চট্টগ্রামে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। গণপরিবহন, হোটেল-রেস্তোরাঁ, শিল্প-কারখানা, নৌ-পরিবহন খাত, বাসা-বাড়ি, নানা ধরনের ওয়ার্কশপ, লেদমেশিন কারখানা, গুদাম-ঘাট, কাঁচা-বাজারসহ নগরীর বিভিন্ন স্থানে বিপুল সংখ্যক শিশু শ্রমিক পেটের তাগিদে প্রতিদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে যাচ্ছে। অনেক ঝুঁকিপূর্ণ কাজে মারাত্মক দুর্ঘটনাও ঘটছে। দুর্ঘটনায় অনেক শিশু শ্রমিক চিরজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে যাচ্ছে। দরিদ্র হতভাগ্য এই শিশু শ্রমিকদের পুনর্বাসনে সরকারি বেসরকারি সংস্থাগুলোর পর্যাপ্ত কোনো উদ্যোগ নেই বলে অভিযোগ উঠেছে।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ৬০ লাখ মানুষ অধ্যুষিত চট্টগ্রাম মহানগরীতে গত এক দশকে বিভিন্ন সেক্টরে শিশু শ্রমিকের সংখ্যা আশঙ্কাজনকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শত শত দরিদ্র পরিবার প্রতিদিন চট্টগ্রাম মহানগরীতে এসে উঠছে। এই সব পরিবারের শিশুসহ সব সদস্যই পেটের দায়ে নগরীর বিভিন্ন স্থানে যোগ দিচ্ছে নানা কাজে। নগরীতে যেসব শিশু শ্রমিক দেখা যাচ্ছে তাদের সিংহভাগই আসছে এসব দরিদ্র ভাসমান পরিবার থেকে। অভিযোগ উঠেছে অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়ে শিশুরা তাদের নিজেদের প্রাপ্তবয়স্ক দেখিয়ে বিভিন্ন কাউন্সিলর অফিস থেকে সংগ্রহ করছে মিথ্যা জন্মসনদ এবং নিজেদের নিয়োজিত করছে নানা ধরনের শ্রমঘন শিল্পে।
মহানগরীর গণপরিবহন সেক্টরেও বিপুল সংখ্যক দরিদ্র শিশুকে কাজ করতে দেখা যাচ্ছে। তারা বাস, টেম্পো, ট্রাক, হিউম্যান হলারসহ নানা ধরনের যানবাহনে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হেলপার বা সহকারীর কাজ করে যাচ্ছে। এসব হেলপারের কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই বলে জানান মহানগরী ট্রাফিক পুলিশের এক কর্মকর্তা। অন্যদিকে গণপরিবহনে নিয়মিত যাতায়াতকারী অনেকেই জানান, তারা দেখেছেন বিভিন্ন টেম্পো ও হিউম্যান হলার প্রায়ই চালাচ্ছে অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকেরা। নগরীতে সংঘটিত দুর্ঘটনার বেশিরভাগই এইসব শিশু চালকের কারণে সংঘটিত হচ্ছে বলে অনেকেরই অভিযোগ। ট্রাফিক সূত্র জানায় ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত কোনো শিশু আইনত ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে পারে না। অথচ প্রায়ই দেখা যাচ্ছে ১২ থেকে ১৪ বছরের অনেক শিশু ছোট ছোট গণপরিবহন চালাচ্ছে কিংবা সেগুলোতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হেলপারের কাজ করছে। এই শিশুরা অনেক সময় পরিবহন মালিকদের হাতে নির্যাতনের শিকার হলেও এসব ব্যাপারে শ্রম আদালতে কোনো অভিযোগ যেমন যায় না, তেমনি কোনো শিশু নির্যাতনকারীর বিচার হয়েছে এমন খবরও সচরাচর শোনা যায় না।
শ্রম আইন বিশেষজ্ঞ বিশিষ্ট আইনজীবী সুখময় চক্রবর্তী ইত্তেফাককে বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরীতে দরিদ্র শিশুদের পুনর্বাসনে পর্যাপ্ত সুযোগ নেই বলেই তারা নানা ধরনের বিপজ্জনক শ্রমে যুক্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, চট্টগ্রাম মহানগরীতে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ শিশু বিভিন্ন সেক্টরে কাজ করছে। এসব শিশুকে সাধারণ ও কর্মমুখী শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে তাদের ভবিষ্যত্ নির্মাণের দায়িত্ব রাষ্ট্রের থাকলেও সে দায়িত্ব পালিত হচ্ছে না।
