কুমিল্লার গোমতী নদীর কমপক্ষে দেড়শ পয়েন্ট দিয়ে ড্রেজার লাগিয়ে দিনে-রাতে অবৈধভাবে বালু ও মাটি উত্তোলন করে বিক্রি করছে প্রভাবশালীরা। এতে এককালের স্রোতঃস্বিনী গোমতী নদী একদিকে যেমন নাব্য হারিয়ে প্রাণহীন হয়ে পড়ছে, অন্যদিকে মাটি-বালুবাহী ট্রাক-ট্রাক্টরের বেপরোয়া চলাচলের কারণে নদীরক্ষা বাঁধ ক্ষত-বিক্ষত হয়ে হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। মাটি ও বালু দস্যুদের আগ্রাসনে পড়ে দিনে দিনে গোমতী নদী যৌবন হারালেও রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় এ নদীকে পুঁজি করে রাতারাতি শূন্য থেকে বিলাসবহুল বাড়ি-গাড়ি ও অঢেল ধন-সম্পদের মালিক হয়েছেন অনেকেই। এতে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)-কুমিল্লা সূত্রে জানা যায়, গোমতী নদীর পানি প্রবাহের উত্পত্তিস্থল ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের অমরপুর, উদয়পুর, সোনামুড়া নামক স্থানের পাহাড়ি বিভিন্ন এলাকা। এটি কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার কটকবাজার সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে জেলার বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া, দেবিদ্বার, মুরাদনগর, তিতাস ও দাউদকান্দি উপজেলা দিয়ে আঁকাবাঁকা প্রবাহিত হয়ে মেঘনা নদীতে মিলেছে। বাংলাদেশ অংশে এ নদীর দৈর্ঘ্য ৮৩ কিলোমিটার এবং নদীর ডান তীরে ৪১ কিলোমিটার ও বাম তীরে ৩৪ দশমিক ৭৫ কিলোমিটার বন্যা ব্যবস্থাপনা বাঁধ রয়েছে। বাঁধের নদী অংশের ভূমিতে বিভিন্ন প্রজাতির ফলদ-বনজ গাছ-গাছালি রয়েছে এবং শুষ্ক মৌসুমে কৃষকরা নদী তীরে ধান, শাক-সবজি ও বিভিন্ন ফসলের আবাদ করছে। এ ছাড়া নদীর বাঁধ অভ্যন্তরে গড়ে উঠেছে অনেক ঘর-বাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ নানা স্থাপনা।
নদীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ও স্থানীয় লোকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, যখন যেই দল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকে তখন সেই দলের স্থানীয় নেতাদের ছত্রচ্ছায়ায় সিন্ডিকেট করে প্রভাবশালীরা এ নদীর বালু ও মাটি অবৈধভাবে বিক্রি করছে। জেলার আদর্শ সদর উপজেলার চান্দপুর, কাপ্তানবাজার, পালপাড়া, আলেখারচর, আমতলী, নিশ্চিন্তপুর, টিক্কারচর, ছত্রখিল, রত্নাবতি, সুবর্ণপুর, গোলাবাড়ী, বুড়িচং উপজেলার কংশনগর, বাবুর বাজার, কামালখাড়া, বালীখাড়া, শিমলাইল খাড়া, কাড়ার খাড়া, কাহেতরা, পূর্বহারা, রামনগর, নানুয়ার বাজার, মিথিলাপুর, বাহেরচর, শ্রীপুর, গোবিন্দপুর, কোমাল্লা, মালাপাড়া, মনোয়ারপুর, হাসনাবাদ, রামচন্দনপুর, কুসুমপুর, এবদারপুর, বাজেহুরা, মিরপুর, দেবিদ্বার উপজেলার জাফরগঞ্জ, কালিকাপুর, খলিলপুর, চরবাকর, লক্ষ্মীপুর, বারেরারচর, হামলাবাড়ি, বালিবাড়ি, পুরাতন বাজার, বড় আলমপুর, মুরাদনগর উপজেলার কোম্পানীগঞ্জ, দক্ষিণ ত্রিশ, উত্তর ত্রিশ, মালিশাইল, মুরাদনগর সদর, ধামঘর, ভুবনঘর, বাখরাবাদ, জাহাপুর, সুবিলাচর, তিতাস উপজেলার ঘোষকান্দি, দাসকান্দি, আসমানিয়া, খানেবাড়ী, কাউরিয়াচর, দাউদকান্দি উপজেলার মেঘনা-গোমতী সেতুর নিচে, দোনারচর, চেঙ্গাকান্দি, নন্দনপুর, কৃষ্ণপুর, নুরপুর, দৌলতপুর, লালপুর, চর রায়পুর, গৌরীপুর, জিয়ারকান্দিসহ নদীর কমপক্ষে দেড়শটি স্পট দিয়ে বালু ও মাটিদস্যু চক্র বেশ সক্রিয়।
নদীর দাউদকান্দি উপজেলা এলাকার অন্তত ২০টি স্পট দিয়ে গোমতীর বালু ও মাটি লুটে নিচ্ছে একটি সিন্ডিকেট। এ ছাড়া ওই উপজেলার চেঙ্গাকান্দি এলাকায় গোমতী নদীর বিশাল চর ভরাট করে দখলে রেখেছেন স্থানীয় এক প্রভাবশালী। এভাবে বালু ও মাটিদস্যু চক্রের কবলে পড়ে গোমতী নদীর ওপর নির্মিত বিভিন্ন স্থানের অন্তত ১০টি ব্রিজ এবং নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ হুমকির মুখে পড়েছে। বালু ও মাটি বোঝাই ট্রাক ও ট্রাক্টরের বেপরোয়া চলাচলের কারণে প্রতিরক্ষা বাঁধ ক্ষত-বিক্ষত হয়ে বেহালে পরিণত হয়েছে। এতে বর্ষা মৌসুমে বাঁধ ভেঙে নদীর দুই পাশের লাখো মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন নদীপাড়ের অনেক বাসিন্দা।
আদর্শ সদর উপজেলার চান্দপুর এলাকার আবুল কালাম আজাদ, ফখরুল আলম, আবদুর রাজ্জাকসহ বিভিন্ন পেশার অন্তত ১৫ জন জানান, পাউবোর কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর সঙ্গে যোগসাজশে স্থানীয়ভাবে রাজনৈতিক প্রভাবশালী চক্র গোমতী নদীর বিভিন্ন এলাকায় বালু উত্তোলন ও অবৈধভাবে মাটি কেটে বিক্রি করছে। বিগত সময়ে বিভিন্ন সরকারের আমলে অবৈধভাবে নদীর বালু ও মাটি বিক্রি করে শূন্য থেকে রাতারাতি কোটি কোটি টাকা, অঢেল সম্পদ, বিলাসবহুল বাড়ি-গাড়ির মালিক হয়েছে অনেকে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাউবো কুমিল্লার একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী জানান, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও মাটি কাটা বন্ধ করে নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ রক্ষার জন্য পাউবোর পক্ষ থেকে নদী সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা এবং জিডি করেও এসব কর্মকাণ্ড ঠেকানো যাচ্ছে না। উল্টো বিভিন্ন সময়ে সংঘবদ্ধ চক্রের দ্বারা হুমকির শিকার হয়ে পাউবোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা থানায় জিডি করেছেন। তারা আরো জানান, সংঘবদ্ধ চক্র মাটি আনা-নেওয়ার কাজে নম্বরবিহীন ট্রাক্টর ব্যবহার করে থাকে, এ কারণে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কুমিল্লা শাখার সভাপতি ডা. মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, মাটি ও বালুদস্যুদের আগ্রাসনে পড়ে গোমতী নদী দিনে দিনে নাব্য হারিয়ে পানিহীন ও সরু খালের মতো হয়ে পড়ছে। বিলুপ্ত হয়ে পড়ছে জলজ প্রাণি ও মাছ। নদীকেন্দ্রিক জেলেদের জীবন-জীবিকাও হয়ে পড়েছে বিপর্যস্ত। এতে পরিবেশ বিপর্যয়েরও আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কুমিল্লা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আবদুল লতিফ বলেন, নদীর মাটি কাটা ও বাঁধ ধ্বংসের বিষয়টি জেলা প্রশাসককে জানানো হয়েছে। লোকবলের অভাবে সবসময় তদারকি করা যাচ্ছে না।
কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মো. আবুল ফজল মীর জানান, গোমতী নদী থেকে বালু উত্তোলন ও মাটি কাটা বন্ধে বিভিন্ন সময়ে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে দণ্ড প্রদান করা হয়েছে এবং এ কার্যক্রম অব্যাহত আছে।
