রাজশাহীতে নিহত শিক্ষক রেজাউল করিমের ছেলে রিয়াসাদ ইমতিয়াজ সৌরভ বলেছেন, আমার আব্বুর সবচেয়ে বড় দোষ হলো সত্য কথা বলা। কারো ধার ধারতেন না, যেটা ভালো মনে করতেন সেটাই বলতেন। আমার বাবাকে কি কারণে হত্যা করা হয়েছে সেটা খোঁজার জন্য আমরা ব্যস্ত। তিনি আস্তিক ছিলেন, না নাস্তিক ছিলেন সেটা নিয়ে সবাই মাথা ঘামাচ্ছেন। কিন্তু তাকে কে হত্যা করল সেদিকে কারো ভ্রুক্ষেপ নেই। আমার বাবার খুনের কারণ না খুঁজে খুনিদের বের করাটাই জরুরি। খুনের কারণ খোঁজার অর্থ হলো খুনকে অনেকটাই বৈধতা দেয়া।
শনিবার সাড়ে ১০টার দিকে শিক্ষক হত্যার বিচার দাবিতে গঠিত মুকুল মঞ্চে ইংরেজি বিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত সমাবেশে এসব কথা বলেন তিনি।
এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ কলাভবনের সামনে থেকে একটি মৌন মিছিল বের করে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। পরে মিছিলটি ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে ‘সাবাস বাংলা’ ভাস্কর্য কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে দেয় তারা। সেখান থেকে তারা ‘মুকুল প্রতিবাদ ও সংহতি মঞ্চে’ গিয়ে সমাবেশ করে। এসময় অর্থনীতি, লোক প্রশাসন বিভাগ, আইন অনুষদ, ইনফরমেশন সায়েন্স অ্যান্ড লাইব্রেরি ম্যানেজমেন্ট, ফলিত গণিত, পরিসংখ্যান, ভাষা, বাংলা বিভাগ প্রগতিশীল ছাত্রজোট ও বঙ্গবন্ধু ছাত্র পরিষদ মিছিল নিয়ে এসে সমাবেশে যোগ দিয়ে বিচার দাবির আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করে।
সমাবেশ শেষে সকাল ১১টায় শিক্ষক সমিতির মানববন্ধনে প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থী যোগ দেয়। এদিকে শনিবার বেলা ১২টার দিকে প্যারিস রোডে হত্যাকারীদের শাস্তির দাবিতে প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করেছে অরণী সাংষ্কৃতিক জোট। এছাড়াও সাড়ে ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা গণস্বাক্ষর কর্মসূচির আয়োজন করে।
শিক্ষক সমিতির মানববন্ধনে ফজলে হোসেন বাদশা
অধ্যাপক এ এফ এম রেজাউল করিম সিদ্দিকী হত্যার প্রতিবাদে ও দোষীদের শাস্তির দাবিতে শনিবার বেলা ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনের সামনে আয়োজিত শিক্ষক সমিতি মানববন্ধনে রাজশাহী-২ আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, ‘অধ্যাপক রেজাউল হত্যার আগে তিনজন শিক্ষককে হত্যা করা হয়েছে। হত্যা করার জন্য তারা দিন দিন আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। রেজাউল হত্যায় আমরা শোকাহত, সে শোককে শক্তিতে পরিণত করতে হবে। এ হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সংগ্রাম গড়ে তোলার কোন বিকল্প নেই।’
অধ্যাপক রেজাউল হত্যার প্রতিবাদে ক্যাম্পাসে গণঅভ্যুত্থানের আলামত উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই শিক্ষক হত্যার পর শিক্ষার্থীদের যে আন্দোলনের তরঙ্গ দেখতে পাচ্ছি, তা বংলাদেশে উজ্জল দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারবে। এতে রাজশাহীর জনগণও এগিয়ে আসবে বলে আশা করি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল বিভাগ, সংগঠনকে ঐক্যবদ্ধভাবে এ আন্দোলনকে বেগবান করতে শিক্ষকদের নেতৃত্বে একটা মঞ্চ তৈরি করবেন। এই মৃত্যুই যেন শেষ মৃত্যু হয়।IMG0
জনগণের ট্যাক্সের টাকায় পুলিশ প্রশাসনের বেতন, ভাতা, যাবতীয় পরিচালিত হয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমরা অতীতে বই মেলা ও টিএসসি’র পাশে হত্যা দেখেছি। কিন্তু তদন্তের দীর্ঘসূত্রিতা, বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা সেসব ঘটনাকে মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে দেয়ার একটা ষড়যন্ত্রমূলক কৌশল আজকে প্রশাসন অবলম্বন করছে। পুলিশ প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্তাব্যক্তিরা বলেন, ‘নিজের নিরাপত্তা বলয় নিজেরা তৈরি করুন।’ কেন আপনারা চলবেন বন্দুক হাতে, আর আমাদের নিরাপত্তা বলয় তৈরি করতে বলেন? এটা কোন প্রজাতন্ত্রের বক্তব্য হতে পারেনা। আপনি পুলিশ প্রধান হতে পারেন, কিন্তু আপনি প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী এটা ভুলে যাবেন না। দায়িত্বহীন কথা বলবেন না।’
মানববন্ধনে শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক শাহ আজম শান্তনুর সঞ্চালনায় বক্তব্য দেন- সমিতির সভাপতি অধ্যাপক মো. শহীদুল্লাহ্, লোক প্রশাসন বিভাগের সভাপতি আওয়াল হোসেন মোল্যা, আইন বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক আবু নাসের মো. ওয়াহিদ, আইন অনুষদের সাবেক ডিন বিশ্বজিৎ চন্দ, বাংলা বিভাগের সভাপতি অমৃত লাল বালা, বাংলা বিভাগের অধ্যাপক সফিকুন্নবী সামাদী প্রমুখ। সমাবেশে বিচারের দাবিতে বক্তারা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
উল্লেখ্য, গত ২৩ এপ্রিল নগরীর শালবাগানস্থ নিজ বাড়ির অদূরে অধ্যাপক রেজাউল করিমকে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। এরপর থেকে বিচারের দাবিতে আন্দোল করে আসছে শিক্ষার্থীরা।
