী কর্মকার, ভাই রাজিব কর্মকার উপস্থিত ছিলেন। রাজনের মা ও ভাই কান্নাজড়িত কণ্ঠে অভিযোগ করে বলেন, ‘রাজনের স্ত্রী কৃষ্ণা মজুমদার ও তার পরিবারের লোকজন রাজনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে।’
