রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে শুধু আনুষ্ঠানিকতা সর্বস্ব শ্রদ্ধাজ্ঞাপন নয়, তার দিক-নির্দেশনায় মানবমুক্তির পথের এ দিশারীকে সম্মিলিতভাবে অনুসরণ করাই হবে তাঁকে প্রকৃত শ্রদ্ধা জানানো। তার কর্মকে উপলব্ধি করে জড়িয়ে নিতে হবে জীবনের পথচলায়। গতকাল রবিবার নানা অনুষ্ঠানে গানে, কথায়, কবিতায় কবিগুরুকে স্মরণ করার পাশাপাশি এ কথাই উচ্চারিত হলো সবার মনে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী জীবন দর্শন, মানবতাবাদ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে সমাজে প্রতিষ্ঠা এবং রবীন্দ্র চর্চাকে সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেয়ার অঙ্গীকারও ব্যক্ত করা হয় এসব অনুষ্ঠানে।
ছায়ানটে ‘আমার রবীন্দ্রনাথ’
‘আমি কী এমন লোক যে আমার পছন্দের গান মানুষকে ডেকে শোনাতে হবে, তারপরেও তারা যে ভেবেছেন এ কথা এটা আমার জন্যে আনন্দের, সম্মানের’– বিনয় করে বলছিলেন প্রফেসর ইমেরিটাস আনিসুজ্জামান। ছায়ানটের রবীন্দ্র সঙ্গীত উত্সবের দ্বিতীয় দিনে ভিন্নধর্মী এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ছায়ানট ‘আমার রবীন্দ্রনাথ’: অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের কথার সাথে তাঁর প্রিয় গানের উপস্থাপনা। রবীন্দ্রনাথের গান কেন ভাল লাগে এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, হিন্দুস্তানি সঙ্গীতের সঙ্গে বাংলা গানের প্রধান পার্থক্য হিন্দুস্তানি গান সুরপ্রধান আর বাংলা গান বাণীপ্রধান। রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলেছেন, আমি ধ্রুপদী গানের খাঁচাটা ভেঙেছি, বাসাটা রেখেছি।
তার কথার পরে একে একে প্রিয় মানুষের প্রিয় গান গেয়ে শোনান দেশের জনপ্রিয় রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পীরা। এটিএম জাহাঙ্গীর গেয়ে ওঠেন ‘ও আমার দেশের মাটি’। এরপরে লাইসা আহমেদ লিসা শোনান ‘তোমারেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা’, সত্যম কুমার দেবনাথ শোনান ‘জগতে আনন্দযজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ’। এ পর্যায়ে আবারো আনিসুজ্জামান। তার কথার পরে ইলোরা আহমেদ শুক্লা গেয়ে শোনান ‘হূদয়েনন্দনবনে’, সুতপা সাহা শোনান ‘শাওন গগনে ঘোর ঘনঘটা’, সেঁজুতি বড়ুয়া ‘পুষ্প বনে পুষ্প নাই আছে অন্তরে’, সেমন্তী মঞ্জুরী ‘অধরা মাধুরী ধরেছি ছন্দোবন্ধনে’, মহিউজ্জামান চৌধুরীর ‘যেতে যেতে একলা পথে নিবেছে মোর বাতি’।
দ্বিতীয় দিনের অনুষ্ঠান শুরু হয় ছায়ানটের শিল্পীদের সমবেত কণ্ঠে ‘ধ্বনিল আহ্বান মধুর গম্ভীর’ এ গানের মধ্য দিয়ে। ‘তোমার আনন্দ ওই এলা দ্বারে’ সম্মেলক কণ্ঠে এ গানে নৃত্য পরিবেশন করে শিল্পীরা। একক কণ্ঠে গান গেয়ে শোনান সৈকত মুখার্জী, মমি মঞ্জরী চৌধুরী, দীপ্তি দাশ, অভয়া দত্ত, ঝুমা খন্দকার, সুমনা বিশ্বাস প্রমুখ। রাম বসুর কবিতা ‘ভাষণ’ আবৃত্তি করেন জহিরুল হক খান। পরে জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় অনুষ্ঠান।
এবি ব্যাংক-চ্যানেল আই রবীন্দ্রমেলা
চ্যানেল আই আয়োজিত ‘রবীন্দ্র মেলা’য় এ বছর আজীবন সম্মাননা পেয়েছেন শিক্ষাবিদ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ও রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী তপন মাহমুদ। তাদের হাতে উত্তরীয়, ক্রেস্ট ও সম্মাননা চেক তুলে দেন চ্যানেল আই এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর, পরিচালক ও বার্তা প্রধান শাইখ সিরাজ, আইএফআইসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহ আলম সারোয়ার, এবি ব্যাংকের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (মার্কেটিং) মশিউর রহমান চৌধুরী, কবি আসাদ চৌধুরী প্রমুখ। অনুষ্ঠান শুরু হয় ক্যামব্রিয়ান স্কুল এন্ড কলেজের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে নৃত্য পরিবেশনের মাধ্যমে। বিকালে চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে ‘রবীন্দ্র মেলা’ ১৬ এর উদ্বোধনী পর্বে মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন চ্যানেল আই পরিচালনা পর্ষদ সদস্যবৃন্দ, নাট্য ব্যক্তিত্ব আতাউর রহমান, রামেন্দু মজুমদার, কবি হাবিবুল্লাহ সিরাজী, সৈয়দ সালাহউদ্দিন জাকি প্রমুখ। মেলায় এসেছিলেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান, লায়লা হাসানসহ বিশিষ্টজনরা। অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করেন সাদি মহম্মদ, তপন মাহমুদ, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, আজিজুর রহমান তুহিন প্রমুখ। মেলায় ‘প্রিয় রবীন্দ্রনাথের প্রেমের গান’ নামে রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার কণ্ঠে একটি অডিও সিডির মোড়ক উন্মোচন করেন মেলায় আগত অতিথিরা। ড. আনিসুজ্জামান নির্বাচিত এ সিডিতে রবীন্দ্রনাথের ১০টি গান রয়েছে।
উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী
রবীন্দ্র-জয়ন্তী পালন করেছে উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। গতকাল সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ আয়োজনের শুরুতেই উদীচীর ঢাকা মহানগর সংসদের শিল্পীরা গেয়ে শোনান ‘আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ সত্য সুন্দর’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘সভ্যতার সঙ্কট’ প্রবন্ধটি পাঠ করেন অমিত রঞ্জন দে। এরপর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিল্প-সাহিত্য-রাজনীতি-অর্থনীতি ও তার জীবনের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করেন শিক্ষাবিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কাজল ব্যানার্জী, ডা. শাহীন রহমান, উদীচীর সাধারণ সম্পাদক প্রবীর সরদার, অধ্যাপক এ এন রাশেদা প্রমুখ। সভাপতিত্ব করেন কাজী মোহাম্মদ শীশ।
সঙ্গীত পরিবেশন করেন কুমারেশ নাগ, সুরাইয়ার পারভীন, বিপ্লব রায়হান, বর্ণালী নাগ, ফরহাদ, সন্দীপা বিশ্বাস প্রমুখ। আবৃত্তি করেন সুব্রত ভট্টাচার্য্য, জুয়েল, সাব্বির সৌরভ প্রমুখ।
শিল্পকলা একাডেমি
বহুমাত্রিক আয়োজন ছিল শিল্পকলা একাডেমিতে। গতকাল সন্ধ্যায় একাডেমির জাতীয় চিত্রশালা মিলনায়তনে ‘রাজপুত্তুর’ ও ‘মাধো’ নামের দুইটি রবীন্দ্র শিশুতোষ স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের উদ্বোধনী প্রদর্শনী হয়। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে একাডেমির প্রযোজনায় নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্র দুটি। প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি সচিব আক্তারী মমতাজ, আহমদ রফিক ও চলচ্চিত্রকার মোরশেদুল ইসলাম। একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর সভাপতিত্বে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন ‘রাজপুত্তুর’ চলচ্চিত্রের পরিচালক টোকন ঠাকুর এবং ‘মাধো’ চলচ্চিত্রের পরিচালক সুমনা সিদ্দিকী। একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে ছিল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এতে ‘আগুনের পরশমনি ছোঁয়াও প্রাণে’ ও ‘রাঙিয়ে দিয়ে যাও’ গানের সুরে সমবেত নৃত্য পরিবেশন করে সৃষ্টি কালচারাল সেন্টার। সমবেত নৃত্য পরিবেশন করে নৃত্যালোক, সুকন্যা নৃত্যাঙ্গন ও দিব্য সাংস্কৃতিক সংগঠন। সমবেত সঙ্গীত পরিবেশন করে সঙ্গীত দল উত্তর। একক কণ্ঠে গান শোনান কণ্ঠশিল্পী ফাহিম হোসেন চৌধুরী, আজিজুর রহমান তুহিন, মহাদেব ঘোষ, মিতা হক, রোকাইয়া হাসিনা, জলি রহমান, নার্গিস চৌধুরী, হিমাদ্রী শেখর, সুষ্মিতা আহমেদ বর্ণা ও মহিউদ্দিন চৌধুরী ময়না। রবীন্দ্র সৃষ্টি থেকে পাঠ করেন জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় ও ডালিয়া আহমেদ।
রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সংস্থা
শেষ হলো রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী সংস্থার সপ্তবিংশ জাতীয় রবীন্দ্র উত্সব। সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগারের শওকত ওসমান স্মৃতি মিলনায়তনে গতকাল সমাপনী দিনের আয়োজন শুরু হয় সংস্থার শিল্পীদের সমবেত কণ্ঠে ‘হে নূতন দেখা দিক আর-বার’ ও ‘ঐ মহামানব আসে’ গান দুটির মধ্য দিয়ে। রবীন্দ্রসঙ্গীতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রবীন্দ্র সঙ্গীতশিল্পী পাপিয়া সারোয়ারকে বিশেষ সম্মাননা দেয়ার হয়। সাগরিকা জামালী গেয়ে শোনান ‘প্রভু আজি তোমার’, মাহজাবীন রহিম মৈত্রী গাইলেন ‘মধুর তোমার শেষ না পাই’, দিনাত ফেরদৌস ‘সে তো আমি চাই’, শফিকুর রহমান খান ‘লিখন তোমার ধুলায় হয়েছে ধূলি’। রবীন্দ্রনাথের বিভিন্ন পর্যারের আরো গান পরিবেশন করেন- রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, তপন মাহমুদ, সাদী মহম্মদ, আমিনা আহমেদ, পাপিয়া সারোয়ার, বুলা মাহমুদ, তানজিমা তমা, শিমু দে, আবদুল ওয়াদুদ, হিমাদ্রি শেখর, পিযূষ বড়ুয়া, ইপ্সিতা মজুমদারসহ আরও অনেকে। দলীয় সঙ্গীত পরিবেশন করে বৈতালিক ও রবিরাগ। রবীন্দ্রনাথের রচনাবলী থেকে পাঠ করে ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রয়াত রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী কলিম শরাফীর ৯৩ জন্মদিন উপলক্ষে সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে মানুষের ঢল
কুষ্টিয়া প্রতিনিধি জানান, তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী দিনে গতকাল কুঠিবাড়িতে মানুষের ঢল নামে। ভক্ত-অনুরাগী দর্শক-শ্রোতার আগমনে কুঠিবাড়ি চত্বর মুখরিত হয়ে ওঠে। প্রধান অতিথি ছিলেন খুলনা বিভাগীয় কমিশনার আব্দুস সামাদ। বিশেষ অতিথি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলতাফ হোসেন ও পুলিশ সুপার প্রলয় চিসিম। জেলা প্রশাসক সৈয়দ বেলাল হোসেনের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন অধ্যাপক ড. মাসুদ রহমান, সিভিল সার্জন ডাক্তার নাজমুল ইসলাম, গোলাম মহসিন, কুমারখালী ইউএনও সালেহা আক্তার, আলম আরা জুঁই প্রমুখ। দুপুরে দ্বিতীয় পর্বে শুরু হয় রবীন্দ্র সঙ্গীতের জলসা। জেলার ৪০টি সাংস্কৃতিক সংগঠনের শিল্পীদের পরিবেশনায় গান, কবিতা আবৃতি ও নাট্যানুষ্ঠান উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের কাছে দারুণ উপভোগ্য হয়ে উঠে। রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকীতে কুষ্টিয়া শহরের মিলপাড়ায় অবস্থিত “টেগর লজ” এ পৌরসভার উদ্যোগে পৃথক আলোচনাসভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এ অনুষ্ঠানে কুষ্টিয়া পৌরসভার মেয়র আনোয়ার আলী প্রধান অতিথি ছিলেন। কুঠিবাড়ি চত্বরে বসে গ্রামীণ মেলা। অনুষ্ঠান উপভোগ করার জন্য রৌদ্রের তাপ উপেক্ষা করে কুঠিবাড়ি চত্বরে ছিল জনতার ঢল।
পতিসর কাছারি বাড়িতে
নওগাঁ প্রতিনিধি ও আত্রাই সংবাদদাতা জানান, আত্রাই উপজেলার মনিয়ারী ইউনিয়নের পতিসরে কবির স্মৃতিবিজড়িত কাছারি বাড়িতে দেবেন্দ্র মঞ্চে জাতীয় সঙ্গীত পরিবশেন, ফেস্টুন ও পায়রা উড়িয়ে প্রধান অতিথি হিসেবে উত্সব উদ্বোধন করেন জাতীয় সংসদের হুইপ শহীদুজ্জামান সরকার এমপি। অনুষ্ঠানে কবির ভক্ত, অনুরাগী, গবেষক, শিল্পী ও হাজারো মানুষের ঢল নামে। কাছারি বাড়ি প্রাঙ্গণে বসেছে রবীন্দ্র মেলা। এলাকায় উত্সবের আমেজ। জেলা প্রশাসক ড. মো: আমিনুর রহমানের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন ইসরাফিল আলম এমপি, পুলিশ সুপার মোঃ মোজাম্মেল হক, ড. মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম, ওহিদুর রহমান, যতীন্দ্রনাথ ভাদুরী, হাসান আজিজুল হক, সিভিল সার্জন ডা. একেএম মোজাম্মেল হক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মাজেদা ইয়াসমিন, অতিরিক্ত জেলা রাজস্ব কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম, হারুন অল রশীদ, আত্রাই উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবাদুর রহমান, রানীনগর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এসএম আল ফারুক জেমস, আত্রাই উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোকলেছুর রহমান প্রমুখ। আত্রাই, রানীনগর ও নওগাঁর শিল্পীদের অংশগ্রহণে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়।
