বরিশালে দেড় যুগেও চিহ্নিত হয়নি ডেঞ্জার জোন

আপডেট : ১৮ মার্চ ২০১৯, ২২:৫৩

শাহীন হাফিজ, বরিশাল অফিস

১৮ বছর আগে উপকূলের নদীর কিছু এলাকা ডেঞ্জার জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। চিহ্নিত এসব ডেঞ্জার জোনে প্রতি বছর সাত মাস (নির্দিষ্ট নৌযান ব্যতিত) সকল প্রকার নৌযান চলাচল নিষিদ্ধ থাকে। গত কয়েক বছরের ন্যায় এবারও সেই পুরনো এলাকাই চলছে প্রশাসনের প্রহরা। অথচ নতুন করে সৃষ্টি হওয়া উত্তাল নদী এলাকায় না জেনেই ছোট ছোট নৌযান চলছে ঝুঁকি নিয়ে। গত দেড়যুগেও উপকূলের নদীপথে জরিপ না হওয়ায় চিহ্নিত হয়নি ডেঞ্জার জোন।

নৌযান চালকরা জানান— চর পড়ে ভরাট হয়ে যাওয়ায় বিআইডব্লিউটিএ’র চিহ্নিত ডেঞ্জার জোনের অধিকাংশ এলাকায় এখন বাড়ি ঘর তৈরি হয়েছে। আর শান্ত অনেক নদীপথ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বহু বছর জরিপ না হওয়ার কারণে যেসব নদী এলাকার গভীরতা বৃদ্ধি পেয়েছে, তুফান বেড়ে উত্তাল রূপ নিয়েছে তা ডেঞ্জার জোন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। ফলে সে সব অশান্ত নদীতে ঝুঁকি নিয়েই যাত্রী পরিবহন বৈধতা পাচ্ছে।

বিআইডব্লিউটিএ’র হাইড্রোগ্রাফি বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক সাইফুর রহমান ইত্তেফাককে জানান, সর্বশেষ ২০০০ সালে জরিপ চালিয়ে ডেঞ্জার জোন এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে। সে অনুযায়ী প্রতি বছর ১৫ মার্চ থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত ৭ মাস চিহ্নিত এলাকায় নৌযান চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকে। এ সব ঝুঁকিপূর্ণ পথে যাত্রী পরিবহনের জন্য বিআইডব্লিউটিসি’র পর্যাপ্ত সি-ট্রাক ও বে ক্রসিং না থাকায় এ সব এলাকার যাত্রীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অবৈধ ছোট নৌযানে চলাচল করে। মেঘনার ডেঞ্জার জোন হিসেবে পরিচিত ভোলার ইলিশা থেকে লক্ষ্মীপুরগামী যেসব নৌযান চলছে তাদের এখন আর উত্তাল মেঘনা পাড়ি দিতে হয় না। শাহাবাজপুর চ্যানেল ও ভোলা সদর উপজেলার ভাঙন কবলিত কাচিয়া ইউনিয়ন এবং দৌলতখান উপজেলার ভবানীপুর ইউনিয়ন যে প্রমত্তা মেঘনায় একসময় বিলীন হয়েছিল সেখানেই কয়েক বছর আগে বিশাল চর জেগে উঠেছে। এ সব ইউনিয়নে ফের বসতি গড়ে উঠেছে। এক সময় শাহবাজপুরের এ চ্যানেলে ছিল শুধুই উত্তাল জলরাশি। ভবানীপুর ও কাচিয়াসহ শাহবাজপুর চ্যানেলের কয়েকটি স্থানে আরো কিছু ছোট-বড় চর পাশাপাশি জেগে ওঠায় ইলিশা- মৌজুচৌধুরীর হাট রুটের সেই ঝুঁকিপূর্ণ নৌপথ এখন শান্ত নৌপথে রূপ নিয়েছে। বিআইডব্লিউটিএ’তে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সর্বশেষ দেড় যুগ আগে জরিপ শেষে ডেঞ্জার জোনে শুধু বে-ক্রসিং ক্ষমতাসম্পন্ন নৌযান চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়। বর্তমানে শুধু ভোলার ইলিশা-মজু চৌধুরীর হাট রুটে বে-ক্রসিং ক্ষমতাসম্পন্ন এমভি পারিজাত এবং এমভি দোয়েল পাখি নামের দুটি বেসরকারি নৌযান চলাচল করছে।

বিআইডব্লিউটিসির বরিশাল দপ্তর সূত্র জানায়, নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকাকালে চারটি রুটে সরকারি চারটি সি-ট্রাকের মাধ্যমে যাত্রী আনা-নেওয়া করা হয়। তবে কয়েক বছর ধরে সি-ট্রাকের চলাচল অনিয়মিত। এবারো নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলেও প্রস্তুতি না থাকায় খিজির-৫ ব্যতিত অপর ৩টি সি-ট্রাক চলাচল শুরু করেনি। এতে তিনটি রুটের যাত্রীদের সমস্যা পোহাতে হচ্ছে। বিআইডব্লিউটিসি’র বরিশাল দপ্তরের উপমহাব্যবস্থাপক সৈয়দ আবুল কালাম আজাদ জানান, খিজির-৭, খিজির-৮ ও শেখ কামাল ডকইয়ার্ডে রয়েছে। তবে শীঘ্রই এ সী-ট্রাক মেরামত শেষে সার্ভিসে আসতে পারবে। যাত্রীরা জানান, একদিকে লঞ্চসহ অন্য সাধারণ নৌযান চলাচল করছে না, অন্যদিকে এবার সি-ট্রাকও দেওয়া হয়নি। এ কারণে গন্তব্যে পৌঁছতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। ভোলার ইলিশা-মজু চৌধুরীর হাট রুটে দুটি বেসরকারি লঞ্চ চলাচল করলেও ভাড়া বেশি নেওয়া হচ্ছে।

পূর্বে দক্ষিণাঞ্চলের ঝুঁকিপূর্ণ রুটে কুতুবদিয়া ও কেয়ারী সিন্দাবাদ যাত্রী পরিবহন করতো। তখন এ দু’টি জাহাজের সাথে ঝুঁকিপূর্ণ রুটে যাত্রী পরিবহনে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতো আরো দু’টি বে-ক্রসিং ক্ষমতাসম্পন্ন এমভি টিপু-৫ ও পানামা-৫। গত কয়েক বছর ধরে এ জাহাজগুলো উপকূলের ডেঞ্জার জোনে যাত্রী পরিবহন করছে না। ফলে ভোলা, লক্ষ্মীপুর, ইলিশা, মজু চৌধুরীর হাট, আলেকজেন্ডার, মনপুরা, শশীগঞ্জ, হাকিম উদ্দিন, মির্জাকালু ও বেতুয়া সহ বিভিন্ন রুটের যাত্রীদের এখন একমাত্র ভরসা হচ্ছে ছোট একতলা এমএল টাইপের লঞ্চ ও ট্রলার (ইঞ্জিন চালিক নৌকা)।

এদিকে বৈশাখ আসার আগেই উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় কাল বৈশাখী আঘাত হানতে শুরু করছে। বরিশাল আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে রবিবার রাত ১০টা থেকে ৩০ মিনিট দক্ষিণাঞ্চলের উপর দিয়ে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৪৮ কিলোমিটার বেগে কালবৈশাখী ঝড় হয়। ঝড়ে বিশেষ করে তজুমদ্দিন-মনপুরা, চরফ্যাশনের বেতুয়া-মনপুরা, মির্জাকালু-আলেকজেন্ডার রুট খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এ সব রুটে প্রতিদিনই চলছে একতলা ছোট লঞ্চ ও ট্রলার। ধারণ ক্ষমতার ২/৩ গুণ যাত্রী নিয়ে পটুয়াখালীর গলাচিপা, দশমিনা, ছোট বাইশদিয়া, বড় বাইশদিয়া, ভোলার লালমোহন, মঙ্গলশিকদার ও চরফ্যাশনের বেতুয়া তজুমদ্দিনের শশীগঞ্জ থেকে মনপুরার হাজির হাট পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় ট্রলার চলছে। এতে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ছে।

নৌযান চালক ও মালিকদের দাবি নতুন জরিপ করে উপকূলের ভয়ঙ্কর নদীগুলোর মধ্যে ডেঞ্জার জোন চিহ্নিত করে পুনরায় বে-ক্রসিং ক্ষমতা সম্পন্ন জাহাজ চালু করা হোক। একই সঙ্গে বাকি রুটগুলোতে একতলা নৌযানের রুট পারমিট প্রদান করা হোক। জরিপ করলে নাব্য হারানো নদীরও ড্রেজিং করতে পারবে সরকার।