পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন এবং সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী রক্ষায় এ মাসেই চালু হচ্ছে স্পেশাল মনিটরিং এ্যান্ড রিপোর্টিং টুল স্মার্ট পেট্রোলিং ব্যবস্থা।
চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে চালু হওয়ার কথা থাকলেও বন বিভাগ আশা করছে সুন্দরবন সুরক্ষায় মে মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে স্মার্ট পেট্রোলিং ব্যবস্থা চালু হবে। ইউনেস্কো ঘোষিত সুন্দরবনে ৩শ’ প্রকারের পাখি, ৪শ’র উপরে মাছ ও জলজ প্রাণী, ৪৯ প্রকারের স্তন্যপায়ী প্রাণী, ৮৭ প্রকারের সাপ, ১৪ প্রকারের উভচর প্রাণী এবং ৫শ’ জাতের গাছ রয়েছে। সুন্দরবনের ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার জুড়ে থাকা বাঘ, ডলফিন, কুমির, গিরগিটিসহ সকল বন্য প্রাণী এবং সুন্দরবনের গাছ-গাছড়া-লতাগুল্ম রক্ষায় সর্বাধুনিক পদ্ধতি হিসেবে স্মার্ট পেট্রোলিং সিস্টেম চালু হচ্ছে।
বন বিভাগের ব্যবস্থাপনায় বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে স্ট্রেইনদেনিং রিজিওনাল কো-অপারেশন ফর ওয়াইল্ড লাইফ প্রটেকশন (এসআরসিডব্লিউপি) প্রকল্পের আওতায় এই স্মার্ট পেট্রোলিং ব্যবস্থা চালু হচ্ছে। বিশ্বের ৩০টি দেশের ১৪০টি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বর্তমানে স্মার্ট পেট্রোলিং ব্যবস্থা চালু আছে।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ বাগেরহাটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. সাইদুল ইসলাম জানান, স্মার্ট পেট্রোলিং কোন নর্মাল পেট্রোলিং না। এটা হচ্ছে ডাটা বেইস নির্ভর পেট্রোলিং ব্যবস্থা যেখানে জিপিএস (গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম) থাকবে।
সফটওয়ার ডিভাইস ট্রাকিং-এর মাধ্যমে অপরাধ প্রবণ এলাকা এবং অপরাধীদের শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এ ক্ষেত্রে সেলফোন নেটওয়ার্ককে ব্যবহার করা হবে। এ টহল টিমের সঙ্গে অন্য ডিসিপ্লিনের লোকও থাকবে। টহল টিমের সদস্যরা ভিন্ন এলাকার লোক হবে। এই টিমে বন বিভাগের ক্যাম্পের কোন সদস্য থাকবে না। টহলরত অবস্থায় যা দেখবে তা’ ডাটা এন্ট্রি এবং সেভ হবে। এই ডাটা বিভাগীয় বন অফিসে তারা প্রেরণ করবে। অপরাধী ধরা পড়লে বন বিভাগের ক্যাম্পের কাছে হস্তান্তর করবে। এভাবে ১৫ দিন একটা টিম টহল করার পর আরেকটা টিম টহল করবে।
তিনি আরো জানান, এ পদ্ধতি সুন্দরবনে অপরাধ দমন এবং অপরাধী শনাক্ত করার ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে বন বিভাগ। সুন্দরবনে আগুন লাগা, বৃক্ষ নিধন, খালে বিষ দিয়ে মাছ মারা, বাঘ পাচার, অন্যান্য বন্যপ্রাণী হত্যা দমন এবং কয়লা-সার-তেল ভর্তি কার্গো-জাহাজ ডুবি রোধেও স্মার্ট পেট্রোলিং ব্যবস্থা বিশেষ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে বন বিভাগ।
সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জ পিপল্স ফোরামের সভাপতি মো. ওলিয়ার রহমান বলেন, স্মার্ট পেট্রোলিং-এর কথা জানতে পেরেছি। আশা করছি স্মার্ট পেট্রোলিং-এর মাধ্যমে সুন্দরবন নিরাপদে থাকবে এবং বন্যপ্রাণী হত্যা ও পাচার বন্ধ হবে।
ভিলেজ টাইগার রেসপন্স টিম ভিটিআর-এর সদস্য আব্দুল মালেক হাওলাদার এবং কম্যুনিটি পেট্রোলিং গ্রুপ’র সদস্য মো. এনামুল সরদার বলেন, আমরা বন বিভাগের সঙ্গে থেকে সুন্দরবন রক্ষায় কাজ করছি। বাঘসহ কোন বন্যপ্রাণী লোকালয়ে আসলে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে তাকে আবার বনে ফিরিয়ে দেই। স্মার্ট পেট্রোলিং ব্যবস্থা চালু হলে আশা করছি বাঘ পাচারসহ সুন্দরবনের ক্রাইম বন্ধ হবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বাপা মোংলার সাধারণ সম্পাদক তানজিম হোসেন মুকুল বলেন, স্মার্ট পেট্রোলিং ব্যবস্থায় সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। বন্যপ্রাণী রক্ষায় এ পদ্ধতি খুবই কার্যকর। কিন্তু দুর্নীতিগ্রস্ত বন বিভাগ দিয়ে যদি স্মার্ট পেট্রোলিং পরিচালনা করা হয় তাহলে ভাল কোন ফল আসবে বলে মনে হয় না।
সুুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মো. বেলায়েত হোসেন জানান, সুন্দরবন রক্ষায় স্মার্ট পেট্রোলিং-এ তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে ইউএসএইড। স্মার্ট পেট্রোলিং ব্যবস্থার মহড়া অনুষ্ঠান গত ৯-১০ মার্চ সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জ এলাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এবং মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্ণিকট উপস্থিত ছিলেন। তারা মহড়া দেখে স্মার্ট পেট্রোলিং-এর প্রশংসা করেছেন। স্মার্ট পেট্রোলিং-এ প্রতিটি টিমে ১৫ জন সদস্য এবং বোট থাকবে বলে জানা গেছে।
সংশয়-সন্দেহ-অবিশ্বাস থাকার পরও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে অপার লীলা ভূমি, রহস্যে ঘেরা সুন্দরবনের নিরাপত্তা এবং বন্যপ্রাণী রক্ষায় স্মার্ট পেট্রোলিং-এর কার্য্যকরী ভূমিকা দেখতে চায় সুন্দরবন প্রেমী মানুষরা।
বাসস।
