বঙ্গোপসাগরে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আগের মতো মাছ মিলছে না। এরমধ্যে বেশ কয়েক প্রজাতির মাছ আহরণের পরিমাণ ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এসব মাছের মধ্যে রয়েছে সাদা রূপচাঁদা, লাক্ষা ও ফাইল্যা মাছ। মাছ আহরণের পরিমাণ কমে যাওয়ার পেছেনে রয়েছে— পানি দূষণ, সারা বছর ইঞ্জিনচালিত জেলে নৌকায় নির্বিচারে অতিরিক্ত মাছ ধরা এবং মাছ আহরণের ক্ষেত্রে নিয়মনীতি মেনে না চলা।
একটি সরকারি সূত্র মতে সমুদ্রে বর্তমানে বার্ষিক মাছ আহরণের পরিমাণ ৬ লাখ ৫৪ হাজার মেট্রিক টন। টেকসই উপকূলীয় ও সামুদ্রিক মত্স্য প্রকল্পের উপ-প্রকল্প পরিচালক অধীর চন্দ্র দাশ ইত্তেফাককে বলেন, বঙ্গোপসাগরে মাছের বৃদ্ধি কমে গেছে। সাগরে অতিরিক্ত ও নির্বিচারে মাছ ধরা নিয়ন্ত্রণে আইন করা হয়েছে। বিধিনিষেধও আরোপ করা হয়েছে। জাহাজ আকৃতির মাছ ধরার ট্রলারের সংখ্যা ২৫৫-এ স্থির রাখা হয়েছে। ২০১১ সালের পর আর কোনো নতুন মাছ ধরার নৌযানকে বঙ্গোপসাগরে মাছ শিকারের জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়নি। এক্ষেত্রে দেশি ট্রলার বা মেকানাইজড মাছ ধরার নৌযানের ক্ষেত্রেও আইন-কানুন রয়েছে। তবে এগুলোর বিরুদ্ধেই নির্বিচারে মাছ ধরার অভিযোগ রয়েছে বলে তিনি জানান। কাঠের তৈরি নৌকাগুলো যাতে অতিরিক্ত ও নির্বিচারে সাগরে মাছ ধরতে না পারে সে জন্য অটোমেটিক আইডেন্টিফায়িং সিস্টেম (এআইএস) চালু করা হবে। তিনি বলেন, টেকসই উপকূলীয় ও সামুদ্রিক মত্স্য প্রকল্পের আওতায় এটি চালু করা হবে। একইসঙ্গে মত্স্য সম্পদ পাহারা দেওয়ার জন্য চেকপোস্টের সংখ্যাও বাড়ানো হবে। চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন উপকূলীয় পয়েন্টে ১৬টি চেকপোস্ট স্থাপন করা হবে। এসব স্থানের মধ্যে রয়েছে— চট্টগ্রাম, টেকনাফ, পেকুয়া, কমলনগর, খুলনা, বাগেরহাট, ভোলা ও পটুয়াখালী। এসব চেকপোস্টের কাজ হবে উপকূল থেকে কতো সংখ্যক মাছ ধরার নৌযান আসা যাওয়া করছে, কি কি মাছ ধরছে, কি পরিমাণ মাছ ধরছে, কি ধরনের জাল ব্যবহার করছে তা পর্যবেক্ষণ করা এবং আইন অমান্যকারীদের শাস্তি প্রদান করা। তিনি বলেন, চট্টগ্রামের পতেঙ্গা ১০ নম্বরে স্থাপিত চেকপোস্টটি বন্দরের কর্ণফুলী টার্মিনাল নির্মাণের কারণে স্থানান্তরিত হয়ে ১১ নম্বরে গেছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ সেখানে চেকপোস্টটি স্থায়ীভাবে তৈরি করে দেবে বলে জানিয়েছে। তিনি বলেন, একটি বড় মাছ ধরার নৌযান সমুদ্রে মাছ ধরতে গেলে ৫ থেকে ১০ দিন অবস্থান করে। প্রতি অভিযানে ১০০ মণ পর্যন্ত মাছ আহরণ করে থাকে। মেকানাইজড বোট বা ইঞ্জিনচালিত মাছ ধরার নৌকাগুলো কী পরিমাণ মাছ ধরে তার সুনির্দিষ্ট তথ্য সরকারি খাতায় নেই। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সাদা রূপচাঁদা, লাক্ষা এবং ফাইল্যা মাছের আহরণ আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে বলেই মনে করছি মেকানাইজড বোটগুলো সাগরে অতিরিক্ত ও নির্বিচারে মাছ ধরছে।
অপর একটি সূত্র জানায়, অনুমোদনের বালাই না থাকায় হাজার হাজার ইঞ্জিনচালিত নৌকা সরকারি নিষেধাজ্ঞার সময়েও সমুদ্রে মাছ ধরে। ফলে তারা বিভিন্ন প্রজাতির মাছের পোনা ধরে সেগুলোর বৃদ্ধি ও বংশ বিস্তারের সম্ভাবনা ধ্বংস করে দিচ্ছে। নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইলিশের জাটকা শিকার তার একটি নমুনা।
কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণপাড়ে কর্ণফুলী উপজেলার অধিবাসী ফিশিং বোট মালিক মোহাম্মদ আলী ইত্তেফাককে বলেন, তার জানামতে কান্ট্রি বোট, আইস ট্রলার এবং ফ্রোজেন ট্রলারগুলো বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরে থাকে। তার মধ্যে ইলিশ শিকারের কাজে ব্যবহূত মেকানাইজড বোটসমূহ সারা বছরই মাছ ধরে থাকে। এরা কোনো নিয়মনীতির আলোকে চলে না। এদের মাছ ধরার জন্য কোনো ধরনের সরকারি অনুমতি নিতে হয় না। সব ধরনের ট্রলারই মাছ নিয়ে উপকূলে আসার পর সেখানে অপেক্ষমাণ পার্টির কাছে মাছ মণ দরে বিক্রি করে থাকে। মাছ কিছু যায় কোল্ডস্টোরেজে, কিছু যায় খুচরা বাজারে, বাকি মাছ শুঁটকিপল্লী এবং পোল্ট্রিফিড কারখানায় যায় বলেও তার অভিমত। সাগরে মাছ ধরায় নিয়োজিত ট্রলারগুলোর অনুমতি আছে কি না তা বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে নৌ-বাহিনী ও কোস্ট গার্ডের টহল জাহাজগুলো থেকে পরীক্ষা করা হয়ে থাকে। অনুমতিবিহীন ট্রলারগুলোতে তারা আটক করে থাকে।
সামুদ্রিক মত্স্য দপ্তর চট্টগ্রামের পরিচালক মোহাম্মদ আবুল হাসানাত ইত্তেফাককে বলেন, সম্প্রতি নরওয়েজিয়ান একটি গবেষণা জাহাজ বঙ্গোপসাগরে জরিপ-গবেষণা চালিয়েছে। এই জাহাজটির একটি রিপোর্ট চলতি মার্চ মাসেই পাওয়া যাবে বলে আশা করা যায়। এতে বাংলাদেশের সমুদ্র সীমানায় মাছের বর্তমান মজুদের উপর একটি হাল-নাগাদ তথ্য পাওয়া যাবে। ফলে মাছ ধরার পরিমাণ নির্ধারণের ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে। তিনি বলেন, এই জরিপ গবেষণা একটি চলমান প্রক্রিয়া। বাংলাদেশের গবেষণা জাহাজ আরভি মীনসন্ধানীও সাগরে জরিপ-গবেষণায় রয়েছে। এই জাহাজ থেকেও শিগগির আরো অনেক মূল্যবান তথ্য মিলবে। তিনি বলেন, বঙ্গোসাগরে পরিচালিত অনেক পুরনো জরিপ অনুসারে ৬৭ হাজার ইঞ্জিনচালিত কাঠের দেশি ট্রলার সাগরে মাছ শিকারে নিয়োজিত বলে জানা যায়।
