দেশের পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের দ্বিতীয় ধাপে গতকাল সোমবার ১১৬টি উপজেলায় ভোট হয়েছে। প্রথম ধাপের মতো দ্বিতীয় ধাপেও ভোট কেন্দ্রে বল প্রয়োগ, ভোটকেন্দ্র দখল, জালভোট, কেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়া, আগের রাতে ব্যালটে সিল মেরে বাক্স ভর্তি, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর এজেন্টকে কেন্দ্রে ঢুকতে না দেওয়া ও কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়াসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এমন অভিযোগে বিভিন্ন উপজেলায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীসহ অনেকে ভোট বর্জন করেছেন। ভোট সুষ্ঠু না হওয়ার শঙ্কা থেকে এবারও ভোটাররা ছিলেন কেন্দ্রবিমুখ। বিভিন্ন উপজেলায় কোনো কোনো কেন্দ্রে দিনের প্রথমার্ধ্ব ছিল ভোটারশূন্য।
সাধারণ্যের মনে প্রশ্ন, ভোটকেন্দ্রে এসব অনিয়ম আর ভোট সুষ্ঠু না হওয়ার শঙ্কায় ভোট দেওয়ার প্রতি ভোটারদের এই অনীহার দায় কার? প্রতিটি কেন্দ্রে পর্যাপ্ত আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর সদস্য ও ভোট গ্রহণে দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাচন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা থাকার পরেও এত অনিয়ম ঘটে কীভাবে? রাজধানীসহ সারাদেশে অফিস-আদালত, পাড়া-মহল্লা, বাসা-বাড়ি ও চা-দোকানের আলাপ-আড্ডায় ভোটে কে জিতল কে হারলো সেটির চেয়েও এখন এসব প্রশ্নই মূল আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। নির্বাচন কমিশনার (ইসি) মাহবুব তালুকদার গতকাল এক লিখিত বক্তব্যে বলেছেন, ভোটারদের নির্বাচনবিমুখতা গণতন্ত্রবিমুখতায় পর্যবসিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বগুড়া জেলার বিভিন্ন উপজেলায়ও গতকাল ভোট হয়েছে। তবে প্রতিটি উপজেলায় ভোটারের উপস্থিতি ছিল খুুবই কম। ভোটারদের মধ্যে কেন ভোটের প্রতি এই অনীহা, এ ব্যাপারে বগুড়ার জেলা প্রশাসক (ডিসি) ফয়েজ আহমদ গতকাল রাতে ইত্তেফাককে বলেন, ‘ভোটারের উপস্থিতি অনেক কম ছিল।’ সুষ্ঠু ভোট না হওয়ার শঙ্কা থেকেই কী ভোটাররা কেন্দ্রে যাননি? এমন প্রশ্নের জবাবে ডিসি বলেন, ‘আমার মনে হয় না। প্রার্থী কম থাকায় হয়তো ভোটাররা নির্বাচনকে তেমন গুরুত্ব দেননি, এই কারণে তারা ভোট দিতে যাননি।’
গতকাল মৌলভীবাজারের রাজনগর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী, বর্তমান চেয়ারম্যান আছকির খান ভোট বর্জন করেন। নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ এনে দুপুরের দিকে রিটার্নিং অফিসারের কাছে লিখিত অভিযোগ করে তিনি ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন। সেখানে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী শাহজাহান খানের (কাপ পিরিচ) বিরুদ্ধে ভোট কেন্দ্রে বল প্রয়োগ, ভোটকেন্দ্র দখল, পুলিশ প্রশাসনের অসহযোগিতা, জালভোটসহ বিভিন্ন অভিযোগ করেন আছকির। রাজনগরে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পক্ষে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মিলন বখত বলেছেন, ‘বিভিন্ন কেন্দ্রে বল প্রয়োগ করা হয়েছে, জালভোট দেওয়া হয়েছে। এজন্য আমরা ভোট বর্জন করেছি।’ এ বিষয়ে রাজনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার ফেরদৌসি আক্তার স্থানীয় সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। তিনি (আছকির খান) নির্বাচন বর্জন করেছেন।’ ইউএনও ফেরদৌসি এই বক্তব্যের মাধ্যমেই দায় সেরেছেন। তবে কেন্দ্র দখল ও জালভোটের বিষয়ে তিনি কোনো ব্যাখ্যা দেননি।
নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, ভোটারকে ব্যালট পেপার দেওয়ার আগে ব্যালটের অপর পৃষ্ঠায় অফিসিয়াল সিলের ছাপ দিতে হয়। সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ব্যালটের পেছনে অনুস্বাক্ষর করেন। এই সিলের একটি কোড বা গোপন সংকেত নম্বর থাকে। ব্যালট পেপারের মুড়িপত্রে ভোটার তালিকায় প্রদত্ত ভোটারের ক্রমিক নম্বর লেখা থাকে। ব্যালট পেপারের মুড়িপত্রে ভোটারের স্বাক্ষর বা টিপসইও নেওয়া হয়। তারপর মুড়িপত্রে অফিসিয়াল সিল দ্বারা ছাপ দিতে হয়। এরপর ভোটার গোপন বুথে গিয়ে পছন্দের প্রতীকে বর্গাকৃতির রাবারস্ট্যাম্প দ্বারা ছাপ দেন। নির্বাচনী আইন অনুযায়ী এতগুলো প্রক্রিয়া অনুসরণ করার কথা থাকলেও আগের রাতে কিংবা ভোটের দিন ব্যালট পেপারে সিল মারার ঘটনা যদি ঘটে, তাহলে সেটির দায় কার?
নির্বাচন কমিশনের হিসাব মতে, সাধারণ ভোটকেন্দ্রে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ১৪ জন সদস্য মোতায়েন থাকেন। এরমধ্যে অস্ত্রসহ পুলিশ ১ জন, অস্ত্রসহ আনসার ১ জন, অস্ত্র/লাঠিসহ আনসার ১ জন, লাঠিসহ আনসার সদস্য ১০ জন (পুরুষ ৬ জন ও মহিলা ৪ জন) ও গ্রাম পুলিশ ১ জন। মেট্রোপলিটন এলাকার বাইরে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে অস্ত্রসহ পুলিশ ২ জন, অস্ত্রসহ আনসার ১ জন, অস্ত্র/লাঠিসহ আনসার ১ জন, লাঠিসহ আনসার সদস্য ১০ জন (পুরুষ ৬ জন ও মহিলা ৪ জন) ও ২ জন গ্রাম পুলিশ মোতায়েন ছিলেন। এর বাইরে সশস্ত্র বাহিনী, র্যাব ও পুলিশের টহলও ছিল। অবশ্য ভোটারসংখ্যা ও ঝুঁকি কম-বেশির বিবেচনায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর এই সংখ্যায় কোথাও কোথাও হেরফের হয়।
নির্বাচনী আইন অনুযায়ী, প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে ১ জন প্রিজাইডিং অফিসার, প্রতি বুথে ১ জন সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ও প্রতি বুথে ২ জন করে পোলিং অফিসার নিযুক্ত ছিলেন। নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটি কেন্দ্রে প্রতিটি বুথে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রত্যেক প্রার্থীর পোলিং এজেন্ট থাকবেন। তবে কারও এজেন্ট না থাকলেও গণপ্রতিধিত্ব আদেশের ২৩ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচনী কর্মকর্তার সকল কার্যক্রম আইনসিদ্ধ বলে গণ্য হবে।
আইন অনুযায়ী ভোটগ্রহণকারী দলের সদস্যরা ব্যালট পেপার, স্বচ্ছ ব্যালট বাক্স, সিল, প্যাডসহ নির্বাচনী সরঞ্জাম নিয়ে ভোটের আগের রাতে কেন্দ্রে অবস্থান নেন। ব্যালট বাক্স খালি আছে কি-না, ভোট গ্রহণ শুরুর আধাঘণ্টা আগে প্রিজাইডিং অফিসার তা নিশ্চিত করবেন। প্রিজাইডিং অফিসার খালি বাক্স উপস্থিত প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও তাদের নির্বাচনী এজেন্টদের দেখাবেন এবং দেখানোর পর সিলগালা করে ভোটগ্রহণ কার্যক্রম শুরু করবেন।
ভোট কারচুপি, কেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়া ও রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তির অভিযোগে গতকাল রাঙামাটির বাঘাইছড়ি, নানিয়ারচর ও কাউখালী উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র পাঁচজন চেয়ারম্যান ও সাতজন ভাইস-চেয়ারম্যান প্রার্থী ভোট বর্জন করেছেন। তারা নির্বাচন স্থগিতের আবেদন জানিয়ে রাঙামাটির রিটার্নিং অফিসার ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে চিঠি দেন। ভোটকেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এত সদস্য ও এত নির্বাচন কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকার পরেও এই ধরনের ঘটনা ঘটার বিষয়ে রাঙামাটি জেলা প্রশাসক (ডিসি) একেএম মামুনুর রশীদ গতকাল রাতে ইত্তেফাককে বলেন, ‘ভাই এসব নিয়ে এখন কথা বলতে পারবো না, এখানে সহিংসতায় আহতদের চিকিত্সার জন্য হেলিকপ্টার জোগাড় করতে আমি ব্যস্ত আছি।’
গতকাল খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস) সংস্কার গ্রুপ সমর্থিত প্রার্থী বিমল কান্তি চাকমা ওরফে মুর্তবাবুর নেতাকর্মী ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে কেন্দ্র দখল ও ভোট কারচুপির অভিযোগে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী ক্যাজাই মারমা, স্বতন্ত্র প্রার্থী হুমায়ুন কবির এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী কাকলী খীসা ভোট বর্জনের ঘোষণা দেন।
কেন্দ্র দখল ও জালভোটের ঘটনা ঘটেছে পাবনার বেড়া উপজেলায়ও। সেখানে সুলতানা খানম নামের এক নারী ইউপি সদস্য পাইকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে প্রভাব বিস্তার করেন বলে অভিযোগ করেন অন্য প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা। সিলেটের জৈন্তাপুরের হেমু হাউদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও জালভোটের ঘটনা ঘটে। সেখানকার প্রিজাইডিং কর্মকর্তা সুব্রত দেবনাথ ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেছেন, জালভোটের সঙ্গে জড়িত কয়েকজনকে ধরে পুলিশে দেওয়া হয়েছে। এরকম নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ গতকালের বিভিন্ন উপজেলার নির্বাচনেই।
রাজনীতি বিশ্লেষক, নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি ভোটকেন্দ্রে যে পরিমাণ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা থাকেন, ভোটগ্রহণ কার্যক্রমের সঙ্গে যে সংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারী নিযুক্ত থাকেন এবং ভোট কেন্দ্রের বাইরেও যে পরিমাণ টহল থাকে- এতকিছু উপেক্ষা করে যখন এই ধরনের অনিয়মের ঘটনা ঘটে তখন এর দায় ভোটগ্রহণের সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্তদের ওপরই বর্তায়।
