‘চিত্ত মম বিকশিত হোক নৃত্যের তালে তালে’ স্লোগানে সারবিশ্বের মতো গতকাল রাজধানীসহ সারাদেশে উদযাপিত হলো আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবস। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি ও বাংলাদেশ নৃত্যশিল্পী সংস্থার যৌথ আয়োজনে সম্মাননা প্রদান, মঙ্গল নৃত্য, শোভাযাত্রা, সেমিনার, আলোচনা ও নৃত্যানুষ্ঠান ইত্যাদি দিয়ে সাজানো হয় আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবসের অনুষ্ঠানমালা। সকাল সাতটায় একাডেমির কফি হাউস প্রাঙ্গণে মঙ্গল নৃত্য পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় দিবসটি উদযাপনের কার্যক্রম। সকাল নয়টায় শিল্পকলা একাডেমি থেকে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করা হয়। শিল্পকলা একাডেমি থেকে হাইকোর্ট সড়ক ও জাতীয় প্রেসক্লাব হয়ে পুনরায় একাডেমিতে শেষ হয় শোভাযাত্রাটি। সকাল ১১টায় জাতীয় নাট্যশালার সেমিনার কক্ষে অনুষ্ঠিত হয় ‘বাঙলার শেকড়ের সংস্কৃতি ও বাংলাদেশে নৃত্য চর্চা’ শীর্ষক সেমিনার। এতে ড. শেখ মেহেদী হাসানের প্রবন্ধের ওপর উন্মুক্ত আলোচনা করেন আলোচকরা।
সন্ধ্যায় একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত আলোচনায় প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা। এতে আলোচক ছিলেন নৃত্য প্রশিক্ষক ও নৃত্যশিল্পী রাহিজা খানম ঝুনু। শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেন নৃত্যশিল্পী সংস্থার সভাপতি মিনু হক ও স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান। অনুষ্ঠানে এবারের নৃত্য দিবসের সম্মাননা প্রদান করা হয় ভাষাসৈনিক ড.এনামুল হককে। এছাড়া একই সময়ে সন্ধ্যায় একাডেমির নন্দনমঞ্চে নৃত্যাঞ্চলের আয়োজনে নৃত্য পরিবেশন করে সুবিধাবঞ্চিত ও বিশেষ শিশুরা।
শিল্পানুরাগীদের রাঙিয়েছে সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা
চোখের আলো নেই বলে কি থেমে থাকবে ওরা? থেমে থাকেনি। নিজেরা দেখতে না পেলেও শিল্পানুরাগীদের চোখের আলোতে ধাঁধা লাগিয়েছিলো ওরা। নাচের মুদ্রার তালে, লয়ে, ছন্দে, তা ধিন ধিন তা’র ধবনিতে ওরা ঝড় তুলেছিলো শিল্পের সমজদারদের হূদয়ে। নাচের মুদ্রায় যাদুর রাজ্যে নিয়ে গিয়েছেলো দর্শকদের। দেশের গানের সাথে প্রকৃতির রূপ বৈচিত্র্যই শুধু তুলে ধরেনি বাংলার আবহমান চিত্র নাচের মাধ্যমে তুলে ধরেছিলো বিশেষ এই শিশুরা। দৃষ্টিহীনতা মানেই প্রজ্ঞাহীনতা নয়, শিল্পের অনুষঙ্গের ভাঁজে ভাঁজে ওরা তা বুঝিয়ে দিয়েছিলো শিল্পকলা একাডেমিতে আগত নৃত্যপিয়াসীদের মাঝে। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের পাশাপাশি মানসিক প্রতিবন্ধী ও শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশুরাও শিল্পের সুষমায় এক অনুষ্ঠানে আগতদের হূদয়ের তন্ত্রীতে শিল্পের সুধা ঢেলে দিয়েছিলেন নিজেদের উজাড় করে। এমনি চিত্রই ছিলো নৃত্যাঞ্চল আয়োজিত নৃত্য উত্সবের সমাপনীতে।
আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবস উপলক্ষে গতকাল উত্সবের সমাপনীতে এমন ভিন্ন আয়োজনেই সাজানো হয়েছিলো নৃত্যাঞ্চলের সমাপনী অনুষ্ঠানমালা। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সুবিধাবঞ্চিত ও বিশেষ শিশুদের অংশগ্রহণের এই নৃত্যানুষ্ঠানটি। এতে অংশগ্রহণ করে উত্পত্তি বাংলাদেশ, ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ, প্রয়াস বাংলাদেশ, রমনা বুদ্ধি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়, প্রতিক, আরডিএস বাংলাদেশ, একসেস বাংলাদেশ ও সুইড বাংলাদেশের শিশুরা।
‘বাউলের একতারাতে মাটির সুর’ দিয়ে শুরু করে, এসো বাংলাদেশের যত বীর জনতা, ফুলে ফুলে, লাল পাহাড়ের দেশে যাই, দেশে দস্যু এলো, ঝুন ঝুন ময়না নাচো না, ঢোল বাজে ঢোল বাজে বাংলাদেশের ঢোল, সাধের লাউ বানাইলো মোরে বৈরাগি, মাইঝা ভাই, একটি বাংলাদেশ তুমি জাগ্রত জনতার, মোর বীনা উঠে কোন সুরে, নাও ছাড়িয়া দে, নাচ ময়ূরী নাচ রে, একটি গল্প শোনাবো আজ ইত্যাদি গানের সাথে নৃত্যের নান্দনিকতায় অনুষ্ঠানস্থলে মোহনীয়তার আবেশে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখেন নৃত্যানুরাগী দর্শকদের। প্রতিটি পরিবেশনা পর নাচের সমজদারদের মুহুর্মুহু করতালি অনুপ্রেরণা যোগায় বিশেষ ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের।
এর আগে অনুষ্ঠিত সংক্ষিপ্ত আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তৃতা করেন ব্লাইন্ড এডুকেশন এন্ড রিহ্যাবিলিটেশন ডেভলপমেন্ট অরগানাইজেশনের নির্বাহী পরিচালক মো. সাইদুল হক।
