n সুমন্ত গুপ্ত
ডান হাতের ওপর মাথা রেখে পা টান করে শুয়ে আছেন গৌতম বুদ্ধ! খোলা চোখে পৃথিবীর সব প্রাণীর প্রতি সুদৃষ্টি রাখছেন তিনি। চোখের দিকে তাকালে মনে হবে যেন আশীর্বাদ দিচ্ছেন। এই অপরূপ দৃশ্য দেখতে হলে আপনাকে যেতে হবে কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলার উত্তর মিঠাছড়ি গ্রামের বৌদ্ধবিহারে।
আমি আর আমার ভ্রমণসঙ্গীর আজ দ্বিতীয় দিন কক্সবাজারে। ঘড়ির কাঁটায় তখন ভোর ৫টা। সানন্দার ডাকাডাকির কারণ আমাকে ঘুম থেকে উঠতেই হলো। উঠেই চলে গেলাম সমুদ্রসৈকতে। সেখানে ঘণ্টা দুয়েক কাটিয়ে ফিরে এলাম আমাদের অস্থায়ী নিবাসে। প্রাতঃরাশ শেষ করতেই খাবারের টেবিলে সানন্দার প্রশ্ন, ‘আজ কোথায় যাব আমরা?’ বললাম, ‘আমিও ভাবছি, আজ কোথায় যাওয়া যায়? এক কাজ করা যেতে পারে, এখানকার লোককের কাছ থেকেই জেনে নিই কোথায় যাওয়া যেতে পারে আজ।’ একজনের কাছে জানতে চাইলাম, ‘ভাই, আপনাদের শহরে এসেছি বেড়াতে। নতুন কোথায় ঘুরতে যাওয়া যায় বলুন তো?’ হাসি মুখে বললেন, ‘হিমছড়ি কি গিয়েছেন?’ বললাম, ‘গতকালই ঘুরে এসেছি।’ পরে বললেন, ‘ডুলহাজরা সাফারি পার্কে?’ বললাম, ‘তাও গিয়েছি।’ বেচারা একটু চিন্তার মধ্যেই পড়ে গেলেন। বললেন, ‘তাহলে আপনি রামু উপজেলা অবস্থিত ‘ভুবন শান্তি ১০০ সিংহ শয্যা গৌতম বুদ্ধ মূর্তি’ দেখে আসেন। ভালো লাগবে।’ বললাম, ‘ভালোই বলেছেন। পেপারে পড়েছি এই সিংহ শয্যা গৌতম বুদ্ধ মূর্তি খবর। কিন্তু সৌভাগ্য হয়নি দেখার। ঠিকানাটা আমার পাইলট মহোদয়কে (গাড়ির ড্রাইভার) একটু বুঝিয়ে বলেন, যেন আমরা সহজেই পৌঁছে যেতে পারি। এদিকে ভেবেছিলাম সব আইটেম চেখে দেখবো কিন্তু আর খেতে ইচ্ছা করছিলো না। আমরা ভ্রমণ গন্তব্যের পানে যাত্রা শুরু করলাম। স্বল্প সময়ের মধ্যে আমরা এসে পৌঁছালাম রামুতে। দেখতে পেলাম বড় সাইনবোর্ডে লেখা আছে ‘ভুবন শান্তি ১০০ সিংহ শয্যা গৌতম বুদ্ধ মূর্তি’। এগিয়ে চললাম। বেশ ভালোই লাগছিল পথ চলতে, কিন্তু কিছু দূর যাওয়ার পর ঘটল বিপত্তি। সামনে ব্রিজ ভাঙা। তাই আর গাড়ি নিয়ে এগিয়ে যাওয়া যাবে না। অগত্যা গাড়ি থেকে নেমে পদব্রজে এগিয়ে চললাম। চার-পাঁচ মিনিট হাঁটার পর আমরা এসে পৌঁছালাম কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে। শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ। প্রবেশদ্বারে জুতা রেখে নগ্ন পায়ে এগিয়ে চললাম সিঁড়ি বেয়ে। প্রায় শতাধিক সিঁড়ি পেরিয়ে পৌঁছালাম ‘ভুবন শান্তি ১০০ সিংহ শয্যা গৌতম বুদ্ধ মূর্তি’র কাছে। গৌতম বুদ্ধ মূর্তি দেখে চোখ জুড়িয়ে গেল। গৌতম বুদ্ধ যেনও খোলা চোখে পৃথিবীর সব প্রাণীর প্রতি সুদৃষ্টি রাখছেন। চোখের দিকে তাকালে মনে হবে যেন আশীর্বাদ দিচ্ছেন। কিছু সময় দাঁড়িয়ে থাকলাম। কথা হলো ওই মন্দিরের এক ভিক্ষুর সঙ্গে। তিনি বললেন, ‘২০০৬ সালে সোনালি রঙের মূর্তিটি একেবারেই ব্যক্তিগত উদ্যোগে তৈরির কাজ শুরু করেন শ্রীমত্ করুণা শ্রীভিক্ষু। ২০০৯ সালে নির্মাণ কাজ শেষ হয়। মায়ানমার থেকে আসা দক্ষ একজন শিল্পীর সঙ্গে নিজেই স্থপতি হিসেবে কাজ করেন তিনি। করুণাশ্রী ভিক্ষু প্রায় দুই একর জায়গায় ২০০২ সালে বিমুক্তি বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্র বৌদ্ধবিহারটি প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর মূর্তিটি তৈরির পরিকল্পনা মাথায় আসে তার।’ আমরা গৌতম বুদ্ধ মূর্তির পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলতে লাগলাম। পরে গেলাম পাশের গৌতম বুদ্ধের মন্দিরে। সেখানে গৌতম বুদ্ধকে দর্শন করে এগিয়ে গেলাম সামনের দিকে। যখন বের হয়ে যাব, তখন এক ভিক্ষু আমাদের পিছন থেকে ডাকতে লাগল। বলল, ‘প্রসাদ খেয়ে যান আপনারা।’ এমনিতেই খিচুরি আমার পছন্দের খাবার, অন্যদিকে ক্ষুধাও লেগেছে তাই আর না বললাম না। খাওয়া শেষে বেরিয়ে এলাম। এই এলাকাটায় সবুজের ছড়াছড়ি। বলা যায়, বন-পাহাড়-সমতলের মিলনমেলা যেন। প্রায় কোটি টাকা খরচে নির্মিত মূর্তিটি দেখতে শ্রীলঙ্কা, বার্মা, চীন, জাপান, থাইল্যান্ড, নেপাল, ভুটান, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়াসহ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী দেশের উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সাধারণ পর্যটকেরা নিয়মিত আসেন এখানে।
যাবেন কিভাবে :এই ‘ভুবন শান্তি ১০০ সিংহ শয্যা গৌতম বুদ্ধ মূর্তি’ দেখতে আপনাকে যেতে হবে কক্সবাজার। ঢাকা থেকে বাস ভাড়া ৮০০ থেকে ২২০০ টাকা। তাই দেশের যে প্রান্তেই থাকুন প্রথমেই চলে আসুন কক্সবাজার। কক্সবাজার জেলা সদর থেকে সিএনজি ও ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা ও মিনিবাস যোগে রামু থানার উত্তর মিঠাছড়িতে এলেই পাওয়া যাবে বৌদ্ধবিহারটি। রাবার বাগান স্টেশন থেকে সোজা পশ্চিমে (চা বাগান) এই বৌদ্ধবিহারটি অবস্থিত। কক্সবাজার শহর থেকে ট্যাক্সি ও ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা বা টমটম নিয়ে যেতে পারেন বৌদ্ধবিহারে। ভাড়া হবে জনপ্রতি ৪০ টাকা। আর রিজার্ভ গেলে ভাড়া পড়বে ২০০-২৫০ টাকা।
